হেলেনা জাহাঙ্গীরের দুই সহযোগী গ্রেপ্তার

জয়যাত্রার টাকা হেলেনার সন্তানদের অ্যাকাউন্টে

এবার আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির পদ হারানো হেলেনা জাহাঙ্গীরের দুই সহযোগী হাজেরা খাতুন (৪০) ও সানাউল্ল্যাহ নূরীকে (৪৭) গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। গতকাল মঙ্গলবার ভোররাতে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

র‌্যাবের ভাষ্য, হাজেরা খাতুন জয়যাত্রা টেলিভিশন ও ফাউন্ডেশনের অবৈধ আয়ের নানা উৎস সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি হেলেনার আর্থিক বিষয়টি দেখভাল করতেন। জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের প্রায় ৫০ লাখ টাকা হেলেনা জাহাঙ্গীর তার সন্তানদের অ্যাকাউন্টে জমা করেছেন বলে জানিয়েছেন হাজেরা। এর আগে গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান।

গত ২৯ জুলাই রাজধানীর গুলশান থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে (৪৯) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এরপরই তার নানা অপকর্মের ফিরিস্তি প্রকাশ পেতে থাকে।

খন্দকার আল মঈন বলেন, ডিজিটাল প্ল্য্যাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তির সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হেলেনা জাহাঙ্গীরের অন্যতম সহযোগী হাজেরা খাতুন এবং সানাউল্ল্যাহ নূরী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হেলেনা জাহাঙ্গীরের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনের সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া অনেক ভুক্তভোগী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন। গ্রেপ্তার হাজেরা খাতুন ২০০৯ সালে কুমিল্লার একটি কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন মিরপুরে একটি গার্মেন্টসে অ্যাডমিন (এইচআর) পদে চাকরি শুরু করেন। তিনি হেলেনার নিকটাত্মীয় এবং একই সঙ্গে কর্মদক্ষতাগুণে তার অত্যন্ত আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে ২০১৬ সালে তিনি ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’-এর ডিজিএম হিসেবে নিযুক্তি পান। এরপর তিনি ‘জয়যাত্রা টিভি’ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জিএমের (অ্যাডমিন) পদে নিযুক্ত হন। হাজেরা খাতুন মূলত দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যক্রমসহ হেলেনার আর্থিক বিষয় দেখাশোনা করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, জয়যাত্রা টিভি ২০১৮ সাল থেকে হংকংয়ের একটি ডাউন লিংক চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচার হয়ে আসছে। যার ফ্রিকোয়েন্সি হংকং থেকে বরাদ্দ করা হয়েছে। ওই ফ্রিকোয়েন্সির জন্য হংকংকে প্রতি মাসে প্রায় ৬ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হয়।

তিনি বলেন, হংকং থেকে বরাদ্দ ফ্রিকোয়েন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রচারের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। সম্প্রচারের জন্য রিসিভার জয়যাত্রা টিভি বা তার প্রতিনিধির দ্বারা কেব্ল ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। প্রতিনিধিরা কেব্ল ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সম্প্রচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে চাকরিচ্যুত হন। এই টিভি বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি জেলায় সম্প্রচারিত হয়। টিভি চ্যানেলটি রাজধানী ও জেলা পর্যায়ের পাশাপাশি মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে ব্যাপক পরিকল্পনা নেওয়া হয়। যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অধিকসংখ্যক প্রতিনিধি নিয়োগের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা যায়।

তিনি আরও বলেন, গুরুত্ব বিবেচনায় জেলা প্রতিনিধি ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, উপজেলা প্রতিনিধি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা এককালীন দিতেন। এছাড়া প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। টিভিটি বিশ্বের প্রায় ৩৪টি দেশে সম্প্রচারিত হয়। যেখানে দেশের গুরুত্ব বিবেচনায় ১ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রতিনিধিরা নিয়োগ পেয়ে থাকেন। যারা প্রতি মাসে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে থাকেন। নিয়োগবাণিজ্য, অর্থ সংগ্রহ ও যাবতীয় হিসাবপত্র গ্রেপ্তারকৃত হাজেরা খাতুনের ওপর ন্যস্ত। তার দেওয়া তথ্যে জানা যায়, অর্থবাণিজ্যের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি নিয়োগ পেয়েছেন। হেলেনা জাহাঙ্গীরের পরিকল্পনা, উৎসাহে বা চাপে, নির্দেশনায় জয়যাত্রা টিভির কোনো কোনো প্রতিনিধি নেতিবাচক কর্মকান্ডে জড়িত হয়েছেন। এছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যক্তি প্রচার, প্রার্থিতা প্রচার, সাক্ষাৎকার ইত্যাদির মাধ্যমে আয় করা অর্থের একটি অংশ হাজেরার মাধ্যমে হেলেনা জাহাঙ্গীর নিতেন। যেসব বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমে প্রচারিত হতো না সেগুলো জয়যাত্রা টিভিতে প্রচার করা হতো। যেমন তাবিজ-কোবজ, টুটকা-ফাটকা, ভাগ্য বলে দিতে পারে, জিনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, ফাঁড়া কেটে যাওয়া এবং গোপন সমস্যার সমাধান ইত্যাদি।

এ র‌্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, হাজেরা খাতুন জানান হেলেনা জাহাঙ্গীর জয়যাত্রা টিভিকে নিজ প্রচার ও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করতেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জয়যাত্রা টিভি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতেন। তিনি তার প্রতিষ্ঠান থেকে চাকরিচ্যুতদের একইভাবে হেনস্থা করতেন। মূল মিডিয়া জগতের বিপরীতে হেলেনা জাহাঙ্গীর একটি সংগঠন তৈরির পরিকল্পনা করেন যেখানে পাঁচ হাজার সংবাদকর্মীর একটি বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে হাজেরা খাতুন জানান, এ ফাউন্ডেশনে ডোনার, জেনারেল মেম্বার, লাইফ টাইম মেম্বার ক্যাটাগরিতে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এ সংগঠনের প্রায় ২০০ জন সদস্য রয়েছেন। যাদের কাছ থেকে সদস্য পদবাবদ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব টাকা তার সন্তানদের নামে সঞ্চয় করা হতো।

খন্দকার আল মঈন বলেন, গ্রেপ্তার সানাউল্ল্যা নূরী জয়যাত্রা টিভির প্রতিনিধি সমন্বয়ক ছিলেন। তিনি হেলেনা জাহাঙ্গীরের নির্দেশনায় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ের কাজ করতেন। প্রতিনিধিদের কেউ মাসিক টাকা দিতে ব্যর্থ হলে বা গড়িমসি করলে তিনি ভয়ভীতি দেখাতেন। এলাকাতে তার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তিনি গাজীপুর গার্মেন্টস সেক্টরে ব্যাপক চাঁদাবাজি করে তার একটি অংশও জয়যাত্রা টিভিতে দিতেন।