দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তা এমএ কাশেম ও আজিম উদ্দিন আহমেদের হাইপ্রোফাইল করপোরেট পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়ংকর সিন্ডিকেটের কাহিনী। তারা দুজনই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে একসঙ্গে একই সিন্ডিকেটে থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের পাশাপাশি স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। তাদের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও পড়েছে ঝুঁকিতে। কাশেম-আজিম সিন্ডিকেটের ভয়াবহ অনিয়ম-দুর্নীতিতে ঝুঁকিতে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিও (এনএসইউ)।
দীর্ঘ সময় ধরে তারা ভাগাভাগি করে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করে চলেছেন। সব মিলিয়ে দুজনই চারবার করে এনএসইউ ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ এমএ কাশেমের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন আজিম উদ্দিন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের নানা অনিয়মের খবরও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষার মান ভালো থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্ব পায়নি।
অবশ্য এনএসইউ কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের প্রমাণের কথা আগেই জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি কেনায় অনিয়ম, ভর্তিবাণিজ্য, সাধারণ তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের আর্থিক সুবিধা গ্রহণ ও পরিবারের সদস্যসহ বিদেশ ভ্রমণ, ট্রাস্টি বোর্ডের কয়েক সদস্যের স্বেচ্ছাচারিতা ও আদালতে এ নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাসহ নানা বিষয়ে তদন্তের খবর ছাপা হয়েছিল পত্র-পত্রিকায়। ট্রাস্টিদের গাড়িবিলাস নিয়েও আছে আলোচনা-সমালোচনা। আছে ইউজিসির অনুমোদনের বাইরে একাধিক সেকশন চালু করে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির অভিযোগও।
জানা গেছে, এ দুর্নীতি ও অনিয়মের হোতা এমএ কাশেম ও আজিম উদ্দিন। মূলত এ দুজনের যোগসাজশেই দুর্নীতির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের সঙ্গেও প্রকাশ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ২০১৫ সালে ট্রাস্টিদের দুর্নীতি ও ইউজিসি তদন্তে চাপের মুখে পদ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন তৎকালীন উপাচার্য আমিন উদ্দিন। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যানের পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন এমএ কাশেম। এছাড়া শিক্ষার্থীদের বেতন-ফির টাকায় ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের জন্য বিলাসবহুল সাতটি গাড়ি কেনার সময়ও চেয়ারম্যান ছিলেন এমএ কাশেম। সে সময় ল্যান্ড রোভারের রেঞ্জ রোভার-২০১৯ মডেলের একেকটি গাড়ি ক্রয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। যদিও এ ট্রাস্ট মানবহিতৈষী, দানশীল, জনহিতকর, অরাজনৈতিক, অলাভজনক ও অবাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। তাই ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ট্রাস্টিদের গাড়িসহ অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই বলে জানান আইনজীবীরা।
এদিকে এমএ কাশেম ও আজিম উদ্দিনের সিন্ডিকেটের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য ট্রাস্টিরা কোনো সুবিধাই করতে পারেন না। ২০১৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গত বছর আশালয় হাউজিং লিমিটেডের কাছ থেকে জমি কেনা হয়েছে। এ জমি কেনার পক্ষে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) সদস্যদের সবার মত ছিল না। এ নিয়ে বিওটির সদস্য ড. রওশন আলম আদালতে মামলা করেন। একটি শীর্ষ স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল বিশদ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রচার করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, জমি কেনা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে গত বছর আগস্টে ট্রাস্টি বোর্ডের দুজন সদস্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে তারা জানান, বোর্ডের অধিকাংশ সদস্যকে না জানিয়ে সভায় ৫০০ কোটি টাকায় জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইভাবে জমির বায়নাবাবদ পরিশোধের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ড থেকে ২৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়। তারা বলেন, সভায় অনুপস্থিত বোর্ড সদস্যদের উপস্থিত দেখানো হয়েছে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে।
অন্যদিকে বিওটির সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানীবাবদ লক্ষাধিক টাকা গ্রহণ করেন বলে তদন্তকালে প্রমাণিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিওটির সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সফর করেন, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিপন্থী।
তদন্তকালে ভর্তিবাণিজ্যের প্রমাণ পেয়েছে ইউজিসি। ইউজিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থের বিনিময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি তথা ভর্তিবাণিজ্যের অভিযোগ বহুদিন ধরেই রয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ জানায়, বিওটির সদস্য ও উপাচার্যের কোটা অনুযায়ী কিছু ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন প্রোগ্রামে ভর্তি করানো হয়। তবে তারা কোটার বাইরেও শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। বিষয়টি নিয়ে ইউজিসি থেকে একাধিকবার তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়কে সতর্ক করা হয়। আজিম-কাশেম সিন্ডিকেট তাদের আত্মীয়-পরিজন, বন্ধুবান্ধবের সন্তানদের নিয়মবহির্ভূতভাবে শিক্ষা-বৃত্তি প্রদান করেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তার ভাষ্য, মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না পারা এমএ কাশেম নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সুনাম নষ্ট করছেন। আজিম উদ্দিনও এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রথম থেকে জড়িত। জানা গেছে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন মিউচুয়াল গ্রুপ অব কোম্পানিজের চেয়ারম্যান এবং মিউচুয়াল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান এমএ কাশেম।
এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য কোনো ফল পাননি। বরং তাদের কৌশলে কোণঠাসা করে রেখেছে এই সিন্ডিকেট। কোনো কোনো ট্রাস্টি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ তহবিল থেকে ট্রাস্টিদের আর্থিক সুবিধা ও সিটিং অ্যালাউন্সের নামে মোটা অঙ্কের অর্থ গ্রহণ ও বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা তদন্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।
ইউজিসির তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির আর্থিকসহ সার্বিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২৮ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ের মনোনীত প্রতিষ্ঠান দিয়ে।
সম্প্রতি এসব অভিযোগ নিয়ে হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন সংবাদ সম্মেলন করে তাদের অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, রাষ্ট্রের স্বার্থে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির মতো একটি প্রতিষ্ঠানে এমন লাগামহীন দুর্নীতির হোতা আজিম উদ্দিন ও এমএ কাশেমের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে প্রটেকশন ফর লিগ্যাল হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ড. সুফি সাগর সামস্ বলেন, এ দুই ব্যক্তি ইউজিসির অনুমোদনের বাইরে ১০টি সেকশন চালু করে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তিপূর্বক বিশাল অঙ্কের টাকা বাণিজ্য করে এবং এই টাকা বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করে।
জানা গেছে, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের স্থায়ী সদস্য আবদুল আউয়াল মূলত দুর্নীতিবাজদের কারণেই ক্যাম্পাসে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করার মূল লোক আমি। সঙ্গে আরও দুজন ছিলেন, তারা মারা গেছেন। আর এই যে কাশেম-আজিমরা এখন আছে, এদের আমি পরে নিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, সরকার থেকে অনুমোদন নেওয়া সবই আমরা করেছি। পুরো ক্যাম্পাসই আমার হাতে হয়েছে। কিন্তু যখনই কাশেম-আজিম চুরি শুরু করল, তখনই আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিই এবং সভায় যাওয়া বন্ধ করে দিই। পরে একটা মামলা করি।’
দুর্নীতির প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের এই স্থায়ী সদস্য বলেন, ‘এই যে গাড়িঘোড়া কিনছে ১০ কোটি, ১২ কোটি টাকায়, কিন্তু এটা তো একটা ট্রাস্ট। এটা একটা নন-প্রফিটেবল প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে তো ১০ টাকাও কেউ নিতে পারবে না।’
ট্রাস্টিরা কেউ সিটিং অ্যালাউন্স নিতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি কখনই এক টাকাও সিটিং অ্যালাউন্স নিতাম না। কিন্তু এরা নিয়েছে।’
অভিযোগের বিষয়ে ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে স্পষ্ট বলা আছে, বিশ্ববিদ্যালয় যত আয় করবে তা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ চালিয়ে যেটা অতিরিক্ত থাকবে, সেটা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য উন্নয়নকাজ করা হবে। গাড়ি কেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের পরিপন্থী। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা যে প্রত্যয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করেছেন, তার সঙ্গে এটা কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি কেনা অবশ্যই অনিয়ম। এটা আর্থিক স্বেচ্ছাচারিতা।’
ইউজিসির প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বোর্ড অব ট্রাস্টির সদস্যরা সিটিং অ্যালাউন্স হিসেবে কখনো কখনো ১ লাখ টাকা নিয়েছেন, কখনো কখনো ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এ বিষয়ে ড. আলমগীর বলেন, ‘সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার যে সংস্কৃতি, অন্য কোথাও আছে কি না জানা নেই। তবে বাংলাদেশে এটা ব্যাপকভাবে চালু হয়েছে। ট্রাস্টি বোর্ড মিটিংয়ে সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়াটা যুক্তিযুক্ত না। ইউজিসির নির্দেশনায় বলা আছে, কিছু ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়া যেতে পারে।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে একটি প্রোগ্রামের কথা বলে সেখানে অনেকগুলো প্রোগ্রাম চালু করেছে কাশেম-আজিম সিন্ডিকেট। এটা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে মনে করা হচ্ছে। ইউজিসির সদস্য ড. আলমগীর বলেন, ‘এটা তারা কোনোভাবেই করতে পারে না। একটা ডিপার্টমেন্টের অধীনে আন্ডার গ্র্যাজুয়েশন প্রোগ্রাম একটাই থাকতে পারে। তারা যেটা করছে, সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। শুধু তা-ই নয়, এসব প্রোগ্রামের অধীনে যেসব শিক্ষার্থী সার্টিফিকেট নিচ্ছে, সেগুলোরও কোনো বৈধতা নেই।’
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে পরিচালক আজিম উদ্দিন ও এমএ কাশেমের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করে দেশ রূপান্তর। তবে তাদের দুজনের কেউই ফোন ধরেননি। আলোচনার বিষয় টেক্সট করে পাঠালেও তারা এ বিষয়ে কথা বলার কোনো আগ্রহ দেখাননি।