কখনো ভ্যান আবার রিকশা, খানিক বাদে আবার সিএনজি এভাবে ভেঙে ভেঙেই পাবনা থেকে আরিচা ঘাট হয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন পোশাকশ্রমিক রাজিয়া বেগম। সকাল ৭টায় পাবনা থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু তার। বিকেলে সাভারের আমিনবাজার এসে তার আবাসস্থল শ্যামলী যাওয়ার জন্য বসে আছেন স্বামীর অপেক্ষায়। তিনি এলেই বাসায় ফিরতে পারবেন রাজিয়া। অনেকটা নির্ভার হয়েই বসে থাকা রাবেয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডবল ভাড়া দিয়ে আসছি; সব জায়গায়ই টাকা বেশি লাগছে। তবে আমার চাকরি যাইবো না। সুপারভাইজার কইছে, আসো সমস্যা নাই।’ মুখে ক্লান্তির ছাপ রংপুরের তরিকুলের। নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন তিনি। হন্যে হয়ে ব্যাগ নিয়ে ছুটছেন। ২ হাজার ২০০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে রংপুর থেকে এসেছেন তিনি। তরিকুল একা হাঁটছেন না। শত শত যাত্রী ব্যাগ-বোচকা নিয়েই সাভার থেকে হেঁটে কিংবা ট্র্যাক অথবা পিকআপে চড়ে ঢাকায় ঢুকছেন।
‘লকডাউনের’ মধ্যে শিল্পকারখানা খোলা রাখার জন্য মালিকরা যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, সরকার তা নাকচ করে দেয়। পরে আবার সরকার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে গার্মেন্টস খোলায় সম্মতি দেয়। যার ফলে ‘লকডাউন’ উপেক্ষা করেই চাকরি বাঁচাতে গত শুক্রবার থেকে ঢাকামুখী মানুষের ঢল নেমেছে। যে যেভাবে পেরেছেন ছুটেছেন ঢাকার দিকে।
‘লকডাউনের’ মধ্যে গণপরিবহন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ঢাকায় ফেরার ভোগান্তি নিয়ে বিভিন্ন মহলের আলোচনা-সমালোচনার পর গত শনিবার রাতে সরকার থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় গার্মেন্টস খোলায় শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে গণপরিবহন এবং লঞ্চ গতকাল রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে। তবে রাতের এ সিদ্ধান্তে সাধারণ জনগণের ভোগান্তি কমাতে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারেনি। পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সিদ্ধান্ত আগে জানালেই ভালো হতো। যাত্রীকল্যাণ সমিতির দাবি, সমন্বয়হীনতার অভাবে একটা হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে জনগণের ভোগান্তি কমেনি। এদিকে স্বল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালু হলেও অনেক দূরপাল্লার বাস ঢাকায় না এসে সাভারের বাইপাইলে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ফলে সাধারণ যাত্রীদের সেই ব্যাগ-বোচকা নিয়ে হাঁটতেই হয়েছে।
সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য করে গতকাল দুপুর ১২টার পরও বাস চলাচলের বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্র্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মাদ মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা অনেক দূর থেকে আসছে তাদের যদি যৌক্তিক কারণ থাকে তাহলে আটকাবে না। হাইওয়ে পুলিশ ব্যাপারটি দেখছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিদ্ধান্তটা আগে জানাইলে ভালো হইতো। এখন তো একটু সমস্যা হইছে।’ বাড়তি ভাড়াসহ যাত্রীদের আগে নামিয়ে দেওয়ার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘এগুলো তো সব বাস করে নাই। অনেক বাসই তো আসতেছে। চলাচল করতেছে; গুটি কয়েক বাস করছে।’
যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব সিদ্ধান্ত হচ্ছে সবই হ-য-ব-র-ল সিদ্ধান্ত।’ সিদ্ধান্তগুলোকে উল্টোপাল্টা বলে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘যখন ৮০ শতাংশ পোশাকশ্রমিক ফিরে আসছে তখনই হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত দেওয়া হলো গণপরিবহন চলবে। ঘরে থাকলে মানুষ এই তথ্য পেতেন।’
গতকাল রাজধানীর আন্তঃজেলা মহাখালী বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায় ঢাকামুখী যাত্রীদের কোনো ভিড় নেই। কারণ বেশিরভাগ বাস আগেই ঘুরে চলে যাচ্ছে। অল্পসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন যারা জরুরি প্রয়োজনে ঢাকা ছাড়ছেন। তাদেরই একজন ময়মনসিংহের আলী আজম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পোশাকশ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে শিথিল হওয়া লকডাউনে স্ত্রীসহ বাড়ি যাচ্ছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঈদেও আমি বাড়ি যাইনি। আমার এক আত্মীয় মারা গেছেন। তাই জরুরি প্রয়োজনেই বাড়ি যেতে হচ্ছে। গাড়ি না চললেও আমার যেত হতো।’
মহাখালী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা বলেন, ময়মনসিংহ থেকে গাড়ি মহাখালী পর্যন্ত আসে না। কিছু গাড়ি চৌরাস্তা, কিছু গাড়ি টঙ্গী থেকে ঘুরছে, কিছু গাড়ি এয়ারপোর্ট আসছে। টার্মিনালে কোনো গাড়ি ঢুকছে না। দুপুর ১২টার আগে যাতে দুই-তিনটি ট্রিপ দিতে পারে সেজন্যই এ কাজ করা হয়েছে।
শিথিল লকডাউনে দ্বিগুণ ভাড়ায় লঞ্চযাত্রা : ‘লকডাউনের’ মধ্যে কারখানা খোলায় দুর্ভোগে পড়া শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে লঞ্চ চালু করেছে বিআইডব্লিউটিএ। আজ (সোমবার) সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চালু থাকবে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। কারখানা শ্রমিকদের চাহিদা থাকায় সময় কিছুটা বাড়ানো হয়েছে বলে জানায় তারা। তবে যাত্রীদের ভোগান্তি তাতে কমেনি।
গত শনিবার সন্ধ্যায় সরকার থেকে ঘোষণা দেওয়া হয় গার্মেন্টস খোলায় শ্রমিকদের কথা বিবেচনা করে গণপরিবহন এবং লঞ্চ রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলবে। কিন্তু যাত্রীদের বেশি চাপ থাকায় বিআইডব্লিউটিএ ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে সোমবার সকাল পর্যন্ত যাত্রী পরিবহন করা হবে।
শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ দিতে সরকার সীমিত সময়ের জন্য লঞ্চ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার পর গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর সদরঘাটে আসা লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের ভিড় দেখা যায়। চাঁদপুর থেকে আসা পোশাকশ্রমিক হারুন বলেন, ‘লঞ্চ ছাড়ার খবর পেয়ে সকালে ঢাকা চলে এসেছি। তবে লঞ্চে বাড়তি ভাড়া দিতে দিতে হয়েছে।’ কোনো লঞ্চে স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই যাত্রী নেওয়া হয়েছে। বরগুনা থেকে আসা নাজমুল নামে আরেক যাত্রীও একই অভিযোগ করেন দেশ রূপান্তরের কাছে।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর ও ট্রাফিক) মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘সকাল থেকে বিভিন্ন জেলার লঞ্চ যাত্রী নিয়ে ঘাটে এসেছে। প্রথমে রবিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ চলার ঘোষণা দিলেও তা পরিবর্তন করে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত করা হয়।’
দেশ রূপান্তরের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, দেশের সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও যানজটের সেই দীর্ঘ লাইন ছাড়িয়েছে ২৮ কিলোমিটার। এছাড়া ফেরিঘাটে ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এদিকে লঞ্চে ওঠার জন্য মরিয়া ছিলেন দক্ষিণবঙ্গের বরিশালের যাত্রীরা।
শিমুলিয়ায় কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় : শিল্পকারখানা খোলায় শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটে দক্ষিণবঙ্গের কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে। গতকাল সকাল থেকে এ নৌরুটে লঞ্চ চলাচল শুরু হয়েছে। এতে ফেরিতে যাত্রীর চাপ কিছুটা হলেও কমেছে। বর্তমানে নৌরুটে ১০টি ফেরি ও ৮৬টি লঞ্চ চলাচল করছে। তাছাড়া ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে গণপরিবহন চালু হওয়ায় যাত্রীদের রাজধানীর কর্মস্থলে পৌঁছতে তেমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে না। ঘাট এলাকায় যানবাহনে চাপ বেড়েছে। তবে যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি নেই বললেই চলে।
দৌলতদিয়া ঘাটে চাপ ও ভোগান্তি তুলনামূলক কম : দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রী ও ছোট যানবাহনের প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়েছিল গত শনিবার। তবে গতকাল তেমন চাপ ছিল না। রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার শ্রমিকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ফেরির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি গতকাল দুপুর পর্যন্ত গণপরিবহন ও লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক করার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমেছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা যাত্রীরা ভোগান্তি ছাড়াই ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিতে পারছেন।
বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কে ২৮ কিমি যানজট : বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়কে শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরতে গণপরিবহন চালু হওয়ায় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে উত্তরবঙ্গমুখী লেনে ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল ভোর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্তের গোলচত্বর থেকে টাঙ্গাইল শহরের রাবনা বাইপাস পর্যন্ত যানজট স্থায়ী হয়। মাঝেমধ্যে যানজট বেড়ে ঢাকার দিকে আশেকপুর বাইপাস পর্যন্ত দীর্ঘ হয়। আবার কমে তা ঘারিন্দা ও রাবনা বাইপাসে গিয়ে ঠেকে। তবে ধীরগতিতে যান চলাচল করায় যানজট স্থায়ী রূপ নেয়নি। সকাল ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত সরেজমিন দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপ্রান্তের গোলচত্বর থেকে টাঙ্গাইল শহরের আশেকপুর বাইপাস পর্যন্ত সেতুমুখী গাড়ির দীর্ঘ সারি। পক্ষান্তরে ঢাকামুখী লেনে স্বাভাবিকের চেয়ে কম গাড়ি মহাসড়ক ফাঁকা পেয়ে বেপরোয়া গতিতে যাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর মজুচৌধুরীরহাট ঘাটে যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় : স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুট হয়ে নৌপথে লঞ্চ ও ফেরিতে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাচ্ছেন কর্মজীবী মানুষ। করোনা সংক্রমণ মোকাবিলায় চলমান কঠোর বিধিনিষেধের নবম দিনে শহরমুখী যাত্রীদের ঘিরেই দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রবেশদ্বার লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীরহাটের ফেরিঘাট এবং জেলার বিভিন্ন বাস স্টেশনগুলোতে এখন কর্মস্থলমুখী মানুষের স্রোতে বেসামাল। অন্যদিকে ফেরিঘাটে কোনো যানজট না থাকলেও ভেঙে ভেঙে আসা যাত্রীদের রয়েছে উপচেপড়া ভিড়।
বরিশালে লঞ্চে উঠতে মরিয়া মানুষ : গতকাল রাত ৮টা থেকে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে লঞ্চ। দুপুর ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হলেও পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ার অজুহাতে বরিশাল নদীবন্দর থেকে ছাড়েনি ঢাকা-বরিশাল রুটের কোনো লঞ্চ। এ সময় কয়েক হাজার যাত্রী পন্টুনে অবস্থান নেন। তারা বিভিন্নভাবে লঞ্চে ওঠার চেষ্টা করলে স্টাফরা নামিয়ে দেন। পরে দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা-বরিশাল নৌরুটের অ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চে উঠতে শুরু করেন যাত্রীরা। বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ঢাকামুখী কারখানাশ্রমিকদের যাতায়াতের স্বার্থে সরকার সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের সময় বৃদ্ধি করেছে। বরিশাল নদী বন্দরে আটটি লঞ্চ রয়েছে। রাতে লঞ্চ ছেড়ে যাবে। তবে যাত্রী চাপ বাড়লে আরও একটি লঞ্চ কুয়াকাটা-২ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’