টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের ইউসুফ আলী (৩৪)। গত বছর দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলে ২০টি মাদ্রাসায় আবেদন করেন। এ বাবদ তার খরচ হয়েছে অন্তত ২৫ হাজার টাকা। তারও আগে তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি নিতে ইউসুফের ব্যয় হয় ১ লাখ টাকার বেশি। করোনা পরিস্থিতিসহ নানা জটিলতায় এতদিন ইউসুফ আলীর আবেদনকৃত পদে পরীক্ষা হয়নি। কিন্তু এতদিন পরে এসে এখন সরকার বলছে, আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে এসব পদে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্র্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ইউসুফের।
তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ পেতে হলে কমপক্ষে দুই-তিন বছর সময় লাগবে। কারণ এখনো এ পদে পরীক্ষার জন্য সিলেবাস করা হয়নি। অথচ আমার চাকরির বয়স (নির্ধারিত সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর) শেষদিকে। আমি দরিদ্র মানুষ, সরকার এ সিদ্ধান্ত না তুলে নিলে আমি পথে বসব।’
ইউসুফ আলীর মতো একইভাবে সহকারী গ্রন্থাগারিক ও গ্রন্থাগারিক (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) পদে চাকরিপ্রত্যাশী অন্তত ১৫ হাজার নারী-পুরুষ সরকারি নীতির মারপ্যাঁচে পথে বসতে চলেছেন। সময় ও নগদ অর্থ হারিয়ে তারা সবাই দিশেহারা।
সম্প্রতি সরকার দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ ও মাদ্রাসার গ্রন্থাগারিক পদকে সহকারী শিক্ষক ও প্রভাষকের মর্যাদা দিয়েছে। এরপর বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এনটিআরসিএকে এ পদে নিয়োগের ক্ষমতা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর আগে এসব পদে নিয়োগ হতো নিজ নিজ কলেজ, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে। সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে শিক্ষা খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল। এমনকি চাকরিপ্রত্যাশীরাও এ উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তবে আপত্তি উঠেছে আগে আবেদন করাদের নিয়ে।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});ভুক্তভোগীরা বলছেন, পরীক্ষা দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীরা মন্ত্রণালয়ের নতুন সিদ্ধান্তে বঞ্চিত হবেন। অথচ এ বিড়ম্বনার জন্য প্রার্থীরা দায়ী নন। কারণ তারা সব প্রক্রিয়া শেষে প্রায় এক বছর সময় ধরে অপেক্ষা করলেও অজ্ঞাত কারণে মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধি নিয়োগ হলেও সরকারের নতুন আদেশে সেটি বাতিল হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বিপাকে পড়েছেন আগে আবেদন করা প্রার্থীরা।
এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জের চাকরিপ্রার্থী মাসুম বিল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সালের জনবল কাঠামো অনুযায়ী আবেদন করেছি ২০২০ সালের জুলাই মাসে। নিয়ম অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার কথা। কিন্তু চলতি বছর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অজ্ঞাত কারণে ডিজি প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়া বন্ধ রাখা হয়। আমি গরিব মানুষ। চাকরির বয়সও শেষ। এই চাকরির জন্য দেড় লাখ টাকার বেশি খরচ। এখন আমার পথে বসা ছাড়া উপায় কী?’
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০১০ সাল থেকে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে সহকারী গ্রন্থাগারিক এবং গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ দিচ্ছে সরকার। ইতিমধ্যে এসব পদে ৯০ ভাগ নিয়োগ হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে মাদ্রাসাগুলোতেও একই পদ সৃষ্টি করা হয়। তবে নিয়োগ শুরু হয় ২০২০ সালের জুলাই থেকে। ফলে মাদ্রাসায় এসব পদের ৯৫ শতাংশই খালি রয়েছে। শুরু থেকে এসব নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি। সরকারি আদেশের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এর জন্যও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশ অর্থ ব্যয় করতে হয়। এরপর বেসরকারি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালকের প্রতিনিধি, মাদ্রাসার জন্য মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং কলেজে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি নিয়োগ পরীক্ষা নেন। সেখান থেকে প্রার্থী বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া হয়।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});ভুক্তভোগী চাকরিপ্রত্যাশীরা জানান, মাদ্রাসায় এসব পদ সৃষ্টির পর ডিজি প্রতিনিধি ছিল মাত্র দুই মাস। সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাই মাসে দেশের তিন হাজার মাদ্রাসায় সহকারী গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে আবেদন করেন প্রায় আট হাজার প্রার্থী। সব প্রক্রিয়া শেষে তারা ডিজি প্রতিনিধির অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রতিনিধি নিয়োগ প্রায় বন্ধ থাকে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি পেলে পরীক্ষা নেয়। তারা ইতিমধ্যে নিয়োগ পেয়েছেন। সরকারের নতুন আদেশে তাদের গ্রহণও করা হচ্ছে। একই অবস্থা দেখা দেয় স্কুল-কলেজেও। এখানেও অন্তত ছয়-সাত হাজার প্রার্থী পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজি প্রতিনিধি পেয়েছিল। জুনে তাদের পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ৩১ মে জারি হওয়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তা ভেস্তে গেছে।
মন্ত্রণালয়ের ওই আদেশে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ অনুসারে ‘সহকারী শিক্ষক (গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান)’ (পূর্বের পদ ‘সহকারী গ্রন্থাগারিক-ক্যাটালগার’) এবং ‘গ্রন্থাগার প্রভাষক’ (পূর্বের পদ গ্রন্থাগারিক) নিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যান্য পর্যায়ের শিক্ষকের মতো এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। সম্প্রতি জারি হওয়া ১৭তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার অংশ হিসেবে এ দুটি পদে এনটিআরসিএ সিলেবাস প্রণয়নসহ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। তবে বিধি মোতাবেক যাদের নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্নসহ ফল প্রকাশ করে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আগের নিয়মে এমপিওভুক্ত হতে পারবেন।
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});তবে মন্ত্রণালয়ের নতুন এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা। ময়মনসিংহের একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা জালালউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো বিবেচনা ছাড়াই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এনটিআরসিএ নিয়োগ দেবে ভালো কথা কিন্তু তারা তো সাধারণ শিক্ষক নিয়োগেই ব্যর্থ হচ্ছে। এখন এসব ছেলেমেয়ে এনটিআরসিএর অপেক্ষায় থাকলে তাদের কারও চাকরির বয়স থাকবে না।’
মন্ত্রণালয়ের নতুন সিদ্ধান্তে বিড়ম্বনায় পড়া চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন নোয়াখালীর ফারহান সিদ্দিকী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবাই প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে পথে বসতে চলেছে। তাহলে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আমাদের এত টাকা খরচ করানো হলো কেন? আমরা সবাই গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তান। লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমাদের পথে বসাল সরকার।’ যারা ডিজি প্রতিনিধির অপেক্ষায় ছিলেন তাদের আগের নিয়মে পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ দাবির বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুজন অতিরিক্ত সচিবের সঙ্গে কথা হয়েছে দেশ রূপান্তরের। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব (মাধ্যমিক অনুবিভাগ) সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেছেন, আইনে সুযোগ থাকলে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে মাদ্রাসা অনুবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান বলেছেন, ‘৩১ মের আদেশই চূড়ান্ত। এর বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।’
(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});