করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে পূর্বঘোষিত কঠোর বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেই ঈদের ছুটিতে রাজধানী ছেড়ে বাড়ি গিয়ে আটকে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। এখন চাকরি বা পেশা বাঁচাতে অটোরিকশাসহ তিন চাকার বিভিন্ন বাহন, মোটরসাইকেল, নিজস্ব গাড়ি কিংবা বিকল্প যেকোনো বাহনে ভেঙে ভেঙে ঢাকায় ফিরতে মরিয়া তারা। এমন পরিস্থিতিতে চলমান কঠোর বিধিনিষেধের চতুর্থ দিনে গতকাল সোমবার দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও ফেরিঘাটে যানবাহন ও যাত্রীর ভিড় বেশি দেখা গেছে। আর সুযোগ বুঝে যানবাহন চালকেরাও যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে:
করোনা সংক্রমণ রোধে দেশজুড়ে সরকার ঘোষিত ১৪ দিনের কঠোর বিধিনিষেধের চতুর্থ দিনে গতকাল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঢাকামুখী অনেক মানুষকে নদী পার হতে দেখা যায়। তাদের অনেকেই মোটরসাইকেলে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও যাত্রীরা নানা উপায়ে ঘাটে আসছেন। বিভিন্ন অজুহাতে ফেরিতে পারাপার হচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে নদীতে তীব্র স্রোত ও কঠোর বিধিনিষেধে যানবাহনের চাপ কমে যাওয়ায় ফেরি চলাচল সীমিত করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ৮টি ফেরি দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে চলাচল করছে। আর এই ফেরিগুলোতে পারাপার হচ্ছেন যাত্রীরা। তবে উভয় ঘাটেই যাত্রী বা যানবাহনের অতিরিক্ত কোনো চাপ নেই। ঘাটে আসামাত্রই ফেরিতে উঠতে পারছে যাত্রী ও যানবাহন।
গতকাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে অবস্থান করে দেখা যায়, ভ্যান, রিকশা, মোটরসাইকেল, মাহিন্দ্রা, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহনে ঘাটে এসে পৌঁছাচ্ছেন যাত্রীরা। এরপর তারা ফেরিঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ, আনসার ও ঘাট কর্র্তৃপক্ষের সদস্যদের নানা অজুহাত দিয়ে পন্টুনের কাছে যাচ্ছেন। পরে ফেরি আসামাত্রই তারা তাতে উঠে পড়ছেন। এই যাত্রীরা ঘাট পর্যন্ত আসতে চরম দুর্ভোগ পোহানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া গুনেছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
সাতক্ষীরা থেকে আসা ঢাকাগামী যাত্রী আসমা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনেক দিন হলো আমার স্বামী অসুস্থ, এলাকায় অনেক ডাক্তার দেখালাম, কিন্তু সুস্থ না হওয়ায় এখন ঢাকার নিয়ে যাচ্ছি। আসার সময় কয়েক জায়গায় বাধার সম্মুখীন হয়েছি। তবে কাগজ দেখিয়ে ঘাটে চলে এসেছি। বাস না চলায় অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়া দিয়ে যেতে হচ্ছে।’
কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে দৌলতদিয়া ঘাটে আসা ঢাকাগামী যাত্রী ফয়সাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে দেশের বাড়িতে এসেছিলাম। ছুটি শেষ এখন তো ঢাকায় যেতেই হবে। তাই কষ্ট-দুর্ভোগ আর ভাড়া বেশি দিয়ে হলেও ঘাটে আসছি। এখন কোনোমতে ঢাকায় পৌঁছাতে পারলেই হয়।’
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. জামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নদীতে পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি তীব্র স্রোত ও বিধিনিষেধে যানবাহনের চাপ কমে যাওয়ায় সকাল থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ৮টি ফেরি জরুরি প্রয়োজনে আসা অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, পণ্যবাহী ট্রাক পারাপার করছে। তবে ফেরিতে যানবাহনের সঙ্গে বিভিন্ন অজুহাতে যাত্রীরাও নদী পার হচ্ছে।’
বরিশাল থেকে ঢাকামুখী শত শত মানুষ : গতকাল বরিশাল থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় শত শত মানুষ। কঠোর বিধিনিষেধের কারণে দূরপাল্লার সব ধরনের বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থায় ঢাকা যাচ্ছে মানুষ। এতে করে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে বাড়ছে ঢাকামুখী মানুষের ভিড়। এমন পরিস্থিতিতে নগরীর নথুল্লাবাদে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের চেকপোস্টে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ঢিলেঢালাভাব লক্ষ করা গেছে।
গতকাল সকালে নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় দেখা গেছে, শত শত মানুষ ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। নথুল্লাবাদে পুলিশের চেকপোস্ট পার হতে পারলেই মিলছে কোনো না কোনো যানবাহন। নগরীর কাশিপুর চৌমাথা এলাকা থেকে সিএনজি, মাহিন্দ্রা, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে চড়ে মাওয়া যাচ্ছেন মানুষ। সেখান থেকে আবার বিভিন্ন মাধ্যমে ঢাকায় ঢুকছেন তারা।
ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়া আতিকুর রহমান জানান, তিনি পটুয়াখালী থেকে পণ্যবাহী একটি ট্রাকে বরিশালে এসেছেন। এখন নথুল্লাবাদ থেকে সিএনজিতে চড়ে মাওয়া যাবেন। জরুরি কাজের জন্য বাড়তি ভাড়া দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সিএনজিতে মাওয়া যেতে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যে মোটরসাইকেল রয়েছে তাতে রিস্ক বেশি, আর ভাড়াও দ্বিগুণ।’
আনোয়ার হোসেন নামে ঢাকাগামী আরেক যাত্রী রওনা হন মোটরসাইকেলে। বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলের চালকের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। কিন্তু ভাড়ায় মেলেনি। তাই সিদ্দিক নামে এক চালকের মোটরসাইকেলে ৬০০ টাকা ভাড়া মিটিয়ে উঠেছেন।
এভাবেই বাড়তি ভাড়া দিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে ঢাকা যাচ্ছেন মানুষ। এমনকি এক একটি মোটরসাইকেলে দুজন করেও যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক জাহাঙ্গীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাই, লকডাউনে সব গাড়ি বন্ধ। ছেলেমেয়ে নিয়ে কষ্টে আছি। পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় গাড়ি থামায়, তারপরও যাত্রী পরিবহন করছি পেটের দায়ে।’ এ ছাড়া ব্যটারিচালিত রিকশা, ভ্যানে চড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি অনেকে আবার হেঁটে রাস্তা কমানোর চেষ্টা করছেন।
এদিকে বিধিনিষেধের চতুর্থ দিনে নগরীর রাস্তাগুলোয়ও মানুষ চলাচল বেড়েছে। শহরের প্রধান প্রধান সড়কে রিকশা, মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করেছে। বড় বড় শপিং মল বন্ধ থাকলেও সড়কের পাশে অস্থায়ী দোকান বসেছে। এতে অবাধে চলছে কেনাবেচা। অনেকে আবার দোকান বন্ধ রেখে দোকানের সামনে টেবিল বসিয়ে বেচাকেনা করছেন।