কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরসহ উখিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালীতে প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড় ধসে, পানিতে ভেসে গিয়ে এবং দেয়ালচাপায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ও দুপুরে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১০ নম্বর ও ১৮ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির, টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরঘোনা এলাকা এবং মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের উত্তর সিপাহিপাড়ায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।
এতে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ৪ শিশুসহ ৬ জনের, টেকনাফে এক বৃদ্ধের এবং মহেশখালীতে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়।
নিহতরা হলেন, উখিয়ার ১০ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের জি-৩৭ ব্লকের বাসিন্দা শাহ আলমের স্ত্রী দিল বাহার (৪২), তার ছেলে শফিউল আলম (৯), একই ক্যাম্পের জি-৩৮ ব্লকের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফের স্ত্রী দিল বাহার (২৫), তার মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১), ছেলে আব্দুর রহমান (২), টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মনিরঘোনা এলাকার আলী আহমদের ছেলে রকিম আলী (৫৫) এবং মহেশখালী উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের উত্তর সিপাহিপাড়ার আনসার হোসেনের মেয়ে মোর্শেদা বেগম (১৭)।
আহতরা হলো উখিয়ার ১০ নম্বর রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের জি-৩৭ ব্লকের বাসিন্দা শাহ আলমের ছেলে জানে আলম (৮) এবং মেয়ে নুর ফাতেমা (১০)।
তবে উখিয়ার ১৮ নম্বর শরণার্থী শিবিরে খালের পানির স্রোতে ভেসে গিয়ে মারা যাওয়া রোহিঙ্গা শিশুর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা।
এদিকে গতকাল সকাল থেকে ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিম্নাঞ্চলের শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা জানান, উখিয়ার বালুখালী ১০নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে ৫ জন নিহত ছাড়াও একই এলাকার ৮নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভারী বর্ষণের পর এক রোহিঙ্গা শিশু পানিতে ভেসে গেছে। তবে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ভারী বর্ষণে পাহাড় ধসে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শতাধিক ঝুপড়ি ঘর নষ্ট হয়েছে। প্লাবিত হয়েছে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-৫, বালুখালী ১নং ক্যাম্প, টেকনাফের ২৬নং ক্যাম্প, জামতলী ক্যাম্প, হাকিমপাড়া, ২৪নং ক্যাম্প, ২৭নং ক্যাম্প ও মধুছড়াসহ আরও বেশকিছু ক্যাম্প। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢলে এসব বসতির রোহিঙ্গারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিজাম উদ্দিন আহমদ গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভারী বর্ষণে দুপুর ১টার দিকে উখিয়ায় রোহিঙ্গা বালুখালী ১০নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে শিশুসহ এই পর্যন্ত ৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় আরও ২ জন রোহিঙ্গা আহত হয়েছে। আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’
টেকনাফের ইউএনও মো. পারভেজ চৌধুরী জানান, অতিবৃষ্টির ফলে পাহাড় ধসে রকিম আলী নামে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের মনিরঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
তিনি আরও জানান, সকালে ভারী বর্ষণের সময় পাহাড়ের পাশে নিজ বাড়িতে অবস্থান করছিলেন নিহত রকিম আলী। এ সময় হঠাৎ উপর থেকে পাহাড় ভেঙে তার বাড়ির ওপর পড়লে রকিম আলী প্রথমে গুরুতর আহত হন। পরে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে বালুখালী তুর্কি হাসপাতালে নিলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। উপজেলা প্রশাসন থেকে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহায়তাসহ পাহাড়ে বসবাসরত মানুষদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহফুজুর রহমান জানান, সকাল থেকে ভারী বর্ষণে উপজেলার ছোট মহেশখালী ইউনিয়নের সিপাহিপাড়া এলাকায় পাহাড় ধসে পড়ে মোর্শেদা বেগম (১৭) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে আরও দুজন।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুর রহমান জানিয়েছেন, গতকাল জেলাজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার জেলায় ১৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আজ বুধবারও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে পাহাড় ধসের সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে গতকাল ভোর সকাল থেকে সারাদিন টানা ভারী বৃষ্টিতে কক্সবাজার জেলার শতাধিক নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলে জেলার চকরিয়া, রামু, পেকুয়া, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার শহরতলীর বাজারঘাটা, কলাতলী, চরপাড়া, কাঙ্গালীপাড়া, সমিতিপাড়া, নাজিরারটেক, সদর উপজেলার খুরুশকুল, চৌফলদ-ী, পিএমখালী, পোকখালী, মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা, মাতারবাড়ি, ঘটিভাঙ্গা, পেকুয়া উপজেলার মগনামা, উজানটিয়া, চকরিয়া উপজেলার মাতামুহুরি, কুতুবদিয়া উপজেলার উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং, আলী আকবর ডেইল ও তাবলারচর এলাকাসহ পাশর্^বর্তী এলাকার অন্তত ৭০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। একই সঙ্গে সাগরের জলোচ্ছ্বাস ও পাহাড়ি ঢলে এক হাজার একরেরও বেশি চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়েছে পানের বরজ ও ধানসহ বিভিন্ন সবজির ফসল।