পুঁজিবাজারে প্রণোদনার টাকা বিনিয়োগের তদন্ত হবে : অর্থমন্ত্রী

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া আর্থিক প্রণোদনার টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ হওয়ার কথা নয়। কারণ প্রণোদনার টাকা দেওয়ার সময় খাত উল্লেখ করে দেওয়া হয়েছে। এরপরও প্রদত্ত ঋণের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত এবং সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে অনলাইন ব্রিফিংয়ে মুস্তফা কামাল সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।

সম্প্রতি শেয়ারবাজারে সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। এর পেছনে সরকারের দেওয়া প্রণোদনার টাকা বিনিয়োগ ভূমিকা রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর ২ শতাংশ প্রণোদনা দিচ্ছি। প্রণোদনার প্যাকেজের ঋণের টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের বিষয়ে তথ্য আমি পাইনি। এখন এটি ভেরিফাই করব এবং পরবর্তী সভায় জবাব দেব।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রণোদনা’ প্যাকেজের যেগুলো কভিড রিলেটেড সেগুলো স্পেসিফাইড করা আছে কোন খাতে কত ব্যয় করব। সেই খাত বাদ দিয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। এই টাকা সরাসরি ট্রান্সফার করেছি। যার জন্য টাকাটি অনুমোদিত হয়েছে তাকেই পাঠিয়েছি। সুতরাং সেই টাকা রিসিভ করে সে কী করবে সেটা পরবর্তী পর্যায়ে ভেরিফাই করতে হবে। আগামীতে দেখব যদি এ ধরনের আরও কোনো ঘটনা ঘটে, যদিও আমার বিশ্বাস ঘটেনি। কারণ কোন কোন খাতে কোন কোন সেক্টরকে টাকা দিয়েছি সবার জানা, সেখান থেকে টাকা পুঁজিবাজারে যাওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেফারেনস যেহেতু দেওয়া হয়েছে, এটি আরও ভেরিফাই করতে হবে।’

এর আগে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে গত বছরে সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয় ব্যাংকগুলো। আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীদের ৪ শতাংশ সুদে দেওয়া হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের সুদহার ছিল ৯ শতাংশ। বাকি সুদের টাকা ভর্তুকি দেয় সরকার।

এদিকে গতকালের অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত বৈঠকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষ কর্র্তৃক চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে লালদিয়া চর এলাকায় ৫৯ দশমিক ৮৭ একর জমির ওপর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি)-এর আওতায় প্রস্তাবিত ‘কনস্ট্রাকশন অব লালদিয়া বাল্ক টার্মিনাল’ প্রকল্পটি পিপিপি তালিকা হতে বাদ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ইনিশিয়াল স্টেজে যে ধ্যানধারণা নিয়ে প্রকল্পটি করা হয়েছিল পরে দেখা গেছে সেটি সেভাবে করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনেক বেড়ে যায়, এখানেও চাহিদা বেড়ে গেছে।

পিপিপি বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পিপিপি কনসেপ্টটি থেকে ভালোভাবে আইডিয়া নিতে পারিনিএটা সত্যি। তারপরও কাজ শুরু হয়েছে। যৌথভাবে শুরু করলে এ সময়টা দিতে হবে। এসব বিষয় আমাদের ফেইস করতে হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলা করে আমরা এগিয়ে যাব।’

আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণায়ের অধীন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বর্ণাঢ্য ও যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-বিভাগের বছরব্যাপী গৃহীত কর্মসূচির মাধ্যমে সমাপনী ও অন্যান্য অনুষ্ঠান বাস্তবায়নে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম নিয়োগ, নগরসজ্জা এবং দেশে-বিদেশে ওয়ার্কশপ-সেমিনার-কনফারেন্স, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রদর্শনী আয়োজনসহ বিভিন্ন প্রকাশনা, ভিডিও, ডকুমেন্টারি, এলইডি স্কিন স্থাপন এবং আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সেবা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘যখন আমরা এটির অনুমোদন দিয়েছিলাম সেখানে আমাদের সমাপনী অনুষ্ঠানগুলো করা যায়নি করোনা সংক্রমণের কারণে। সমাপনীর জন্য যে অনুষ্ঠানগুলো করবেন দেশ এবং জাতিকে সারা বিশ্বের মানচিত্রে তুলে ধরার জন্য সেই প্রকল্পটি আজকে এসেছে। সমাপনী এখনো হয়নি।’

তিনি আরও জানান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীন বাংলাদেশ ডেটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের আওতায় ফোর টায়ার জাতীয় ডেটা সেন্টারের জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ওরাকল ক্লাউড ক্রয়ের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

ছয় প্রকল্প প্রস্তাব পাস : গতকাল অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনের জন্য তিনটি এবং ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদনের জন্য সাতটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল। ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দুটি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দুটি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একটি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবনা ছিল। ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির অনুমোদিত সাতটি প্রস্তাবে মোট অর্থের পরিমাণ ১ হাজার ৫৩৭ কোটি ১৯ লাখ ৫ হাজার ৮৮২ টাকা। মোট অর্থায়নের মধ্যে জিওবি হতে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪১৩ কোটি ৬৩ লাখ ১৬ হাজার ৬২৭ টাকা এবং দেশীয় ব্যাংক হতে ঋণ ১২৩ কোটি ৫৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৫ টাকা।

সভায় প্রাথমিক স্তরের বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৫২টি লটে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৬টি বই মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থমন্ত্রী বলেন, বছরের প্রথম দিন ছেলেমেয়েদের পাঠ্যপুস্তক দেওয়া হচ্ছে এই রেওয়াজটি দীর্ঘদিন থেকে চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্র্তৃক ২০২২ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের (৩য়, ৪র্থ ও ৫ম শ্রেণির) বাংলা ও ইংরেজি ভার্সনের ৯৮টি লটের মধ্যে ৫২টি লটে ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৬১৬টি বই অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস (৪৬টি লট) এবং কচুয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্সের (৬টি লট) নিকট থেকে ১১৫ কোটি ৮২ লাখ ৫৫ হাজার ৩৩৯ টাকায় মুদ্রণ, বাঁধাই ও সরবরাহের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্র্তৃক ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় মহানন্দা নদী ড্রেজিং ও রাবার ড্যাম (১ম সংশোধিত)’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং-ডব্লিউপি-১ এর পূর্তকাজ যুক্তভাবে বিআইসি এবং ঢাকার এসএসআরআই-এর কাছ থেকে ১৫৫ কোটি ৪৩ লাখ ৩৫ হাজার ১৯৫ টাকায় ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কর্র্তৃক ‘পায়রা সমুদ্রবন্দরের প্রথম টার্মিনাল এবং আনুষঙ্গিক সুবিধাদি নির্মাণ’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং-ডব্লিউডি-৫ এর আওতায় রাজুপাড়া থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের পূর্তকাজ স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লি.-এর কাছ থেকে ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ১৬৮ টাকায় ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নাম অনুসারে সুনামগঞ্জে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপিত হবে। হাসপাতালটি হবে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট। এটির পূর্ত (প্যাকেজ নং ডব্লিউডি-১) কাজের প্রস্তাব আমাদের কাছে এসেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রস্তাবটি আমরা গ্রহণ করেছি এবং অনুমোদন দিয়েছি। এম জামাল অ্যান্ড কোম্পানি লি.-এর নিকট থেকে ২৬৬ কোটি ১৭ লাখ ১৭ হাজার ৬২৮ টাকায় ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটা সুনামগঞ্জের জন্য একটি আইকনিক প্রজেক্ট হবে বলে আমরা আশা করছি।

জিকে বিল্ডার্সের প্রস্তাব বাতিল : অর্থমন্ত্রী বলেন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্র্তৃক ‘ঢাকাস্থ উত্তরা ১৮নং সেক্টরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনসাধারণের জন্য অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ’ প্রকল্পের প্যাকেজ নং-লট ১৮/এ/১৫-এর নির্মাণকাজ যুক্তভাবে পিবিএল, জিকে বিল্ডার্স এবং পাইলের সঙ্গে ভেরিয়েশন বাবদ ২ কোটি ৭৯ লাখ ২১ হাজার ১ টাকা ব্যয় হ্রাস করে ১৬৪ কোটি ৪ লাখ ৫৮ হাজার ১৬২ টাকার সংশোধিত ক্রয় চুক্তি সম্পাদনের প্রস্তাব এসেছিল। এটার প্রাক্কলিত ব্যয়ের চাইতে টাকা কম লেগেছিল, কিন্তু আমাদের এখানে কম্পোনেন্টের ডিটেইলস ছিল না বলে তা ফেরত দিয়েছি। এটা আবার পুনরায় উপস্থাপন করা হবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আরেফিন জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) কর্র্তৃক ২০২১-২২ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের সৌদি বেসিক ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (এসএবিআইসি) থেকে ১ম লটে ৩০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার ১২৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৯ হাজার ২৫৫ টাকায় আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন জামালপুরের যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (জেএফসিএল) জন্য রিফর্মড গ্যাস ওয়েস্ট হিট বয়লার ও তৎসংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ৫৬ কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার ১৩৫ টাকায় ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।