টিকা দেওয়ার মাধ্যমে করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ন্ত্রণে আনতে চায় সরকার। সেই লক্ষ্যে আগামী ৭ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ের টিকাদান কেন্দ্রে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিয়ে গেলেই করোনার টিকা পাওয়া যাবে। তবে চলমান কঠোর বিধিনিষেধ ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। শিল্পপতি ও মালিকদের পোশাক শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ার
প্রস্তাবও নাকচ করা হয়েছে। ফলে বিধিনিষেধ চলাকালে আর পোশাক শিল্পকারখানা খুলছে না। গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে ‘কভিড-১৯ প্রতিরোধকল্পে আরোপিত বিধিনিষেধের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও কডিড-১৯ প্রতিরোধক টিকা প্রদান কার্যক্রম জোরদারকরণ’ শীর্ষক সভা শেষে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান।
বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জে. ওয়াকার উজ জামান এসজিপি, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মোকাব্বির হোসেন, মহাপুলিশ পরিদর্শক ড. বেনজীর আহমেদ, সেনাবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি, নৌবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধি, বিমানবাহিনী প্রধানের প্রতিনিধিসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আগামী ৫ আগস্ট পর্যন্ত লকডাউন চলবে। লকডাউন যাতে আরও কঠোর হয় সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করছি অন্যান্য দেশের মতো সংক্রমণ ধীরে ধীরে কমে আসবে। টিকা কার্যক্রম জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। এনআইডি কার্ড নিয়ে যে যাবেন তাকেই টিকা দেওয়া হবে। জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতাসহ সবাইকে টিকা কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে। আমরা টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করব। যে টিকা আছে তা দিয়েই শুরু করব।’
কবে থেকে এ সুবিধা চালু হচ্ছে, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী ৭ আগস্ট থেকে এ কার্যক্রম শুরু করছি। আপনারা দেখেছেন পৃথিবীর যেখানেই টিকা দেওয়া হয়েছে সেখানেই সংক্রমণের গতি কমে গেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও এ দৃশ্যটা দেখেছি। সে কারণেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আমাদের টিকার কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। তিনটি বিষয়ে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। আমরা সবাই মাস্ক পরব, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলব এবং সবাই টিকা নেব। এটাই হলো আমাদের মূল কথা। যারা সম্মুখসারির যোদ্ধা তারা টিকার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। নেভি, এয়ার ফোর্স, কোস্টগার্ড, বিজিবিসহ সব বাহিনীর সদস্যদের টিকার আওতায় আনা হবে। সেই সঙ্গে সম্মুখসারির যোদ্ধাদের পরিবারের ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সবাইকে টিকার আওতায় আনা হবে। যাদের বয়স ৫০-এর বেশি তাদের সংক্রমণের হার ৭৫ শতাংশ; অথচ এদের মধ্যে টিকা নেননি ৯০ শতাংশ। পঞ্চাশোর্ধ্ব সব নাগরিককে টিকার আওতায় আনতেই হবে। যারা টিকা দিচ্ছেন তারাই টিকা দেওয়ার কার্যক্রম চালাবেন। তবে সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, নেভিসহ বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বাহিনী তদারকি করবে।’
বিধিনিষেধে পোশাক কারখানা খোলার প্রস্তাব নাকচ করার ইঙ্গিত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শিল্পপতিরা অনুরোধ করেছিলেন, আমরা সেই রিকোয়েস্ট গ্রহণ করতে পারছি না। ঈদের পর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে শিল্পকারখানা খোলা রাখতে রপ্তানি খাতের পাঁচটি সংগঠন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে। এতে বস্ত্রশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ), পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) ও নিটওয়্যার শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ গার্মেন্টস এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি এবং বাংলাদেশ টেরিটাওয়েল অ্যান্ড লিনেন প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির নেতারা অংশ নেন। শিল্পকারখানা বন্ধ রাখলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে সে বিষয় তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠিও দিয়েছিলেন তারা।’
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘লকডাউনের মাধ্যমে করোনা রোধ করা যাবে না। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এজন্য টিকাদানে জোর দেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্র খোলা হবে। যারা জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে আসতে পারবেন তাদের টিকা দেওয়া হবে। টিকা আরও হাতে এলে ওয়ার্ড পর্যায়েও টিকা কার্যক্রম শুরু হবে। বর্তমানে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স যাদের তাদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এজন্য তাদের দ্রুত ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্রে এনআইডি নিয়ে এসে টিকা নিতে হবে।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘যাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ নেই, তাদের “বিশেষ ব্যবস্থায়” কভিড টিকা দেওয়া হবে। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সে ব্যাপারে সরকার পদক্ষেপ নেবে।’
বৈঠক সূত্র জানায়, করোনার টিকা দেওয়ার গতি বাড়াতে ৭ আগস্ট থেকে দেশে বিদ্যমান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কার্যকর করা হবে। গ্রামপর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্য অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রগুলোও কাজে লাগানো হবে। দিনে সাড়ে ৮ লাখ করে প্রতি সপ্তাহে ৬০ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। ২০২২ সালের এপ্রিল নাগাদ দেশে আসবে ২১ কোটি ডোজ টিকা। চীনের সিনোফার্মের তিন কোটি ডোজ, অ্যাস্ট্রাজেনেকার তিন কোটি ডোজ, কোভ্যাক্সের আওতায় সাত কোটি এবং জনসন অ্যান্ড জনসনের সাত কোটি ডোজ টিকা আনতে এরই মধ্যে চুক্তি বা আলোচনা শেষ হয়েছে।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});করোনাভাইরাসের সংক্রামক ডেল্টা ধরনের বিস্তারে দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকায় কভিড সংক্রান্ত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশে গত ১ জুলাই থেকে এক সপ্তাহের জন্য সরকার সারা দেশে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। দেওয়া হয় ২১টি নির্দেশনা। এ সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া অন্যসব অফিস-আদালত বন্ধ, যান্ত্রিক যানবাহনে যাত্রী বহনও নিষিদ্ধ। বিধিনিষেধ বাস্তবায়নে পুলিশ, র্যাব, বিজিবির পাশাপাশি ‘আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’ বিধানের আওতায় মাঠে আছে সশস্ত্র বাহিনী। জনসাধারণকে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। রাস্তায় বের হয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে না পারলে করা হচ্ছে গ্রেপ্তার ও জরিমানা।