কক্সবাজারে ভারী বৃষ্টিতে দুটি পাহাড়ধসে এক পরিবারের পাঁচ শিশুসহ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি গবাদিপশু মারা গেছে। গতকাল বুধবার ভোরে টেকনাফ ও মহেশখালী উপজেলায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ধসের ঘটনায় মাটিচাপা পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে বেশকিছু বাড়িঘর। এছাড়া গতকাল কক্সবাজারের উখিয়া ও ঈদগাঁও এবং পার্শ¦বর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে আলাদা ঘটনায় বন্যার পানিতে ডুবে আটজনের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বৃষ্টিপাতে কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলার শতাধিক গ্রামের অন্তত দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া পাউবোর সংস্কারবিহীন বেড়িবাঁধ দিয়ে সাগরের জোয়ারের পানি ঢুকে লোকালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে :
টেকনাফে পাহাড়ধসে একই পরিবারের পাঁচ শিশু মারা গেছে। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে হ্নীলা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়ি গ্রাম ভিলেজারপাড়ার সৈয়দ আলমের বাড়ির ওপর একটি পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়ে। পাহাড়ধসের পর মাটির নিচে চাপা পড়ে যাওয়া সৈয়দ আলমের পাঁচ সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে প্রতিবেশীরা। নিহতরা হলো ছেলে আবদু শুক্কুর (১৬), মোহাম্মদ জুবাইর (১২), আবদুর রহিম (৫), মেয়ে কহিনুর আক্তার (৯) ও জয়নবা আক্তার (৭)।
টেকনাফ থানার ওসি মো. হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মধ্যরাতে সৈয়দ আলমের বাড়িতে পাহাড়ধসে তার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মৃত্যুর পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে টেকনাফ থানার পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।’
মহেশখালীতে পাহাড়ধসে আলী হোসেন (৯০) নামে একজন নিহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে হোয়ানক ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজুয়ার ঘোনা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আলী হোসেন একই এলাকার প্রয়াত রফিক উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আবু বকর জানান, দুদিন ধরে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ধসে বৃদ্ধ আলী হোসেনের বাড়িতে মাটির বড় বড় চাকলা ঢুকে পড়ে। পরিবারের অন্যান্য সদস্য বের হতে পারলেও ঘরে আটকে পড়েন তিনি। এ সময় একটি গরু ও একটি ছাগলও মাটিচাপা পড়ে মারা যায়।
উখিয়া, ঈদগাঁও ও ঘুমধুমে বন্যার পানিতে ডুবে আটজনের মৃত্যু : কক্সবাজারের উখিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে আলাদা ঘটনায় বন্যার পানিতে ডুবে আটজন মারা গেছে।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী জানান, গতকাল সকাল ১০টার দিকে আবদুর রহমান (৪৫) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত মঙ্গলবার ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলে বন্যার সৃষ্টি হলে পালংখালীর চুয়াখোলা খাল পার হতে যাওয়ার পর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য হেলাল উদ্দিন জানান, উখিয়ার মাছকারিয়া খাল থেকে আলী আকবর (৪০) নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পাওয়া যায়। নিহত আলী আকবর রাজাপালং ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ধইল্যাঘোনা এলাকার হাবিবুর রহমানের ছেলে।
একই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী জানিয়েছেন, গতকাল সকালে দুছরী খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় মালিয়ারকুল এলাকার মো. ইসলামের ছেলে মো. রুবেল (২২) নিখোঁজ হন। পরে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কোটবাজারের পাশে রুমখা কুলালপাড়া (কোয়ারপাড়া) এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঈদগাঁও উপজেলায় ঢলের পানিতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল। ফায়ার সার্ভিসের রামু স্টেশনের প্রধান সৌমেন বিশ্বাস জানান, ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরির দল গতকাল সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঈদগাঁও খাল থেকে নিখোঁজ তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতরা হলো দরগাহপাড়ার ফারুখ (২৮), দেলোয়ার (১৫) ও মোর্শেদ (৭)।
অন্যদিকে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে বন্যার ঢলের সময় নদী পার হতে গিয়ে শীলপাড়া গ্রামের সুবাস বড়ুয়ার ছেলে আশীষ বড়ুয়া (১৬) পানিতে ডুবে মারা যায়। এছাড়া আবদুর রহিম (২৮) নামে এক রোহিঙ্গা যুবক বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন। ঘুমধুম পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেন এ দুজনের মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছেন।
পানিবন্দি ২ লাখ মানুষ : ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত দুই লাখ মানুষ। জেলার প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলি জমি।
কক্সবাজার জেলার সদর, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, উখিয়া, টেকনাফ ও মহেশখালী উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে ২০টি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম। এসব গ্রামের দুই লাখেরও বেশি মানুষ জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে পাহাড়ে বসবাসরত লক্ষাধিক পরিবার। এসব পরিবারকে দ্রুত সরিয়ে না নিলে পাহাড়ধসে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। টানা ভারী বর্ষণে জেলার গ্রামীণ সড়কগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যায় এ পর্যন্ত ৫১ হাজার ১৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কক্সবাজারে টানা ভারী বর্ষণের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া অব্যাহত রয়েছে। আজ (গতকাল) সকাল থেকে কক্সবাজার শহরের ঘোনারপাড়া, বাদশাঘোনা, রাডার স্টেশন ও সার্কিট হাউজের পাহাড়ের নিচের এলাকায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সচেতনতা অভিযান পরিচালিত হয়। উপজেলা পর্যায়েও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারীদের সরে যেতে সচেতনতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।’
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আবদুর রহমান জানিয়েছেন, গতকালও জেলা জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজার সদরে ১১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে টেকনাফে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় টেকনাফে ৩২৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। যা গত কয়েক বছরেও হয়নি।
চকরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে ও মাতামুহুরীর নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও পাহাড়ে বসবাসরতদের সরিয়ে আনার জন্যও কাজ করছি।’
রামুর ইউএনও প্রণয় চাকমা বলেন, ‘গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়াসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে পানিবন্দি লোকজনকে উদ্ধারের পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। রাতে রামুর অফিসেরচর গ্রামে রামু-মরিচ্যা সড়কের পাশে বেড়িবাঁধ বিচ্ছিন্ন থাকায় নদীর পানিতে এলাকাটি প্লাবিত হতে থাকে। সড়ক প্রশস্তকরণ কাজের ঠিকাদারকে জরুরি ভিত্তিতে বিচ্ছিন্ন হওয়া বেড়িবাঁধ সংস্কারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
পেকুয়া উপজেলার চার উপকূলীয় ইউনিয়ন পেকুয়া, মগনামা, উজানটিয়া ও রাজাখালী ইউনিয়নে গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া টানা ভারী বর্ষণে এসব উপকূলীয় ইউনিয়নের প্রায় শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এছাড়া উজানটিয়া ইউনিয়নের সুতাচূড়া এলাকায় পাউবোর বেড়িবাঁধ দিয়ে সাগরের জোয়ারের পানি ঢুকে লোকালয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গতকাল সকালে মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোতাছেম বিল্লাহ।
পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণের কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের লোকালয় প্লাবিত হয়েছে। ভারী বর্ষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।’