রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় বাধা নেই

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৩ এএম

বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) স্থগিত থাকলেও দেশের আবাসন খাতের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) স্বাভাবিক কার্যক্রমে কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ও যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, এজিএম ছাড়া রিহ্যাবের অন্যান্য কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবেই চলবে।

আলাপকালে মোস্তফা জামাল হায়দার দেশ রূপান্তরকে বলেন, অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুধু রিহ্যাবের সাধারণ সভা স্থগিত করা হয়েছে। স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধা নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা একটি তদন্ত কমিটি করে দেব। কারণ আমি এখানে বসে তো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারব না। অনুমোদন পেলে কমিটি গঠন করে দেব। ওই কমিটি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিহ্যাব বর্তমান কমিটি তিন মাসের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছে। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, ঢাকা ওয়াসা, রাজউকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়সহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

রিহ্যাব নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সদস্যবান্ধব নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হাসপাতাল ও হোটেলগুলোর সঙ্গে নানা ধরনের সুবিধামূলক চুক্তি করা হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে গৃহায়ন মন্ত্রণালয় ও আবাসন খাতের সিনিয়র মেম্বারদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করা হয়েছে। পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলী, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সংস্থাও সংগঠনের সঙ্গে সভা করে ড্যাপসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে চেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।

এসব কার্যক্রম নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ তুলেনি। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ২ কোটি টাকার অনুদান দেওয়ার পর পরিচালকদের একাংশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেন। তবে কি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে টাকা দেওয়াই রিহ্যাবের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ীরা। তবে অভিযোগকারীরা কৌশলে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া অনুদানের বিষয়টি সামনে আনেননি। এসব অভিযোগের কারণে ইতিমধ্যে এজিএম স্থগিত হয়েছে।

সাধারণ সদস্যদের স্বার্থে আগামী ১২ আগস্ট রিহ্যাব সামার ফেয়ার আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই মেলা ঘিরে ব্যবসায়ীরা নানা পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন। এতে ফ্ল্যাট-প্লট কেনাবেচার বড় একটি সুযোগ পেয়েছেন নানা সংকটের মধ্যে থাকা ব্যবসায়ীরা। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং শুনানির সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছিল। রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা নেমে আসে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিষ্কার জানিয়েছে, রিহ্যাবের এজিএম ছাড়া অন্য কোনো কাজে স্থবিরতা আসার কোনো সুযোগ নেই। এজিএম ছাড়া অন্য সব কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতেই চালাতে পারবে সংগঠনটি।

রিহ্যাবের একাধিক পরিচালক জানিয়েছেন, এই সংকটের সূত্রপাত মূলত প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়াকে কেন্দ্র করে। বোর্ডের একটি অংশের দাবি, সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি এবং এ বিষয়ে সবাইকে অবহিত করা হয়নি। অন্যদিকে বর্তমান নেতৃত্ব বলছে, বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এর আগে ১০ জন নির্বাচিত রিহ্যাব পরিচালক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। গত ৩০ জুলাই এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর অধিকতর পর্যবেক্ষণের জন্য ১ আগস্ট নির্ধারিত এজিএম স্থগিত করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ১৯ পরিচালক বর্তমান নেতৃত্বের পক্ষে মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দেন। তাদের ভাষ্য, দ্বিতীয় বোর্ড সভায় ত্রাণ তহবিলে অনুদান দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত আগেই গৃহীত হয়েছিল। পরে সময়ে সময় স্বল্পতার কারণে নতুন সভা আহ্বান করা সম্ভব না হওয়ায় সেই সিদ্ধান্তের আলোকে চেক প্রদান করা হয়।

রিহ্যাবের একটি সূত্র জানায়, দ্বিতীয় বোর্ড সভার কার্যবিবরণীতেই অনুদানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। পরিচালকদের একাংশের মতে, নীতিগত অনুমোদন থাকায় এ সিদ্ধান্তকে অনিয়ম বলা যায় না; প্রয়োজনে পোস্ট ফ্যাক্টো অনুমোদনের সুযোগও রয়েছে।

অন্যদিকে অভিযোগকারীদের দাবি, অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা অনুসরণ করা হয়নি। তবে রিহ্যাব নেতৃত্বপক্ষ বলছে, অনুদানকে ‘নিয়মবহির্ভূত ব্যয়’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

এসব অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য ঘিরে সংগঠনের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব আবাসন খাত, ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং ক্রেতাদের আস্থার ওপর পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি সামনের সামার ফেয়ার আয়োজন নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠানে সকল ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পরিচালকদের নেওয়া হলো না কেন তা নিয়ে অভিযোগকারী পরিচালকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ বিষয়ে রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল জানান, তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট ১-সহ ৫ জনের তালিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তিনি বাদে মাত্র ১ জনকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়।

ড. আলী আফজাল বলেন, আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। নির্বাচনের পর সবাইকে নিয়েই সংগঠন পরিচালনা শুরু করেছি। গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আমাদের অভিযোগকারী ভাই বোনদের দিয়েই শুরু হয়েছে। আবাসন খাত বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই আমাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য বা ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করেই এগিয়ে যেতে হবে । তিনি বলেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করা এবং আবাসন শিল্পের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা। এ জন্য পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্য, সাধারণ সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করতে চাই।’

সমস্যাগুলোর বিষয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরীণভাবে সমাধানের চেষ্টা না করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যাওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করেন রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, আমাদের পরিচালনা পর্ষদের ১০ জন সদস্য তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরাসরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছেন। এতে রিহ্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোনো মতপার্থক্য বা অভিযোগ থাকলে তা প্রথমে বোর্ডের ভেতরে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত ছিল।

জানতে চাইলে অভিযোগকারী ও রিহ্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট-১ মোহাম্মদ আক্তার বিশ্বাস বলেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মন্ত্রণালয় থেকে সমস্যা সমাধনের কথা বলা হয়েছে। আমরা শুরু থেকেই পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে রিহ্যাব পরিচালনা করতে চেয়েছি। কিন্তু সব জায়গায় কেমন জানি লুকোচুরি। তিনি বলেন, আমরা আশা করছি এবার শুধরে নিয়ে ভালোভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারব। তা না হলে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত