আইনের গতিপথে পিসোর প্রেতাত্মা

‘আইন তার আপন গতিতে চলবে’, প্রায়ই উচ্চারিত হয় আমাদের দেশে, আইনের শাসন আর ন্যায়-বিচারের প্রসঙ্গে। দারুণ মনপসন্দ বচন! শিকারিও বলে, শিকারও ভুলে! আদতে কি নিজের কোনো গতি আছে আইনের! নাকি গতি করে কেউ পেছন থেকে! কথাটা ওঠে কেন বারবার! কথাটা এসেছে Let Justice be done, though the heavens fall ইংরেজি আপ্তবচন থেকে। ‘স্বর্গ (অথবা, আকাশ) ভেঙে পড়ে পড়ুক, তবু ন্যায়-বিচারটা করতে দাও।’ শুনতে বেশ লাগে, মোহিত হওয়ার মতনই বটে! (কিন্তু প্রশ্ন, কার স্বর্গ, কার মাথায় আকাশ ভেঙে আইনি বিচার সারবেন জনাব!) বাঙালির মুখে উঠে সেটা আরও মদির হয়েছে ‘আইনের আপন গতি’ বলে। আইন বিনে ন্যায়-বিচার তো জানে না বাঙালি মোটে! দম দেওয়া থাকে নাকি আইনে! (“চমৎকার! ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার!”) তা এই দম দেওয়া গতির কোথায় শুরু, কোথায় গিয়ে শেষ!

আদতে সেই ইংরেজি আপ্তবচনটি এসেছে ল্যাটিন আইনি-শাস্ত্র বচন ‘ফিয়্যাট জাস্টিসিয়্যা রুয়্যাট সিলাম’ (Fiat justitia, ruat caelum) থেকে। অর্থ, সেই ‘স্বর্গ (কিংবা আকাশ) ভেঙে পড়ে পড়ুক, তবু ন্যায়-বিচারটা করতে দাও।’ অন্য লোকের আর দোষ কী! বনেদি এই বচনসুধায় একেবারে বুঁদই হয়ে পড়েছিলেন বিশ শতকের আধুনিক যুগের আইনজগতের দিকপাল বলে খ্যাত (অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কিতও) ব্রিটিশ বিচারপতি লর্ড ডেনিং (২৩ জানুয়ারি ১৮৯৯-৫ মার্চ ১৯৯৯) নিজেই। এতটাই যে, ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে হাউজ অব লর্ডস-এ আসীন হলে নিজের ‘কোট অব আর্মস’-এ (Coat of Arms, নকশাদিখচিত কুলমর্যাদা-ফলক) পর্যন্ত এই ‘ফিয়্যাট জাস্টিসিয়্যা রুয়্যাট সিলাম’ আপ্তবচনটি খচিত করেন। যার একপাশে তার এক ভাবগুরু স্যার এডওয়ার্ড কোকের, আরেক পাশে আরেক ভাবগুরু লর্ড ম্যানসফিল্ডের প্রতিকৃতিও খচিত ছিল। আসলে সেই আপ্তবচনের জন্মের পেছনে রয়েছে সাংঘাতিক এক অবিচারকে প্রশ্রয় দেওয়ার নিষ্ঠুর প্রহসন। তাও লিখে গেছেন লর্ড ডেনিং ‘মাস্টার অব দ্য রোল’ পদ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ স্বেচ্ছাবসরে (বাধ্য হয়ে) যাওয়ার এক বছর আগে ১৯৮১-এর ডিসেম্বরে প্রকাশিত তার আত্মজীবনীমূলক ‘দ্য ফ্যামিলি স্টোরি’ গ্রন্থে।

লর্ড ডেনিং সেই কাহিনী পেয়েছিলেন সেনেকার ‘ডায়ালগ’ থেকে। সেনেকা ছিলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের সিনেটরদের একজন, জেনোর অনুসারী নিরাসক্তবাদী দার্শনিক, নাট্যকার, স্যাটায়ারিস্ট। ছিলেন ৪৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে নিরোর বাল্যশিক্ষক, ৫৪ খ্রিস্টাব্দে ১৭ বছরের নাবালক নিরো সম্রাট হলে নামকাওয়াস্তে তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা। হ্যাঁ, সেই নিরো, রোম যখন পুড়ছিল তখন যিনি বাঁশি বাজাচ্ছিলেন বলে কথিত (বাঁশি বাজানোটা সত্যিকারার্থেই নাকি রূপকার্থে সেটা বিতর্কিত)। ৬৪ খ্রিস্টাব্দের সপ্তাহব্যাপী জ্বলা সেই অগ্নিকাণ্ডে তখনকার রোমের ১৪টি জেলার তিনটি একেবারেই ছাই, আর ৭টির হয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। নিরো সেনেকার উপযুক্ত শিষ্য নয়, হয়েছিলেন চাটুকার পরিবেষ্টিত বখে যাওয়া সম্রাট। সেনেকা বাধ্য হয়ে ৬২ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যের কাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে দূরে জন্মভূমি হিস্পানিয়ার কর্ডুবায় ডুবে থাকতেন অধ্যয়ন আর লেখালেখিতে। ৬৫ খ্রিস্টাব্দে গায়াস ক্যালপার্নিয়াস পিসো (৪১ খ্রিস্টাব্দের কনসাল, পরে প্রভাবশালী সিনেটর) সম্রাট নিরোকে গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্র আঁটেন। সেটি ফাঁস হয়ে যায়। আর, তাতে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় সেনেকাকেও। পিসোর সঙ্গে সেনেকাকেও স্বেচ্ছামৃত্যুর (ফোর্সড সুইসাইড) দণ্ড দেন সম্রাট নিরো। কার্যকর হয় ‘এক্সযাংগুইনেশন’ পদ্ধতিতে। ৭০ বছরের এই প্রবীণ জ্ঞানীকে স্বেচ্ছায় শুধু নিজের শিরাগুলো কেটে কেটে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুকে বরণ করতে হয়। এও এক শিক্ষা ইতিহাসের, শাসক-প্রশাসকরা জ্ঞানীগুণী বুদ্ধিজীবী কারও হিতোপদেশ কানে তোলে না; উল্টো তাদের কানে ধরে গর্দান নেয়। মূর্খদের  স্তাবকতাই তাদের আকৃষ্ট করে, বিমোহিত করে। হিতোপদেশদাতার পেছনে লাগে চাটুকার কুচক্রী দল, হিতে বিপরীত হয়ে বিপদ নেমে আসে তারই ঘাড়ে। আজকের বুদ্ধিমান বুদ্ধিজীবীরা কি স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেবে!

সেনেকার ‘ডায়ালগ’-এ আছে, সেই ল্যাটিন আইনি-শাস্ত্রবচনের উদ্গাতা হলেন প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের এক বদমেজাজি সেনাপতি আরেক পিসো। পুরো নাম, গ্ন্যায়াস ক্যালপার্নিয়াস পিসো; ৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কনসাল হিসেবে ইতিহাসে পরিচিত। এই পিসো ছিলেন রোমান রিপাবলিকের শেষ ডিক্টেটর বিশ্বজয়ী মহাবীর জুলিয়াস সিজারের (খ্রিস্টপূর্বাব্দ ১০০-৪৪) শ্বশুর পিসো সিজোনিনাসের অধস্তন জ্ঞাতি, ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট অগাস্টাসের আমলে ৩ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকার ও ৯ খ্রিস্টাব্দে হিস্পানিয়া প্রদেশের (বর্তমান স্পেন ও পর্তুগালের অংশবিশেষজুড়ে) প্রো-কনসাল। শেষে ছিলেন দ্বিতীয় সম্রাট টাইবেরিয়াসের আমলে ১৭-১৯ খ্রিষ্টাব্দে সিরিয়ার প্রশাসক (গভর্নর)। বদমেজাজি, গোঁয়ার, নিষ্ঠুর ও বেপরোয়া স্বভাবের এই পিসোর হিস্পানিয়াবাসীর ওপর চালানো নিষ্ঠুরতা বেশি কুখ্যাতি পায়।

এরই কোনো একসময় পিসোর বাহিনীর দুই সৈনিক, গেইয়াস ও আরেকজন রসদের খোঁজে বের হয় একসঙ্গে। ফিরে আসে অপর সৈনিকটি একাই। তার সঙ্গে গেইয়াস ফিরে না আসার সদুত্তরও দিতে পারে না সে। তবে তো গেইয়াসকে এই সৈনিকই খুন করে ফেলেছে বলে পিসো তক্ষুনি সাব্যস্ত করে তার শিরেদের হুকুম দেন এক সেন্টুরিয়ানকে (জল্লাদ)। সেন্টুরিয়ান যেই না কোপ তুলেছে অমনিই সশরীরে এসে খাড়া গেইয়াস নিজে। খাঁড়া ফেলে দিয়ে সেন্টুরিয়ান তখনই তাদের নিয়ে মহানন্দে যায় পিসোর কাছে, গেইয়াস খুন হয়নি দেখাতে। পিসো দেখেই ‘ফিয়্যাট জাস্টিসিয়্যা রুয়্যাট সিলাম’ বলে তিনজনেরই শিরেদের হুকুম দেন সঙ্গে সঙ্গে। তার যুক্তি একেবারে সোজা! সৈনিকটির মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই আছে, দণ্ড কার্যকর না করায় আদেশ লঙ্ঘনের অপরাধী সেন্টুরিয়ান, আর গেইয়াস তো বাকি দুজনের মৃত্যুদণ্ডের মূর্তিমান কারণ! সেনেকা বলছেন, ‘যেখানে একটিও অপরাধ ঘটেনি সেখানে এমন উদ্ভট যুক্তিতে তিন তিনটা অপরাধ খুঁজে পাওয়া সম্ভব কেবল ক্রোধে বিবেকহারা হলেই।’

এই হলো শাসক-প্রশাসকের হাতে চালানো আইনের গতির ন্যায়-বিচার! প্রসিকিউটর-তদন্তকারী-বিচারক একাই সব পিসো নিজে। সুকুমার রায়ের সেই ‘আমিই হবো উকিল হাকিম, আমিই হবো জুরি,’ সটান ফাঁসির হুকুম অমনি একেবারে! গেইয়াসের খোঁজ করার সময়টুকু দেওয়ারও তর সয় না। আদতে নিজের নিষ্ঠুর খেয়াল ঢাকার ভণ্ডামি লুকিয়ে আছে পিসোর সেই বচনের মধ্যে। আইনের এমন প্রহসনের গতিকে তাই বলা হয় ‘পিসোর জাস্টিস’। ইতিহাসের শিক্ষার করুণ পরিহাস এই যে, বর্জনীয় নজিরগুলোই অধিক সংক্রামক, অধিক দীক্ষণীয়। সেগুলোরই পুনরাবৃত্তি ঘটে নতুন নতুন রূপে। দেশে দেশে পিসোর প্রেতাত্মার ছায়া পড়ে শাসক-প্রশাসকদের চালানো আইনের গতিপথে, আদালতের বিচারের বাণীতে।

খোদ লর্ড ডেনিংয়ের কথাও তো পিসোর প্রেতাত্মার উক্তি বলে মনে হয় যখন তিনি বলেন, ‘এই ৬ জনের (বার্মিংহাম সিক্স-এর) মামলাটি বিচারে গেলে যদি তারা হারত তার অর্থ দাঁড়াত ফালতুই বহু মানুষের বিস্তর সময়-টাকা-পয়সা নষ্ট আর হয়রানি; আর যদি তারা জিতত তার অর্থ দাঁড়াত পুলিশ মিথ্যা সাক্ষী সাবুত বানানোর এবং হিংস্র আচরণে ভীতি প্রদর্শনের অপরাধী; তাহলে দোষ স্বীকারোক্তিগুলো দাঁড়াত অনিচ্ছাকৃত এবং সাক্ষ্য হিসেবে নেওয়াটাও ভুল; তাহলে তো দণ্ডাদেশগুলোই দাঁড়াত ভ্রমাত্মক। তাতে এমনই মারাত্মক অবস্থা হতো যে বোধসম্পন্ন সবাই বলত, এসব আর চলতে দেওয়া মোটেই ঠিক হতে পারে না।’ [‘বার্মিংহাম সিক্স’-এর ক্ষতিপূরণের দেওয়ানি মামলা ‘এস্টপেল’ (স্বীকৃতির বাধা) নীতিতে খারিজের আদেশে; সে কাহিনী আগেই বলেছি আমার ‘বেহুদা হাজতবাসের কী প্রতিকার৩’ লেখায়] আবার যখন তিনি বলেন, ‘জঘন্যতম খুনে ফাঁসিটা রাখাই উচিত ছিল। (যুক্তরাষ্ট্র থেকে মৃত্যুদণ্ড একেবারে উঠে যায় ১৯৬৯ সালে, উত্তর আয়ারল্যান্ড থেকে উঠে ১৯৭৩ সালে) এই ৬ জনের ফাঁসি হয়ে গেলে আজ আর তাদের মুক্তির এসব আন্দোলন প্রচারণা দেখতে হতো না। তারা বিস্মৃত হয়ে যেত আর সব মানুষ চুপ মেরে যেত। ইংরেজ বিচারব্যবস্থার বিশুদ্ধতাকে বিতর্কিত হতে দেওয়ার চেয়ে কিছু নির্দোষের জেল খাটাই বরং ভালো।’ [‘বার্মিংহাম সিক্স’-এর মুক্তির দাবী ইউরোপ-অ্যামেরিকায় ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষিতে করা মন্তব্যে; সে কাহিনীও বলেছি আমার ‘বেহুদা হাজতবাসের কী প্রতিকার৩’ লেখায়] ন্যায়-বিচারের নামে এমন প্রহসনকেও ‘পিসোর জাস্টিস’ বলে লোকে।

সংবিগ্ন : এই আপ্তবচন কেউ আওড়ালেই ভয় লাগে আবার না জানি কোনো নিষ্ঠুর খেয়াল ঢাকার ভণ্ডামি হচ্ছে! আমাদের যারা আইন, বিচার চালিয়ে যাচ্ছেন তারা নিজেরা বিবেচনা করে দেখবেন যেন আপনার কাজের কোনোটা আবার ‘পিসোর জাস্টিস’-এর মতো না ঠেকে কারও কাছে; আপনার উচ্চারিত আপ্তবচন চরম ভণ্ডামি মনে না হয় আইনের বলির (শিকারের) কাছে; আপনার ঘাড়ে পিসোর প্রেতাত্মা ভর করেছে বলে মনে না হয় অন্যের কাছে। পিসোর প্রেতাত্মার ছায়া যেন না পড়ে আপনার চালানো আইনের গতিপথে।

পুনশ্চ : শেষ রক্ষা হয়নি পিসোর। ২০ খ্রিস্টাব্দে তার বিরুদ্ধে ইনসাবোর্ডিনেশন (অবাধ্যতা), সামারি জাস্টিস (‘ধরো তক্তা মারো পেরেক’ মার্কা তড়িঘড়ি বিচার), দুর্নীতিসহ ৮টি অভিযোগে প্রকাশ্য বিচার হয়। সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হয়ে পদ ও সম্পত্তি যায়। ‘ডমনাটিও মেমোরিওয়াই’ (কনডেমনেশন অব মেমোরি, ঘৃণিত ব্যক্তি) হিসেবে সাম্রাজ্যের সব রেকর্ড থেকে তার নাম মুছে ফেলা হয়, তার সব মূর্তি-প্রতিকৃতি অপসারণ করা হয়। দণ্ড শোনার আগেই আত্মহত্যা করেন পিসো। অবশ্য, সেকালের অন্যতম রোমান ঐতিহাসিক ট্যাসিটাসের (৫৬-১২০ খ্রিস্টাব্দ) মতো অনেকের ধারণা সম্রাট টাইবেরিয়াসই পিসোকে খুন করিয়ে থাকতে পারেন, যেন প্রতিদিনের খাবারে গোপনে বিষ মিশিয়ে টাইবেরিয়াসের ভাইপো-পৌষ্যপুত্র ও সাম্রাজ্যের নির্বাচিত উত্তরাধিকারী জার্মানিকাসকে মেরে ফেলার পেছনে টাইবেরিয়াসের নিজের হাতের কথা ফাঁস না হয়ে যায় পিসোর মুখ দিয়ে।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

moyeedislam@yahoo.com