করোনা মহামারীর দেড় বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সময় পার করছে বাংলাদেশ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ‘আপ্রাণ’ চেষ্টায়ও ফল মিলছে না। প্রতিদিনই সংক্রমণ বা মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে দেশে। শুরুর দিকে শহরগুলোতে সংক্রমণ বেশি থাকলে এখন গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। গতকাল বুধবারও দেশে ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই সময়ে দেশে মৃত্যুও হয়েছে তৃতীয় সর্বোচ্চ। ঢাকা মহানগর ছাড়া এই মৃত্যু ও সংক্রমণের বড় অংশই গ্রামের। পাশাপাশি গ্রামে করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুও বাড়ছে। অনেকেই সর্দি-কাশি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। টেস্ট করাচ্ছেন না। চিকিৎসকের কাছেও যাচ্ছেন না। যার ফলে মৃত্যু বাড়ছে।
গতকাল চাঁদপুরের কচুয়ায় করোনার উপসর্গ নিয়ে পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে এসে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। নমুনা দিতে সকাল ১০টার দিকে কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন কামরুন্নাহার (৪০) নামে ওই নারী। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়। কামরুন্নাহারের স্বামী আব্দুর সাত্তার বলেন, ‘আমার স্ত্রী হৃদরোগী ছিলেন। তাছাড়া কয়েক দিন ধরে জ্বর, সর্দি ও কাশি থাকায় করোনা টেস্ট করার জন্য সকালে কচুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসলে করোনা পরীক্ষার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।’
কচুয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সালাউদ্দীন মাহমুদ বলেন, ‘ওই নারী বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় নমুনা দিতে আসেন। নমুনা দিতে আসা ৭৭ জনের মধ্যে তার সিরিয়াল ছিল ১২। তিনি নমুনা ফরম পূরণ করে অপেক্ষাকালে হঠাৎ করে ৯টা ৪৫ মিনিটের দিকে মাথা ঘুরে পড়ে যান। পরে তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তিনি চেয়ারে বসা অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করেন।’
এই চিকিৎসকের ভাষ্য, করোনাকে গুরুত্ব না দেওয়া ও এর সম্পর্কে সচেতনতার অভাবে এই ধরনের অনেক মৃত্যুই হচ্ছে মফস্বলে। দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্যেও উঠে এসেছে বিষয়টি।
সিলেটে মৃত্যু ও শনাক্তে রেকর্ড : সিলেট বিভাগে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুও। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে করোনায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত এক দিনে করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা। এদিকে ১ হাজার ৮৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭৩৬ জনের, যা সিলেট বিভাগে এক দিনে সর্বোচ্চ শনাক্তের ঘটনা। এখন পর্যন্ত এ বিভাগে মোট করোনা শনাক্ত হয়েছে ৩৭ হাজার ৬৫৪ জনের। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় থেকে দেওয়া কভিড-১৯ সংক্রান্ত দৈনিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিলেট বিভাগে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি থামাতে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বিকল্প নেই। লোকজনকে বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এ ছাড়া টেস্ট করে আইসোলেশনে না নিলে সংক্রমণ ঠেকানো অসম্ভব বলে মত তার।
বরিশালে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৮৫৪ : বরিশাল বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ৮৫৪ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ৪১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে করোনা ও উপসর্গ নিয়ে ১৩ জন মারা গেছে। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ হয়ে ৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ৮ জন মারা যায়। আগের ২৪ ঘণ্টায় মারা গিয়েছিল ২০ জন। তাদের মধ্যে ৯ জনের করোনা পজিটিভ ছিল।
খুলনা বিভাগে করোনায় আরও ৩১ জনের মৃত্যু : খুলনা বিভাগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে কমেছে মৃত্যু ও শনাক্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে বিভাগে আরও ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে শনাক্ত হয়েছে ৮৬৬ জনের। এ নিয়ে বিভাগে করোনা শনাক্তের সংখ্যা ৯০ হাজার ছাড়িয়েছে। গতকাল বুধবার দুপুরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এর আগে গত মঙ্গলবার খুলনা বিভাগে ৪৬ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৪৩৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছিল।
রামেক হাসপাতালে ১৮ মৃত্যু : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে বুধবার সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মৃতদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৬ জন ও উপসর্গে ১২ জন মারা গেছে।
টাঙ্গাইলে শনাক্ত ১৯৫ : টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুইজন ও উপসর্গ নিয়ে একজন মারা গেছে। জেলায় এদিন নতুন করে ৭০৭টি নমুনা পরীক্ষায় ১৯৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ।
গাজীপুরে এক দিনে ৩০৩ নতুন রোগী : গাজীপুরে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩০৩ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এ সময় করোনায় আক্রান্ত হয়ে ছয়জন মৃত্যুবরণ করেছে। গতকাল বুধবার গাজীপুরের সিভিল সার্জন মো. খায়রুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু মেডিকেলে ১৭ জনের মৃত্যু : ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। ফরিদপুরের সিলিভ সার্জন ডা. ছিদ্দীকুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ফরিদপুর পিসিআর ল্যাবে ৪৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ১৬৯ জনের। শতকরা হারে যা ৩৫.৯৫ শতাংশ। ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা এবং উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ১৭ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে করোনায় ৭ জন এবং উপসর্গে ১৯ জন। এই হাসপাতালের করোনা আক্রান্ত চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৪ জন রোগী।
বগুড়ায় করোনায় ২১ জনের মৃত্যু : বগুড়ায় তিনটি হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ২১ জন মারা গেছে। এর মধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে ৮ জন ও উপসর্গ নিয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনটি হাসপাতালে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় তাদের মৃত্যু হয়। বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন বুধবার বেলা ১১টার দিকে অনলাইন ব্রিফিংয়ে জেলার করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
চট্টগ্রামে শনাক্ত ৯১৫ : চট্টগ্রামে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় কভিড আক্রান্ত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনাক্ত হয়েছে নতুন করে ৯১৫ জন। এই নিয়ে মোট আক্রান্ত পৌঁছেছে ৭৮ হাজার ৪৩৬ জনে। গতকাল বুধবার সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রেরিত করোনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তদের মধ্যে নগরীর ৬৪১ জন এবং উপজেলার ২৭৪ জন। সংক্রমণ হার ৩২.৭৭ শতাংশ। আর কভিডে মারা যাওয়া ১৭ জনের মধ্যে উপজেলার ১০ জন এবং নগরীর ৭ জন।