বজ্রপাতে মৃত্যু ও নিখোঁজ তালের আঁটি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বজ্রপাতে একটি বরযাত্রী দলের ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে দেশে বজ্রপাতের বিভীষিকা আবারও সামনে এলো। গত বুধবার তুমুল বৃষ্টিতে বরযাত্রী দলটি পদ্মাপাড়ের একটি ঘাটঘরে আশ্রয় নিলে সেখানেই এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। কিন্তু বজ্রপাত মারাত্মক হারে বাড়তে থাকা এবং বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকা যে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ তা কয়েক বছর আগেও স্বীকার করা হতো না। ২০১৬ সালের মে মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বজ্রপাতে একই দিনে ৫৭ জন মানুষ মারা যায়। এক দিনে বজ্রপাতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর রেকর্ড গড়ার পরপরই ২০১৬ সালের ১৭ মে বাংলাদেশের জাতীয় দুর্যোগের তালিকায় একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় বজ্রপাত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিজ্ঞান বিভাগের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ আট বছরে বজ্রপাতের ঘটনায় সারা দেশে অন্তত ১ হাজার ৮০০ মানুষ মারা গেছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে বিপুলসংখ্যক গবাদিপশুরও। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলেও এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ এখনো অপর্যাপ্তই রয়ে গেছে।

সাধারণত কিউমুলোনিম্বাস মেঘ থেকে বজ্রপাত ও বৃষ্টি হয় বলে এই মেঘকে বজ্রগর্ভ মেঘও বলা হয়ে থাকে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে এপ্রিল-মে মাসে বাংলাদেশে এই বজ্রগর্ভ মেঘের পরিমাণ বেড়েছে। বজ্রগর্ভ মেঘের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ যেমন বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য, তেমনি আরেকটা কারণ এই অঞ্চলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া। পরিবেশ দূষণের মাত্রা যত বাড়ছে, গড় তাপমাত্রাও ততই বাড়ছে। ফলে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার আদর্শ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তর এবং জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার তথ্যের বরাতে গবেষকরা আরও জানিয়েছেন বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ হাজার ৪০০-এর মতো বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ভেনেজুয়েলা ও ব্রাজিলে ঘটলেও ওই দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা অনেক বেশি। খোলা মাঠে কাজ করা, বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা না জানা এবং বজ্রপাত বিষয়ে অচেতনতাই এত বেশি মৃত্যুর কারণ বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদরা। সবচেয়ে বেশি বজ্রপাতের শিকার হন খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা।

তালগাছের মতো উঁচু গাছপালা বজ্রকে কাছে টেনে নিয়ে ভূমিতে বজ্রপাত ঠেকিয়ে দেয়। কিন্তু এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা উপকরণটিরও যথাযথ ব্যবহার করা যায়নি দেশে। বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণার পর ২০১৭ সালে সরকার বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে দেশব্যাপী ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু পরের বছর ২০১৮ সালের শুরুতেই ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সচিব জানিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তালগাছ নয়, সারা দেশে ৩১ লাখ তালের আঁটি রোপণ করা হয়েছে। কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা কাবিখা কর্মসূচির অধীনে এই তালের আঁটি রোপণ করা হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রাস্তার দুইপাশে। কিন্তু সে বছরই পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনে জানা যায়, তালের আঁটি রোপণের বিষয়টি কাগজে থাকলেও রাস্তার পাশে সেসব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর! অন্যদিকে আবহাওয়া বিজ্ঞানের বিভাগের অধ্যাপকরা জানিয়েছেন, তালগাছের মতো গাছগুলো রোপণ করা উচিত খোলা মাঠে, তাহলেই এটি বেশি কাজে দেবে।

গ্রামাঞ্চলে প্রবাদ আছে যে তালগাছ লাগায় সে ওই গাছের তাল খেয়ে যেতে পারে না, ফল খায় পরের প্রজন্ম। কথাটা দ্ব্যর্থবোধক। পরের প্রজন্মের জন্য ভালো ফল ভোগের ব্যবস্থা করে যেতে পারা ইতিবাচক ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, লাখ লাখ তালের আঁটিতে কটা তালের চারা বড় হচ্ছে সেই খোঁজ কে রাখছে? অবশ্য সরকার যে শুধু তালের আঁটির ওপরই নির্ভর করছে এমন নয়। সে সময় এর পাশাপাশি হাওর অঞ্চলে টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনাও নেয় সরকার। আশার কথা হলো, তালগাছের প্রাকৃতিক প্রযুক্তির বাইরে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর লক্ষ্যে দেশবাসীকে আগাম সতর্কবার্তা দিতে দেশের আটটি স্থানে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত চিহ্নিতকরণ যন্ত্র বা লাইটনিং ডিটেকটিভ সেন্সর বসিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ছাড়াও ময়মনসিংহ, সিলেট, পঞ্চগড়, নওগাঁ, খুলনা, পটুয়াখালী এবং চট্টগ্রামে এই সেন্সর বসানো হয়েছে। একেকটি সেন্সরের রেঞ্জ ২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে এই আটটি সেন্সর দিয়েই দেশের বজ্রপাতপ্রবণ বেশিরভাগ অঞ্চলে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব। এসব সেন্সর দেশের আবহাওয়া গবেষণায় কাজে লাগবে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সেন্সর থেকে তথ্য নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। এমন সতর্কবার্তা জানানোর সহজ পথ খুঁজে বের করার পাশাপাশি সারা দেশে বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ‘লাইটনিং টাওয়ার’ বা উঁচু ধাতব থাম বসানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবেশী ভারতসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার খোলা প্রান্তরে এমন ধাতব থাম বসিয়ে সুফল পাওয়া গেছে।