উসাইন বোল্টবিহীন অলিম্পিক নিয়ে ক’জনের আর আগ্রহ থাকে! তার স্প্রিন্টের জাদুতে বুঁদ হয়ে থাকতেন সারা বিশ্বের মানুষ। অবিশ্বাস্য ৯.৫৮ সেকেন্ডের রেকর্ড গড়ে, ২০০৮, ২০১২, ২০১৬- তিন আসরে টানা ১০০ ও ২০০ মিটারে সোনাসহ মোট ৮ অলিম্পিক সোনা জিতে ইতিমধ্যে অমরত্ব পেয়ে গেছেন বোল্ট। গত পাঁচ বছর ধরেই তাই জল্পনা-কল্পনা ছিল বোল্টের স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেওয়া সিংহাসনের উত্তরাধিকার হবেন কে? ঘুরেফিরে বারবার এসেছে স্বদেশি ইয়োহান ব্লেক, মার্কিন ফ্রেড কের্লি, ক্রিশ্চিয়ান কোলম্যান, কানাডার আন্দ্রে ডি গ্রাস, ব্রিটিশ হার্নেল হিউজেস, দক্ষিণ আফ্রিকার আকানি সিমবিনের নাম। কিন্তু সবার ধারণাকে ভুল প্রমাণ করলেন মার্সেল জ্যাকবস। বোল্টের এক যুগের রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে অলিম্পিক গেমসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইভেন্ট পুরুষদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে সেরা হয়েছেন এই ইটালিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রেড কের্লি, আর গত আসরের ব্রোঞ্জজয়ী ডি গ্রাসকে পেছনে ফেলে ৯.৮০ সেকেন্ডে ফিনিশিংয়ে পৌঁছে ইতালির পতাকা উড়িয়েছেন তিনি।
বোল্ট যুগের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষদের ট্র্যাকে অবসান ঘটেছে জ্যামাইকান আধিপত্যেরও। অলিম্পিকে সর্বশেষ কবে জ্যামাইকানবিহীন ফাইনাল দেখা গেছে তা নিয়ে গবেষণা হতেই পারে। আগের দিন নারীদের ১০০ মিটারে ক্লিন সুইপ ছিল জ্যামাইকানদের। অথচ পুরুষদের ইভেন্টে বিস্ময়করভাবে সেরা আটেই নেই কোনো জ্যামাইকান! শেষবারও ফাইনালে বোল্টের সঙ্গে ছিলেন ব্লেক। অথচ এবার ব্লেক বিদায় নিয়েছেন সেমিফাইনাল থেকেই। আরেক জ্যামাইকান অবলিক সেভিলেও উঠতে পারেননি ফাইনালে জ্যাকবসের ইতিহাস গড়ার আগে অবশ্য ঘটেছে অঘটনের ঘটনা। অন্যতম ফেভারিট গ্রেট ব্রিটেনের হার্নেল হিউজেস ফলস স্টার্ট করে ছিটকে পড়েন ফাইনাল থেকে। আট জনের লড়াই রূপ নেয় সাতজনে। যেখানে সবাইকে থমকে দিয়েছেন ২৬ বছরের তিন সন্তানের জনক জ্যাকবস।
অথচ একটা সময় জ্যাকবস চেয়েছিলেন লং জাম্পে ক্যারিয়ার গড়তে। বাবা আমেরিকান। জন্মও মার্কিন মুলুকে। তবে জন্মের এক মাসের মধ্যেই মায়ের দেশ ইটাতে পাড়ি জমান। সেখানেই ১০ বছর বয়স থেকে শুরু অ্যাথলেটিক ট্রেনিং। শুরুতে দু’টিই করতেন। ২০১৬ সালে লং জাম্পে ইতালির সেরা হন। এই ইভেন্টকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া জ্যাকবস অবশ্য এ বছর মে’তে ট্র্যাকে গতির ঝড় তোলার ইঙ্গিত দেন ১০০ মিটারে ইতালির জাতীয় রেকর্ড গড়ে। বিশ্বের দেড়শতম ব্যক্তি হিসেবে ১০-এর নিচে (৯.৯৫ সেকেন্ড) দৌড়ে সেই রেকর্ড গড়েন তিনি। এর আগে মার্চে পোল্যান্ডে ইউরোপিয়ান ইনডোর চ্যাম্পিয়নশিপে ৬০ মিটার স্প্রিন্টে সোনা জিতে আত্মবিশ্বাসটা বাড়িয়েছিলেন জ্যাকবস। শনিবার হিটে ৯.৯৪ সেকেন্ডে দৌড়ে নিজের রেকর্ডের উন্নতি করেন। এরপর সেমিফাইনালে আবারও নিজেকে ছাপিয়ে যান ৯.৮৪ সেকেন্ড দৌড়ে। আর ফাইনালে গতি বাড়িয়ে ইতালিকে অলিম্পিকের ইতিহাসে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে প্রথম পদক এনে দেন। জ্যামাইকা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে মর্যাদার এই স্বর্ণজয়ের ২৫ বছরের অপেক্ষার ইতি ঘটিয়েছেন তিনি। ১৯৯৬ আটলান্টা অলিম্পিকে কানাডার ডোনাভান বেইলির পর টানা পাঁচ অলিম্পিকে ১০০ মিটারে আধিপত্য গড়েছিলেন জ্যামাইকা ও আমেরিকার স্প্রিন্টাররা।
এই তো সেদিন ইউরোপিয়ান ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব পেয়েছে ইতালি। রবার্তো মানচিনির শিষ্যরা ভুলিয়েছেন দীর্ঘ ৫৩ বছরের আক্ষেপ। জ্যাকবসের ইতিহাস গড়ার আগ মুহূর্তে হাই জাম্পে সোনা জিতেছেন ইতালিয়ান জিয়ানমার্কো তামবের্ল। জ্যাকবসের জয়ের পর দুই ইতালিয়ানের উদযাপনটা ছিল দেখার মতো। মিক্সড জোনে এসে যেন ভাষাই হারিয়ে ফেলেছিলেন আমেরিকায় জন্ম নিলেও নিজেকে শতভাগ ইতালিয়ান দাবি করা জ্যাকবস, ‘এটা এক অবিশ্বাস্য অনুভূতি। আগেই বলেছিলাম টোকিওতে আমি পদকে চোখ রেখেই এসেছিলাম। কারণ এখানে বোল্ট ছিল না। কাউকেই ফেভারিট বলা যাচ্ছিল না। আমি তাই নিজের কাজটাই করতে চেয়েছিলাম। এটা অনেক বড় স্বপ্নপূরণ, যা সেই শৈশব থেকেই দেখছিলাম।’