বিভিন্ন প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত চিকিৎসক ইশরাত রফিক ঈশিতা (৩৪) র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর মিরপুর থেকে ঈশিতা ও তার সহযোগী শহিদুল ইসলাম ওরফে দিদারকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ভুয়া আইডি কার্ড, ভিজিটিং কার্ড, সিল, ভুয়া সার্টিফিকেট, প্রত্যয়নপত্র, পাসপোর্ট, ল্যাপটপ, ৩০০ পিস ইয়াবা, ৫ বোতল বিদেশি মদ ও মোবাইল ফোন উদ্ধার
করা হয়। র্যাবের দাবি, নিজেকে চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক হিসেবে পরিচয় দেন ঈশিতা। এমপিএইচ, এমডি, ডিওসহ নানা ভুয়া বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি ব্যবহার শুরু করেন। ভুয়া ক্যানসার বিশেষজ্ঞ হিসেবেও বিভিন্ন মতবাদ প্রচার করতে থাকেন। এজন্য বিভিন্ন সাইটে চিকিৎসা শাস্ত্রে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ, আর্টিকেল বা থিসিসের ভুয়া প্রকাশনাও ব্যবহার করেন। এছাড়া নিজেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবেও পরিচয় দেন। গতকাল বিকেলে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৩ সালে (সেশন ২০০৫-০৬) এমবিবিএস সম্পন্ন করে ২০১৪ সালে মিরপুরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে যোগ দেন ঈশিতা। চার মাস চাকরি না করতেই শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হন উচ্চাভিলাষী তরুণ চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষক ওরফে বিশিষ্ট আলোচক ওরফে ডিপ্লোম্যাট ওরফে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওরফে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ইশরাত রফিক ঈশিতা। এরপরই শুরু তার বিভিন্ন প্রতারণা।
র্যাবের কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার ঈশিতা প্রতারণার কৌশল হিসেবে নিরাপত্তা বাহিনীর র্যাঙ্ক ব্যাচ ও পদ অর্জনের চেষ্টা চালান। ফিলিপাইনে পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট থেকে ৪০০ ডলারের বিনিময়ে সামরিক বাহিনীর মতো ‘ব্রিগেডিয়ার জেনারেল’ পদটি সংগ্রহ করেন, যার সত্যতা ও যথার্থতা পাওয়া যায়নি। এছাড়া তিনি ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন ও কাউন্টার ক্রাইম ইন্টেলিজেনস অর্গানাইজেশন সংগঠনের পদে সনদপ্রাপ্ত বলে ভুয়া প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। করোনাকালেও থামেনি তার প্রতারণা। দুই দফায় ৬০ চিকিৎসককে তিনি সেমিনারের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেন ও সার্টিফিকেট প্রদান করেন।
কমান্ডার মঈন বলেন, ঈশিতা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিদেশে প্রাপ্ত ভুয়া সাফল্য স্বীকৃতের প্রচারণা করতেন। ২০২০ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে হোটেল পার্ক অ্যাসেন্টে অনুষ্ঠিত জিআইএসআর ফাউন্ডেশন প্রদত্ত ইন্টারন্যাশনাল ইন্সপিরেশনাল ওমেন অ্যাওয়ার্ড (আইআইডব্লিউ ২০২০) পেয়েছেন, যা ৩৫ বছর বয়সী চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও গবেষকদের মধ্যে ‘বছরের সেরা নারী বিজ্ঞানী’ হিসেবে পুরস্কার। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতে ‘রিসার্চ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ভারতের ‘টেস্ট জেম অ্যাওয়ার্ড ২০২০’, থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক শিক্ষা সম্মেলনে অংশ নিয়ে ‘আউটস্ট্যান্ডিং সায়েন্টিস্ট অ্যান্ড রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড’ পান। যদিও এর সবই ভুয়া। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতারণার মাধ্যমে ভুয়া নথি উপস্থাপন করে ২০১৮ সালে জার্মানিতে ‘লিন্ডা ও নোবেল লরিয়েট মিট-মেডিসিনে’ অংশগ্রহণ করেন বলে প্রচারণা করতেন। প্রচার করতেন, তিনি প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওই অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। এছাড়াও তিনি অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বিভিন্ন সংগঠন যেমন আমেরিকান সেক্সুয়াল হেলথ অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল সার্ভিক্যাল ক্যানসার কোয়ালিশন এবং গ্লোবাল গুডউইল হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছেন। কিন্তু র্যাবের অনুসন্ধানে জানা গেছে, তার এসব অ্যাওয়ার্ড ও অনুষ্ঠানে উপস্থিতির ছবি এডিটিং করে গণমাধ্যমে প্রেরণ ও ভার্চুয়াল জগতে প্রচারণা করা হতো।
তিনি বলেন, ঈশিতা করোনা মহামারী পুঁজি করে ভার্চুয়াল জগতে প্রতারণায় সক্রিয় ছিলেন। আলোচক ও প্রশিক্ষকের ভূমিকায় তিনি অনলাইনে করোনা প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন ও সার্টিফিকেট প্রদান এবং প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। ৩-৪ হাজার টাকার বিনিময়ে দুই দফায় ৬০ চিকিৎসককে করোনা চিকিৎসার প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট প্রদান করেন।