কমছে গাছপালা বাড়ছে বজ্রপাত

বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গতকাল বুধবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আবহাওয়া ও পরিবেশবিদরা বলছেন, মূলত দেশে বনাঞ্চল কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে। আর এ ঘটনায় আগের তুলনায় বজ্রপাতের ঘটনাও বেড়ে গেছে। এমনকি যে মৌসুমে বজ্রপাত কম হওয়ার কথা, সে মৌসুমেও বজ্রপাত বেড়েছে। ফলে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে প্রাণহানির ঘটনাও।  

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশে গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে দক্ষিণ থেকে আসা গরম আর উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাসে আবহাওয়ার অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে আকাশে বজ্র মেঘ তৈরি হয়। এ ঘটনায় একটি মেঘের সঙ্গে আরেকটি মেঘের ঘর্ষণে বজ্রপাত হয়। এ সময় উচ্চ ভোল্টের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ যখন মাটিতে নেমে আসে, তখন সবচেয়ে কাছে যা পায় তাতেই আঘাত করে। বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ থেকে জুনের মধ্যে অর্থাৎ গ্রীষ্মকালে বজ্রপাত বেশি হয়। কালবৈশাখীর সঙ্গে তীব্র বজ্রপাতে এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় বজ্রপাতপ্রবণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। বিগত বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতের তীব্রতা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে বজ্রপাতে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। বজ্রপাতে মৃত্যুর খোঁজখবর রাখেন এমন ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে ১ হাজার ৮৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও সরকার কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ১০ লাখ তালের চারা রোপণ করে বজ্রপাত ঠেকানোর পরিকল্পনা  নিয়েছিল। কিন্তু গাছ লাগালেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বেশিরভাগ গাছই আর নেই।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ‘বাংলাদেশে বজ্রপাতের মূল কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। একদিকে বঙ্গোপসাগর, এরপরই ভারত মহাসাগর। সেখান থেকে আসছে গরম আর আর্দ্র বাতাস। আবার উত্তরে রয়েছে পাহাড়ি এলাকা। কিছু দূরেই হিমালয় পর্বত। যেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসে। এ দুই জায়গা থেকে আসা বাতাসের সংমিশ্রণ বজ্রপাতের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাছাড়া দিন দিন উঁচু গাছপালা কমে যাওয়ায় আগের তুলনায় প্রাণহানি বাড়ছে। পাশাপাশি বজ্র নিরোধক দন্ড ব্যবহার কমে যাওয়ায় বজ্রপাত বেড়ে গেছে। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বজ্রপাত একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশে এই সময়ে আবহাওয়া পরিবর্তনের জন্যই বজ্রপাত বেড়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় একসময় উঁচু উঁচু গাছপালা দেখা যেত। কিন্তু বর্তমানে সেসব গাছপালা খুবই কমে গেছে। এর প্রভাবে খোলা জায়গায় বজ্রপাত বেশি হচ্ছে এবং এর দরুন দিন দিন প্রাণহানিও বেড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের বিভিন্ন স্থানে উঁচু উঁচু গাছ লাগানো উচিত। পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলসমূহের বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সচেতনতামূলক খুদেবার্তা দেওয়া যেতে পারে। এতে করে প্রাণহানির ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, ‘সাধারণত মার্চ থেকে জুন মাসে বেশি বজ্রপাত হতে দেখা যেত। কিন্তু আবহাওয়াগত পরিবর্তন হওয়ায় আগস্ট মাসেও বজ্রপাত হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে গাছের চারা রোপণ করা হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। তাই সময় এসেছে আমাদের সচেতন হওয়ার। গাছপালা রক্ষণাবেক্ষণে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি দেশজুড়ে বজ্রনিরোধক দন্ড বসাতে পারলেও বজ্রপাতে প্রাণহানি অনেকটা কমে আসবে।