পুঁজিবাজারসহ অনুৎপাদনশীল খাতে প্রণোদনা ঋণের অপব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো হালনাগাদ তথ্য না থাকার পরও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন পদক্ষেপের প্রভাবে পুঁজিবাজারে তারল্য প্রবাহ কমতে পারে বলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যার প্রভাবে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে মূল্যসূচক কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজারে যে ধারাবাহিক উত্থান চলছিল, সেটা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে।
আগের দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও ডিএসইতে বেশিরভাগ শেয়ারের দরহ্রাসে প্রধান মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ২৪ পয়েন্ট কমে যায়। এ নিয়ে গত দুই দিনে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৪৪ পয়েন্টের বেশি হারিয়েছে। অবশ্য লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।
প্রণোদনার ঋণ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কতা বিষয়ে এসইসির কমিশনার ড. শেখ সামসুদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রণোদনার ঋণের টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হয়েছে, এমন কোনো তথ্য আমরা পাইনি। এ বিষয়ে দুয়েকটি গণমাধ্যমে যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে এবং সেখানে যাদের উদ্ধৃত করা হয়েছে, সেখানেও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। শুধুমাত্র ধারণা থেকে তা বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, পুঁজিবাজার একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গা। এখানে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রদান করা উচিত নয়। এ বিষয়ে আমাদের আইনেও পরিষ্কার করে বলা আছে।
সামসুদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, পুঁজিবাজারে প্রণোদনার ঋণের অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, এমন তথ্য আমাদের সুনির্দিষ্টভাবে জানালে আমরা খুঁজে দেখতাম। আমরাও জানতে চাই কোথা থেকে বিনিয়োগ আসছে। কিন্তু আমাদের এমন কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের পুঁজিবাজার মূলত সাধারণ বিনিয়োগকারীনির্ভর। প্রণোদনার ঋণের টাকা যদি এসেই থাকে, তা হবে বড় অঙ্কের। কিন্তু তেমন বিনিয়োগ আমাদের নজরে আসেনি। তাই এ জাতীয় মন্তব্য নিয়ে বিনিয়োগকারীদের চিন্তিত হওয়ারও কিছু নেই।
গত রবিবার করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ অন্য খাতে ব্যবহার না করার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত এক বছর ধরে পুঁজিবাজারের ধারাবাহিক উত্থানে প্রণোদনার অর্থ বিনিয়োগ হতে পারে বলে সন্দেহ করছেন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তারা। করোনাভাইরাসের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ অন্য খাতে ব্যবহার না করার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাছাড়া প্রণোদনার ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের মাধ্যমে যাচাইপূর্বক নিশ্চিত হওয়ার জন্যও পুনর্নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সতর্কতা জারির পর গত সোমবারের মতো গতকালও লেনদেনে অস্থিরতা দেখা গেছে। অনেকেই পূর্ব সতর্কতার অংশ হিসেবে শেয়ার বিক্রি করে সাইড লাইনে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আবার অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার না কিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেন। মুনাফাও তুলে নিয়েছেন কেউ কেউ।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সকালে লেনদেন শুরুর প্রথম ১৫ মিনিটে সূচক কমলেও পরে তা পুনরুদ্ধার করতে দেখা যায়। তবে বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে বিক্রিচাপ বেড়ে যাওয়ায় বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়ে সূচক কমতে শুরু করে, যা লেনদেনের শেষ সময় পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দিনশেষে ডিএসইর প্রধান সূচকটি আগের দিনের চেয়ে ২৪ পয়েন্ট হারিয়ে ৬৩৭৯ পয়েন্টে দাঁড়ায়।
গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৭৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দর বেড়েছে ১৫৩টির, কমেছে ১৯৪টির ও অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির দর। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া খাতগুলোতে মিশ্র প্রবণতা দেখা যায়। সূচকে প্রভাব রাখা ব্যাংক, এনবিএফআই, সিমেন্ট, প্রকৌশল, খাদ্য ও অনুষঙ্গ, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং বিবিধ খাত দর হারিয়েছে। বিপরীতে সাধারণ বীমা, টেলিযোগাযোগ, বস্ত্র, সেবা ও নির্মাণ, কাগজ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ট্যানারি খাতের বাজার মূলধন বেড়েছে।
এদিকে প্রণোদনার ঋণের অপব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্কতা জারির পর থেকে গত দুদিন পুঁজিবাজারে লেনদেনের পরিমাণ বাড়তে দেখা গেছে। গত রবিবারের তুলনায় সোমবার ডিএসইতে লেনদেন বাড়ে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশ। আর আগের দিনের তুলনায় গতকাল ডিএসইতে লেনদেন ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। খাতওয়ারি হিসাবে গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের নেতৃত্বে ছিল বীমা খাত। ডিএসইর মোট লেনদেনের ১৫ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। এছাড়া লেনদেনের পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রকৌশল, ব্যাংক ও জ¦ালানি খাত।
একক কোম্পানি হিসেবে লেনদেনের শীর্ষে উঠে এসেছে সাইফ পাওয়ারটেক। গতকাল ডিএসইতে এ কোম্পানির শেয়ারের লেনদেন হয়েছে ৬৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত কয়েক মাস ধরে লেনদেনের শীর্ষে বেক্সিমকো লিমিটেড নেমে এসেছে তৃতীয় অবস্থানে। সদ্য তালিকাভুক্ত কোম্পানি বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এছাড়া জিপিএইচ ইস্পাত, বিএটি বাংলাদেশ, এনআরবিসি ব্যাংক, ফু-ওয়াং সিরামিক ও একটিভ ফাইন কেমিক্যালস লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় রয়েছে।