প্রাকৃতিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে অনন্য ভৌগোলিক এলাকা হাওর ও সুন্দরবন অঞ্চল। হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে বঙ্গীয় বদ্বীপের সাগরসঙ্গমে অবস্থিত সুন্দরবন যেমন পৃথিবীর বৃহত্তম শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল তেমনি বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের মধ্যে অবস্থিত হাওর অববাহিকা বাংলাদেশ তো বটেই পৃথিবীরই এক বিরল জল-প্রকৃতির দৃষ্টান্ত। হাওরগুলোকে বাংলাদেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল জলাভূমি হিসেবে গণ্য করা হয়। স্থায়ী আবাসিক ও পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থল এবং বিপুল জলজ-উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে হাওরের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের সুবিস্তৃত হাওর অববাহিকায় রয়েছে ৪৭টি বড় হাওর এবং বিভিন্ন মাপের প্রায় ৬,৩০০ বিল। এখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাওরগুলো হলো শনির হাওর, হাইল হাওর, হাকালুকি হাওর, ডাকের হাওর, মাকার হাওর, ছাইয়ার হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর এবং কাওয়াদীঘি হাওর। কিন্তু হাওর রক্ষায় বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে হাওরের পরিবেশ-প্রতিবেশ যেমন ঝুঁকিতে পড়েছে তেমনি সাম্প্রতিককালে বেপরোয়া দখলের শিকার হয়ে অনেক হাওরের অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে।
রবিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘দখলে দখলে বিলীনের পথে হাইল হাওর’ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় বেপরোয়া দখলের কারণে মৌলভীবাজারের হাইল হাওরের প্রায় দেড়শ ছোট-বড় বিলের অর্ধেকই প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। ৩০টি বিলের কোনো হদিসই নেই। এছাড়া সাড়ে তিনশ ছড়ার হাইল হাওরের দুই- তৃতীয়াংশ ছড়া বা খালের মতো পানিপ্রবাহও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু হাওরের ভূমি দখল করে গণহারে মাছের খামার তৈরি এবং মাটি ভরাটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হাইল হাওরের বিপুল অংশই এখন বিলীনের পথে। সরকারের মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, ২০১৪ সালে হাইল হাওরে বাণিজ্যিক মাছ চাষের জন্য তৈরি পুকুরের আয়তন ছিল ৮৬৩ হেক্টর। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩শ হেক্টরে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, বাস্তবে বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরের মোট আয়তন ৩ হাজার হেক্টর হবে। হাইল হাওরের মোট আয়তন সরকারি হিসাবে ১৪ হাজার হেক্টর। কিন্তু বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর কর্মীরা বলছেন, বর্তমানে এই হাওরের প্রকৃত আয়তন ৭ হাজার হেক্টরেরও কম।
দেশি মাছের অভয়াশ্রম হাইল হাওরের এমন করুণ পরিণতির নেপথ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক মাছ চাষ প্রকল্প। স্থানীয় মানুষদের ভাষ্য ও সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা গেছে অন্যায়ভাবে সরকারি জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে স্থানীয়ভাবে ‘ফিশারি’ নামে পরিচিত এসব বাণিজ্যিক পুকুর তৈরি করা হচ্ছে। প্রভাবশালীরা ভূমিহীনদের দেওয়া সরকারি খাসজমি বন্দোবস্তের কাগজপত্র সংগ্রহ করে কৌশলে ভূমিহীনদের কাছ থেকে জমি নিয়ে নেয় এবং পরে সেখানে ফিশারি তৈরি করে। শ্রীমঙ্গল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, হাইল হাওরে ছড়িয়ে থাকা বিলগুলোতে একসময় প্রায় শত প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন সেসবের মধ্যে ৩০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিল দখল ও ভরাটের পাশাপাশি আরেকটি বিপদ হলো হাইল হাওরের ছড়াগুলোও দখল হয়ে যাওয়া। এতে পানির প্রবাহ পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়ছে হাওরের বোরো চাষিরাও। অর্থাৎ হাওর দখলের এই প্রক্রিয়ায় দেশি মাছের পাশাপাশি স্থানীয় কৃষিও হুমকির মুখে পড়েছে। হাইল হাওর ঘিরে ১০ হাজারের বেশি জেলে পরিবারের বসবাস। জেলে পল্লীগুলোর জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। কিন্তু হাওরে মাছ কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে স্থানীয় জেলেদের অর্ধেককেই জীবিকা বদল করতে হয়েছে। জীবিকা বদলের সুযোগ খুঁজছেন আরও কয়েক হাজার জেলে। হাইল হাওরের এই চিত্র দেশের অন্যান্য হাওর থেকে খুব বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। হাওর রক্ষা এবং দেশি মাছ রক্ষার বিষয়টিকে তাই সামগ্রিকভাবে দেখা খুবই জরুরি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সালে মৎস্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশ, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদপ্তরের পৃথক গবেষণার তথ্য থেকে জানা গেছে দেশি প্রজাতির ৯১টি মাছ এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে।
হাইল হাওরসহ অপরাপর হাওর ও বিল-জলাশয় রক্ষার সঙ্গে তুরাগ নদকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে ঘোষণা করা হাইকোর্টের রায় বিশেষভাবে সম্পর্কিত। কেননা, ওই রায়ে দেশের সব নদ-নদী-হাওর-খাল-বিল-জলাশয়কে পরস্পর সম্পৃক্ত বা একীভূত সত্তা হিসেবে একই সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদী-জলাশয়ের অভিভাবক ঘোষণা করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে কতটা সক্ষম ও সক্রিয়? একইসঙ্গে এই প্রশ্নও জরুরি যে, দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড যা ২০১৬ সাল থেকে ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর’ নামে পুনর্গঠিত হয়েছে তারা হাওর রক্ষায় কী করছে? হাওর মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এখন অধিদপ্তরের ৩৬টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। কিন্তু হাওর বেদখল হয়ে গেলে, হাওরের বিশেষ জল-প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য টিকে না থাকলে এই কমিশন ও অধিদপ্তরের কর্মকা- থেকে দেশ কীভাবে উপকৃত হবে? উপরোক্ত বাস্তবতার বিবেচনায় তাই হাওর রক্ষায় সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।