নানা ছুতোয় এমনকি অভিনয় করেও রাস্তায় বেরোচ্ছে মানুষ

গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টা। উত্তরার আজমপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে এক যুবক মাথায় ব্যান্ডেজ লাগিয়ে ঘুরছে। পুলিশ তাকে আটকে নানা প্রশ্ন করলে ওই যুবক জানায়, তার গ্রামের বাড়ি জামালপুর। থাকে ময়নারটেক। নাম কালু শাহ। ‘লকডাউনের পরিস্থিতি’ দেখতে মাথায় ব্যান্ডেজ লাগিয়ে অভিনয় করছে। আসলে মাথায় কিছুই হয়নি। কেউ আঘাতও করেনি। এ কথা শুনে পুলিশও হতবাক হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তাকে বকাঝকা করে তাড়িয়ে দেয়। একই ঘটনা বিমানবন্দর গোল চত্বরের সামনে। রাব্বি নামে এক যুবক যেতে চায় বিমানবন্দরের ভেতরে। কারণ সে বিমান ওঠানামা দেখবে। রাস্তাঘাট ফাঁকা দেখে তার মনে হয়েছে কাছে গিয়ে দেখতে পারবে বিমান। পরে পুলিশ তাকে ১০০ টাকা জরিমানা করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এ দুটি ঘটনার মতোই ঢাকার রাস্তায় অভিনব পন্থায় লোকজন চলাফেরা করছে। রাস্তায় তল্লাশি চৌকি বাড়ানোর পরও কুলিয়ে উঠতে পারছে না পুলিশ। আবার লোকজনের মধ্যে কেউ কেউ ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে রক্ষাও পাচ্ছে না। জরিমানা করার পাশাপাশি গ্রেপ্তার পর্যন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে গতকাল করোনার সংক্রমণ ও মারা যাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, জেলা ও রেঞ্জ অফিসকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশনা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। নির্দেশনা পেয়ে পুলিশও কাজ শুরু করে দিয়েছে বলে কয়েকজন পুলিশ সুপার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বিনা প্রয়োজনে মানুষ রাস্তায় বের হচ্ছে। নিজ থেকে সচেতন না হলে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কীভাবে রুখবে। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি লোকজনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, সড়কের মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট। অনেক স্থানে পুলিশ ব্যারিকেড ও কাঁটাতারের বেড়া বসিয়েছে। পাশাপাশি ছিল সেনাবাহিনীর টহল। তারা বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে চালককে লকডাউনের মধ্যে কেন বের হয়েছে তা জিজ্ঞাসা করছেন। বিধিনিষেধ না মানায় অনেকের নামে ঠুকে দেওয়া হয়েছে মামলা। সেনাবাহিনীর সদস্যরা হ্যান্ডমাইকে সবাইকে বাসার বাইরে বের না হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সরকারি ও বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের গাড়ি, পণ্যবাহী বাহন ছাড়া কিছু রিকশা-ভ্যান চলছে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে। যারা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে বের হয়েছেন তারা পড়েছেন পুলিশের জেরার মুখে। যারা ব্যক্তিগত কাজে বের হয়েছেন তাদের অনেকেই মাস্ক ছাড়া বের হয়েছেন। মূল সড়কের মানুষের দেখা কম মিললেও সড়কের পাশের অলিগলিতে লোকজনের আনাগোনা ছিল বেশি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে কঠোর বিধিনিষেধের চতুর্থ দিনে গতকাল রাজধানীতে কড়াকড়ি অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিন অন্যান্য দিনের তুলনায় সাধারণ মানুষের ভিড় কিছুটা বেড়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপও কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা। উত্তরা, বিমানবন্দর, আবদুল্লাপুর, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, বাংলা মোটর, শাহবাগ ও মগবাজার এলাকা ঘুরে লোকজনের আনাগোনা বেশি দেখা গেছে। তেজগাঁও সাতরাস্তার কাছে বিজি প্রেসের সামনের চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনরত তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মো. উজ্জ্বল হোসেন জানান, সকাল ৯টার পর থেকে মানুষের চলাচল বেড়েছে। যারা বের হচ্ছেন, অধিকাংশই রোগী বা রোগীর স্বজন পরিচয় দিচ্ছেন। কেউ কেউ কভিড-১৯-এর টিকা বা পরীক্ষার জন্য বের হয়েছেন। আবার অনেকে বিনা কারণে বের হয়েছেন। ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানসহ অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খোলা থাকার কারণেও কেউ কেউ বাসা থেকে বের হচ্ছেন। যারা অযৌক্তিক বের হয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

শাহবাগে কজনের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, কেউ বের হয়েছেন রোগী দেখতে। কেউ ওষুধ কিনতে। আবার কেউ বের হয়েছেন প্রয়োজনীয় বাজার ও ব্যাংকে টাকা তুলতে। অকারণে রাস্তায় বের হওয়ায় অনেককেই গুনতে হয়েছে জরিমানা। সকাল থেকেই মিরপুরে মোড়ে মোড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্ট। এসব চেকপোস্টে যানবাহনগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। সুনির্দিষ্ট কারণ ও প্রমাণ দিতে পারলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে এসব যানবাহন। মো. মেহেদী কালাম নামে এক যুবক মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে যাচ্ছিলেন একটি হাসপাতালে। ১০ নম্বর গোলচত্বরে চেকপোস্টে ট্রাফিক সার্জেন্ট তার গতিরোধ করেন। তার কাছ জানতে চাওয়া হয় কেন ঘর থেকে বের হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মিরপুর ১৪ নম্বরে বোনের জন্য ওষুধ কিনতে গিয়েছিলাম। আমার বোন অসুস্থ, মিরপুর ১০ নম্বরের একটি হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাড়াহুড়ো করে ওষুধ কিনতে বের হয়েছি, হেলমেট পরতে মনে ছিল না। এ কারণে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ আমার গতিরোধ করে প্রথমবারের মতো সতর্ক করে ছেড়ে দিয়েছে।’ ওই এলাকায় রিকশায় ঘুরছিলেন মো. মাহবুব। চেকপোস্টে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় কেন তিনি রাস্তায় বের হয়েছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি একজন টাইপিস্ট। টাইপের বিষয়গুলো বুঝতে আমার স্যারের বাসায় যাচ্ছি। এ সময় ১০ নম্বর গোলচত্বরে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ আমার গতিরোধ করে জানতে চান কোথায় যাচ্ছি। কী কারণে রাস্তায় থেকে বের হয়েছি। সবকিছু শুনে প্রথমবারের মতো সতর্ক করে ছেড়ে দিয়েছে।’ কাফরুল থানার উপপরিদর্শক আবদুল জলিল বলেন, ‘বিধিনিষেধে নিত্যপ্রয়োজনে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বাইরে আসছেন। অকারণে রাস্তায় বের হওয়ায় জরিমানা করা হয়েছে ২ হাজার টাকা ও ডাম্পিং করা হয়েছে চারটি অটোরিকশা। বিধিনিষেধ চলাকালে পাড়া-মহল্লার অলিগলির সামনে সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে। টহলে থাকা পুলিশের গাড়ি দেখলে তারা বাসার ভেতরে ঢুকে যায়। পুলিশের গাড়ি চলে যাওয়ার পর আবার তারা বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে শুরু করে। এভাবে কতক্ষণ পুলিশ নজরদারি করতে পারে। যদি মানুষ নিজে থেকে সচেতন না হয়।’

ঢাকার সড়ক ছিল রিকশার দখলে। ঢাকার বড় তিন টার্মিনাল মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এছাড়াও বাইরে থেকে আসা কোনো যানবাহনকে ঢাকায় ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ঢাকার প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নজরদারি বসায় পুলিশ। শুধু সরকার কর্তৃক অনুমোদিত যানবাহনগুলো ঢাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। তবে যারা বিভিন্ন জরুরি কাজে ঢাকায় এসেছেন তাদের ঢাকার প্রবেশপথে গাড়ি থেকে নেমে রিকশা ও ভ্যানে করে গন্তব্যস্থলে যেতে দেখা গেছে। শাহবাগে রিকশাচালক স্বপন হোসেন জানান, সকালে রিকশা নিয়ে সড়কে নেমেছেন। মূল সড়কে পুলিশ অন্য দিনগুলোতে বাধা দিয়ে থাকে। তবে লকডাউনের প্রথম দিন পুলিশ তাদের কোনো বাধা দেয়নি। সকালে যাত্রীর চাহিদা বেশি ছিল। বেশি ভাড়া হাঁকা হয়েছে। তিনি ভাড়াও পেয়েছেন বলে জানান। ট্রাফিক পুলিশের কনস্টেবল সবুজ হোসেন জানান, লকডাউনে যানবাহনের চাপ নেই। তবে প্রাইভেট গাড়িগুলো থামিয়ে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে তাদের পরিচয় ও লকডাউনে কেন তারা বের হয়েছেন। দুপুর ১২টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় ভ্যানে শুয়ে কাতরাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার বাসিন্দা মোতালেব হোসেন। চিকিৎসা নেওয়ার পর বাসায় রওনা হতে হবে ভ্যানে করেই। কিন্তু অসহ্য গরম আর শারীরিক দুর্বলতার কারণে এত দূরের পথ ভ্যানে যেতে ইচ্ছে করছে না মোতালেবের। তার ভাগ্নে শরিফুল বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদি বাতব্যথাসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন মামা। কোনো উপায় না পেয়ে সকালে ডাক্তার দেখাতে ভ্যানে করেই নিয়ে এসেছি। এখন আবার ভ্যানে করেই ফেরত নিতে হবে। কিন্তু তার ভ্যানে যেতে কষ্ট হচ্ছে। রাজি হচ্ছেন না। অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া তো অনেক। লকডাউনের কারণে সিএনজি অটোরিকশা বন্ধ।’ একই হাসপাতালে কথা হয় রাজিব নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি জানান, মাস দুয়েক পর সৌদি আরব যাবেন। টিকা নিতে ফরিদপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। ঢাকায় পৌঁছতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। এখন আবার বাড়ি ফেরা নিয়েও চিন্তিত তিনি। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সৌদি আরব ও কুয়েতপ্রবাসী কর্মীরা। ঢাকায় টিকা নিতে আসা প্রবাসীদের বেশিরভাগই দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন। টাঙ্গাইল থেকে বারডেম জেনারেল হাসপাতালে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে আসা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, এ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মাস দুয়েক আগে। ডাক্তারের বেঁধে দেওয়া সময়ে ফলোআপের জন্য এ কঠোর বিধিনিষেধে তাকে খুব কষ্ট করে ঢাকায় আসতে হয়েছে।

লকডাউনেও জুয়ার আসর : খেলায় তো বাধা নেই এমন মনোভাব নিয়েই তারা বসেছিলেন জুয়ার আসরে। কিন্তু র‌্যাবের গোয়েন্দারা যে তাদের চেয়েও এগিয়ে তা বুঝতে পারেননি। ধরাটাও পড়তে হয়েছে। গতকাল রাজধানীর কলাবাগানে একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় জুয়া খেলার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। র‌্যাব-৩-এর সহকারী পরিচালক ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বীণা রানী দাস জানান, গোপন সংবাদ ছিল রাজধানীর কলাবাগানে জুয়াড়ি চক্রের কতিপয় সদস্য জুয়ার আসর পরিচালনা করছে। ওই খবরের ভিত্তিতে ২৪ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃতরা হচ্ছে মাসুদুর রহমান ওরফে মিন্টু, জাকির হোসেন, রাজু আহম্মেদ, মো. হানিফ, খোরশেদ আলম, মোস্তফা, আফজাল হোসেন, আবদুর রহমান, মো. রহমান, সাইফুল ইসলাম, জুয়েল হোসেন, কামাল হোসেন, রাজিব, হামিদুর রহমান, আজিজ, হাবিবুর রহমান, মো. মাসুদ, জাহিদ, হুমায়ুন হোসেন, মোস্তাফা, সোহরাব হোসেন, রিপন, মায়নুল হায়দার ও কামাল হোসেন। তাদের কাছ থেকে ২২ সেট জুয়া খেলায় ব্যবহৃত তাস এবং ১ লাখ ৬০ হাজার ২৩৮ টাকা উদ্ধার করা হয়। তারা লকডাউনের নির্দেশনা অমান্য করেছে।

১০ লাখ ২১ হাজার টাকা জরিমানা : গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, বিধি লঙ্ঘন করে বাসার বাইরে আসায় ৫৬৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত ১৬৪ জনকে ১২ লাখ হাজার ৬২ হাজার টাকা জরিমানা করেছে। আর সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে বিনা কারণে গাড়ি নিয়ে সড়কে বের হওয়ায় ৪৪৩টি যানবাহনকে ১০ লাখ ২১ হাজার টাকা করা হয়েছে জরিমানা।