নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় ভয়াবহ আগুনে নিখোঁজ হওয়াদের একজন শান্তামনি আক্তার। আগুন লাগার দিন কারখানায়ই কাজ করছিল সে। পরে আর তার খোঁজ মেলেনি। পরিবারের আশা, সেখানে উদ্ধার হওয়া ৪৮টি পোড়া-বিকৃত লাশের পাশাপাশি আছে তারও কয়লা হওয়া শরীরটাও। মামা আমিরুল ইসলাম ও মা সীমা আক্তার দুয়েক দিন পরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে ও সিআইডি কার্যালয়ে যান লাশ বুঝে পেতে। অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজ মীনা খাতুনের মেয়ে চম্পা আক্তারও মায়ের লাশের জন্য হাসপাতাল, সিআইডি অফিস দৌড়াদৌড়ি করেন। গত সোমবার সিআইডি অফিস থেকে তাকে বলা হয়েছে, দুয়েক দিনের মধ্যেই লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
সীমা বা চম্পার মতো এমন ৪৯ জন আশা করে বসে আছেন দুয়েক দিনের মধ্যেই স্বজনের মরদেহ বুঝে পাবেন তারা। তবে একটি লাশের হিসাব নিয়ে এখনো রয়েছে ধোঁয়াশা। অপেক্ষায় ৪৯ স্বজন থাকলেও লাশ আছে ৪৮টি। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে আরেকটি লাশ গেল কোথায়?
হাসেম ফুড কারখানায় ভয়াবহ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশের স্বজনদের এ অপেক্ষা শেষ হচ্ছে। হাসপাতাল মর্গে থাকা ৪৮টি লাশের মধ্যে ৪৫টির পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর মধ্যে ৩০ জন নারী ও ১৫ জন পুরুষ রয়েছে। লাশ হস্তান্তরের জন্য মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে গত সোমবার নামের তালিকাও দিয়েছে সিআইডি।
তবে মর্গে থাকা তিনটি লাশের পরিচয় এখনো শনাক্ত করতে পারেনি সংস্থাটি। ওই তিন লাশের ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (ফরেনসিক) রুমানা আক্তার দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, ‘আগুনে পোড়া ৪৮টি লাশের পরিচয় শনাক্ত করতে নিহতদের পরিবারের ৬৬ জনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ডিএনএ মিলিয়ে আমরা এখন পর্যন্ত ৪৫ জনের লাশ শনাক্ত করেছি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এ তথ্য হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো তিনটি লাশের ডিএনও প্রোফাইলিংয়ের কাজ চলমান আছে। খুব দ্রুতই ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হবে।’
গত ৮ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় ছয়তলা ভবনে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ও ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মৃত্যু হওয়া ৫১টি লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। উদ্ধার হওয়া লাশের মধ্যে তিনটি লাশ ঘটনার পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। অবশিষ্ট ৪৮টি লাশের চেহারা বোঝা না যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পদক্ষেপ নেয় পুলিশ। এ লাশগুলোর ১৫টি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে, আটটি ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের মর্গে ও ২৫টি ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়। তবে মোট ৪৯টি লাশের দাবিদার এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
সিআইডির এএসপি (নারায়ণগঞ্জ জেলা) মো. হারুন অর রশিদ গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কাল (আজ বুধবার) থেকে লাশ হস্তান্তর করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ঢামেকে থাকা ২৪ লাশ দুপুর ২টা থেকে পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে থাকা লাশগুলো পরে হস্তান্তর করা হবে।’ তিনি বলেন, শনাক্ত হওয়া লাশের স্বজনদের ইতিমধ্যে লাশ হস্তান্তরের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর (ইনভেস্টিগেশন) হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত সোমবার সিআইডির প্রতিবেদনটি পেয়েছি। মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এটি বুঝিয়ে দিয়েছি।
তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে এখন পর্যন্ত তিনটি লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে ফায়ার সার্ভিস ৪৮টি লাশ হাসপাতাল মর্গে নিয়েছে। সেখান থেকে ৪৫টি লাশের স্বজন চিহ্নিত করেছে সিআইডি। তিনটি এখনো শনাক্ত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মর্গে ৪৮টি লাশ থাকলেও দাবিদার রয়েছে ৪৯টি পরিবার।’
একটি লাশ তাহলে কোথায় জানতে চাইলে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এমন হতে পারে লাশ পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে যা আর বোঝা যায়নি।’