শ্রমিকের ছবি কথা বলে

কথায় আছে হাজার কথায়ও যে কথা বলা যায় না, একটি ছবি সে কথা বলে দিতে পারে। বলে দেয়। ফেরির মধ্যে তিল ধারণের ঠাঁই নেই গায়ে-গায়ে, বুকে-পিঠে গাদাগাদি করে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার আদম সন্তান, যেন বেঁচে থাকার মরিয়া বাসনায় শেষ আশ্রয় হিসেবে নুহের নৌকায় ঠাঁই নিয়েছে মানুষ! চলন্ত ট্রাকের ওপর পশুর মতো গাদাগাদি করে শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে যে যেভাবে পারে এই নারী-পুরুষরা সবাই ছুটছে ঢাকায়। পায়ে হেঁটে, লঞ্চে-নৌকায় নদী পেরিয়ে, নসিমন-করিমন-ভটভটিতে শহর-গঞ্জে পৌঁছে আরও দূরে তাদের গন্তব্য। গ্রাম থেকে জেলা শহর, জেলা শহর থেকে রাজধানী। এই দূরত্ব যেন অযুত বর্ষের। স্বাভাবিক গণপরিবহন নেই। হাতে নেই সময়। চাকরি বাঁচাতে হলে পৌঁছাতেই হবে ঢাকায়। মধ্যরাতের এক নির্দেশে ১ আগস্ট থেকে তৈরি পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণায় লাখ লাখ শ্রমিকের এই মর্মান্তিক ঢাকা যাত্রার ছবি দেখেছে দেশের মানুষ। দেখেছে বিদেশিরাও। গত দুই দিনে দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ছবিগুলো নিজেই কথা বলছে।

মহামারীকালে সরকারি ঘোষণায় জীবন ও জীবিকা বাঁচানোর আর্থিক প্রণোদনা, দুই দুইটি অর্থবছরের বাজেট আর দফায় দফায় লকডাউন, কঠোর লকডাউন কিংবা কঠোর বিধিনিষেধের সব হিসেব-নিকেশের বিপরীতে কত শত প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে দেশের শ্রমিক শ্রেণির এইসব ছবি। সেসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান জরুরি। বিশেষত, দেশে করোনার ভয়াবহ সংক্রামক ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের যাবৎকালের সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও সর্বোচ্চ মৃত্যুর এই সময়ে আকস্মিকভাবে লাখ লাখ শ্রমিককে এভাবে একদিনের মধ্যে ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে টেনে আনায় যে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হলো তার দায় কে নেবে? মহামারীর চরম সংকটে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন টেনে আনা শ্রমিকদের জীবনের তেমনি তা রাজধানীসহ গোটা দেশের মানুষের জীবনেরও। কেননা, সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যই বলছে, রাজধানী ঢাকা এখন আক্রান্ত সারা দেশের গ্রামাঞ্চলের রোগীতে। ঢাকার সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেই এখন করোনা রোগীদের উপচেপড়া ভিড়। তাহলে ঠিক এই সময়েই জনস্বাস্থ্যবিদ এবং করোনা মোকাবিলা জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সব মতামত সতর্কবাণী উপেক্ষা করে কেবল শিল্পমালিকদের সন্তুষ্ট করতেই সরকার এমন একটা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিল কেন? ৩০ জুলাই হঠাৎ করেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ঘোষণা এলো ১ আগস্ট থেকে তৈরি পোশাক কারখানাসহ রপ্তানিমুখী সব শিল্পকারখানা খুলে দেওয়া হবে। অথচ ২৭ জুলাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পরও নীতিনির্ধারকরা কারখানা বন্ধ থাকার কথা জানিয়েছিলেন। তিন দিনের মাথায় ঘোষণা এলো কারখানা খোলা। সরকার এটা আগেই জানিয়ে শ্রমিকদের ঢাকাসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতে ফেরার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারত। সেক্ষেত্রে শ্রমিকদের এমন মর্মান্তিক ফিরতিযাত্রার অগ্নিপরীক্ষায় ঝাঁপ দিতে হতো না। সরকার অনুমতি দিল। কারখানা মালিকরা কী করলেন? শ্রমিকদের নিয়ে আসার জন্য কোনো বিশেষ ট্রেন-বাস-লঞ্চের ব্যবস্থাটাও সরকার ও কারখানা মালিকরা করলেন না। অর্থাৎ, মুনাফা ধরে রাখা আর ‘ক্রয়াদেশ’ রক্ষার জন্য শিল্পমালিকরা যতটা উদগ্রীব শ্রমিকদের সুরক্ষা আর সংকটের বিষয়ে তারা ততটাই নির্বিকার। এই পরিস্থিতি মেনে নেওয়া যায় না। দেশের সাধারণ মানুষ গত দুদিন ধরে শ্রমিকদের মর্মান্তিক ছবিগুলো দেখে নীরব কান্নায় কিংবা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব কথাই বলছেন।

দেশের শীর্ষ রপ্তানি শিল্প খাত হিসেবে তৈরি পোশাক খাত বিগত প্রায় তিন দশক ধরে নানারকম কর মওকুফ সুবিধা, রপ্তানি প্রণোদনা, আমদানি শুল্কের ছাড়সহ নানাবিধ আর্থিক-বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়ে আসছে। চলমান করোনা মহামারীতে সরকারি প্রণোদনাও প্রথম পেয়েছে এই শিল্প খাতই। গত বছরই দুই দফায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছে তৈরি পোশাক খাত। আবার গালভরা বুলিতে বলাও হয়ে থাকে রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশক খাত থেকে। কিন্তু এই প্রশ্ন কমই উচ্চারিত হয় যে, বাংলাদেশের যে কৃষকের কন্যা-পুত্ররা গ্রামের আলপথ থেকে সোজা মহানগরের রাজপথে হেঁটে এসে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিরাপত্তাহীন কর্মপরিবেশে বছরের পর বছর ধরে নানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে এই রপ্তানি আয় আর জিডিপি প্রবৃদ্ধির জোগান দিয়েছে সেই শ্রমিকরা কতটুকু পেল? একইসঙ্গে এখন চিন্তাশীল অর্থনীতিবিদদের এই প্রশ্নও অত্যন্ত যৌক্তিক যেবাংলাদেশ আর কতদিন রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগের জন্য কেবল একটা শিল্প খাতের ওপরই নির্ভর করে থাকবে। কেন সোনালি আঁশখ্যাত পাটশিল্প এবং চামড়াশিল্পের মতো রপ্তানি বাণিজ্যের সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তে মনোনিবেশ করবে না দেশ? তৈরি পোশাকের মতো একটা শ্রমঘন শিল্প আর কতদিন পরিকল্পনাহীনভাবে কেবল রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে আটকে থাকবে? কেন তৈরি পোশাক কারখানাগুলো দেশের নদী ও সমুদ্রবন্দর নিকটবর্তী স্থানে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ভাগ করে পুনর্গঠিত হবে না। সেটা হলে এই শিল্প খাতের শ্রমিকদের জীবনমান যেমন বাড়ত তেমনি বছর বছর এমন মর্মান্তিক কর্মযাত্রার ভোগান্তি থেকেও মানুষগুলো বাঁচত। নীতিনির্ধারকরা কি শ্রমিকদের ছবির দিকে তাকিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন?