রোগীর চাপে কমে আসছে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা

দেশের বেশিরভাগ জেলা-উপজেলা হাসপাতালেই সর্দি-জ¦র কিংবা শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীতে ঠাসা। বেশিরভাগ হাসপাতালেই শয্যা খালি নেই। হাসপাতালের বারান্দা কিংবা মেঝেতে বিছানা পেতে সেখানেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়িয়েও লাভ হচ্ছে না। আবার অনেক এলাকায় রোগীর অবস্থা একটু ভালো হলেই তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে টেলিমেডিসিন সেবা। আবার উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে রোগীর অবস্থা একটু বেশি খারাপ হলেই তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা বিভাগীয় শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে রোগী সংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে কোনোভাবেই হাসপাতালে আর রোগী ভর্তির সুযোগ থাকবে না। তাই বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি লক্ষণ দেখা দেওয়া মাত্রই পরীক্ষা করানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে করোনার তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে। শনাক্তও ১১ হাজারের বেশি। শনাক্ত ও মৃত্যু বড় একটা অংশ ঢাকার হলেও অন্যান্য এলাকায়ও কম নয়। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত

রাজশাহীতে করোনা ইউনিটে ১৪ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত সময়ে তাদের মৃত্যু হয়। মৃতদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ১০ ও উপসর্গে ৪ জন মারা গেছেন। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী এসব তথ্য নিশ্চিত করে জানান, মৃতদের মধ্যে আটজনের বয়স ৬১ বছরের ওপরে। ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে পাঁচ, ৪১ থেকে ৫০ বছর বয়সের মধ্যে একজন।

তিনি জানান, এ নিয়ে চলতি মাসের ২৫ দিনে এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেলেন ৪৩৬ জন। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ ছিলেন ১৪৪ আর উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২৯২ জন।

ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১৭ জনের মৃত্যু : গত ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে করোনা পজিটিভ ও উপসর্গ নিয়ে আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্তে ১০ এবং করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা যান ৭ জন।

এ তথ্য নিশ্চিত করে করোনা ইউনিটের ফোকালপারসন ডা. মহিউদ্দিন খান মুন জানান, করোনা ডেডিকেটেড ইউনিটে নতুন ৬৪ জন ভর্তিসহ এখন পর্যন্ত ৪৭৮ এবং আইসিউতে ২১ জন চিকিৎসাধীন।

লক্ষ্মীপুরে ৮ দিনে করোনায় ২৮ জনের মৃত্যু : লক্ষ্মীপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যুসহ ২৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষায় ১০৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়। গত আট দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন একজন স্বাস্থ্য সহকারীসহ সদর হাসপাতালে ভর্তিরত দুদিনের শিশুসহ ২৮ জন। সর্বমোট জেলায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৬৬ জন। আট দিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৬০৪ জন। আর জেলায় এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৬২৯ জন।

এদিকে প্রতিদিন সদর হাসপাতালসহ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে নমুনা দিতে রোগীদের ভিড় বাড়ছে। দিন দিন করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও সাধারণ মানুষ মানছে না স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব। যে যার মতো করে ঘর থেকে বের হচ্ছে। হাটবাজারে বিভিন্ন বয়সী মানুষ নানা অজুহাতে বের হয়ে করছে ভিড়। বেশিরভাগ মানুষের মুখে নেই মাস্ক। অন্যদিকে শহরে প্রশাসনের তৎপরতা থাকলেও গ্রামগঞ্জে নেই তেমন তৎপরতা।

সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটের চিকিৎসক মো. মাজহারুল ইসলাম মাসুম জানান, গত কয়েক দিনে করোনা ইউনিটে রোগীর চাপ বাড়ছে। রোগীর চাপ বাড়ায় চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। প্রতিটি রোগীর অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। সাধারণ মানুষ সচেতন না হলে বা স্বাস্থ্যবিধি না মানলে করোনা সংক্রমণ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। তাই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পরামর্শ এ চিকিৎসকের।

কুষ্টিয়ায় আরও ১৯ মৃত্যু : কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে শনিবার সকাল ৮টা থেকে রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন১৫ জনের করোনা আক্রান্ত ও ৪ জনের উপসর্গসহ ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ পিসিআর ল্যাবে ৮৪১টি নমুনা পরীক্ষা করে ২৬০ জনের দেহে নতুন করে করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার প্রায় ৩১ শতাংশ।

হাসপাতালের সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবদুল মোমেন বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও করোনা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। এ সময়ে গ্রামাঞ্চলে সংক্রমিত রোগীদের অসচেতনতাকে অধিক মৃত্যুহারের জন্য দায়ী করছেন এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা। তিনি বলেন, তারা আক্রান্ত হয়েও সময়মতো নমুনা পরীক্ষা না করা এবং অক্সিজেন লেভেল একেবারে কমে এলেই আসছেন হাসপাতালে। হাসপাতালে আসার পর এসব রোগীকে সবরকম চিকিৎসা দিয়েও রক্ষা করা যাচ্ছে না।

খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ৪৫ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে আবারও বেড়েছে মহামারী করোনাভাইরাসে মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২৭৮ জনের। গতকাল দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত শনিবার খুলনা বিভাগে ৩৩ জনের মৃত্যু এবং ২৪৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।

স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের মধ্যে কুষ্টিয়া জেলায় সর্বোচ্চ ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া খুলনায় ১১, যশোরে ৬, মাগুরা ও মেহেরপুরে ৩ জন করে, বাগেরহাট ও ঝিনাইদহে ২ জন করে এবং সাতক্ষীরা, নড়াইল ও চুয়াডাঙ্গায় ১ জন করে মারা গেছেন।

সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে কুমিল্লায় : কুমিল্লায় বেড়েই চলছে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৫ জন। গতকাল বিকেলে কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন মীর মোবারক হোসাইন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৭০১ জন নমুনা পরীক্ষা করিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭০১ জনের দেহে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। সুস্থ হয়েছেন ২২৭ জন। এ নিয়ে জেলা জুড়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৩ হাজার ৮৩০।

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রেজাউল করিম জানান, চলতি সপ্তাহে হাসপাতালে রোগীদের ভিড় বেড়েছে। করোনার বরাদ্দকৃত আসনের চেয়ে অন্তত ৩০ জন বেশি ভর্তি রয়েছেন। যদি এরকম চলতে থাকে তাহলে রোগীর চাপ সামলানো কষ্টকর হয়ে যাবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হাসপাতালে দুদিনে ৮ জনের মৃত্যু : ২৫০ শয্যার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত দুদিনে করোনা আক্রান্ত ও করোনা উপসর্গ নিয়ে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ছয়জন করোনা আক্রান্ত হয়ে ও দুজন করোনা উপসর্গ নিয়ে গত শুক্র ও শনিবার মারা যান।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের করোনা ইউনিটের চিকিৎসক আহনাফ শাহরিয়ার জানান, গত কয়েক দিন জেলা হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে রোগী মারা যাওয়ার পরিমাণ কম ছিল। কিন্তু গত দুদিন ধরে মৃত্যুর হার হঠাৎ করে বেড়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানিয়েছেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি ল্যাব থেকে আসা সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী ভোলাহাট উপজেলায় ২৮ জনের আরটি পিসিআর পরীক্ষায় ১১ জন শনাক্ত হন। এই শনাক্তের হার প্রায় ৪০ ভাগ। চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৪৫ জন।

বরিশালে আরও ১৫ মৃত্যু : বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৮২৬ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৭৬৬ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ও উপসর্গে ১৫ জন মারা গেছেন। এর আগে ২৪ ঘণ্টায় শনিবার সকাল পর্যন্ত বিভাগে ৩৮৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৫০ জনের। এ সময়ে করোনায় দুজন এবং উপসর্গে ১০ জনের মৃত্যু হয়।