কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় মানব পাচারে বেশ কয়েকটি দালাল চক্র সক্রিয়। তাদের ফাঁদে পড়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টায় এলাকার অসংখ্য তরুণ-যুবক নিঃস্ব হচ্ছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দেশীয় দালালদের গ্রেপ্তার করা হলেও থামছে না ইতালি যাত্রা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, অবৈধ ট্রাভেল ব্যবসায়ী ও বিদেশে থাকা মানব পাচারকারীদের হয়ে কমিশনভিত্তিতে কাজ করেন দালালরা। তারা নানাভাবে ফুসলিয়ে তরুণ-যুবকদের রাজি করান। এরপর ট্রাভেল ব্যবসায়ী ও বাইরের মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। দেন-দরবারে মিললে এ প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে লোক নিয়ে ট্রানজিট হিসেবে লিবিয়ায় রাখা হয়। সেখানে তাদের জিম্মি করে পরিবার থেকে আরেক দফা মুক্তিপণ আদায় করা হয়। এ জন্য নির্যাতনের ভিডিও এ দেশীয় দালালদের মাধ্যমে পরিবারকে দেখিয়ে টাকা আদায় করা হয়।
ভৈরবে মানব পাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে শত শত যুবকের জীবনে নেমে এসেছে অন্ধকার। অনেকের পরিবার ধারদেনা ও ভিটেমাটি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েও সন্তানের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না। পরে ঋণের চাপে ফেরারি জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা জানান, ভৈরবে লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালি পাঠাতে কাজ করছে মানব পাচার চক্রের বেশ কয়েকটি গ্রুপ। এদের মধ্যে পৌর এলাকার জগন্নাথপুরের জাফর, লক্ষ্মীপুরের উজ্জ্বল, শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপুর গ্রামের জুনায়েদ, কালিকাপ্রসাদ পশ্চিম পাড়ার সোহাগ, শ্রীনগরের তানভিরুল অন্যতম। তাদের কেউই দেশে থাকেন না। লিবিয়া থেকে নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বর, পরিবারের লোকজন ও মনোনীত এ দেশীয় দালালদের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন করেন। সাড়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তারা ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেন।
ইতালির উদ্দেশে লিবিয়া যাওয়ার পর বাংলাদেশিদের অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে পাসপোর্ট ও সঙ্গের ডলার কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর শারীরিক নির্যাতন করে দেশ থেকে আরও ১২-১৩ লাখ টাকা মুক্তিপণ এনে দিতে বলা হয়। অভিভাবকরা সন্তানের খোঁজখবর না পেয়ে দালালের স্বজনদের কাছে ঘুরতে থাকেন। এরই মধ্যে বিদেশ থেকে যোগাযোগ করে সন্তানরা জীবন বিপন্নের কথা বললে অভিভাবকরা ধারদেনা ও ভিটেমাটি বিক্রি করে দালালদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও স্বজনদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেন। এরপর কেউ মুক্তি পেয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে আসেন। দালালদের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয় অথবা আংশিক পরিশোধ করেন, তাদের সন্ধান পান না পরিবারের লোকজন। হঠাৎ একদিন তাদের মৃত্যুর সংবাদ আসে দেশে।
এমনই এক ঘটনায় গত বছরের ২৮ মে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার চেষ্টাকালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন। এদের মধ্যে ভৈরবের ছয়জন। এসব পরিবারে এখনো চলছে মাতম।
ওই ঘটনায় মারা যান ভৈরব বাজার দক্ষিণ ঋষিপট্টির অধীর দাসের ছেলে রাজন দাস (২৭)। ছেলের লাশ না দেখার আক্ষেপ পোড়াচ্ছে অধীর চন্দ্র দাস ও তার স্ত্রী মিনা রানীকে। মায়ের মুখ থেকে রাজনের চার বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে ঐশী জানে, তার বাবা বিদেশে, বিমানে করে আসবে দেশে।
অধীর দাস বলেন, ‘জগন্নাথপুরের দালাল জাফরের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকা চুক্তিতে রাজন লিবিয়া যায়। সেখানে জিম্মি অবস্থায় ভিডিওকলে ৫ লাখ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলবে বলে জানায়। এরপর ধারদেনা করে জাফরের ফুফাতো ভাই জুয়েলের হাতে ৪ লাখ টাকা তুলে দিলেও তাকে বাঁচাতে পারিনি।’
একই ঘটনায় মারা যান উপজেলার রসুলপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে আকাশ (২৬)। শ্রীনগর গ্রামের দালাল তানভিরুলের মাধ্যমে লিবিয়া যান তিনি। সেখান থেকে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে ত্রিপোলি গিয়ে জিম্মি হন। মুক্তিপণের টাকা পরিশোধের আগেই দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারান তিনি।
আকাশের বড় ভাই মো. মোবারক হোসেন বলেন, ‘জিম্মি জানার পর তানভিরুলের সঙ্গে বহু চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। মামলা করলে তার দুই সহযোগীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।’
গত ১৩ এপ্রিল উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের শম্ভুপুর গ্রামের দালাল জুনায়েদের মাধ্যমে লিবিয়া যান ভৈরবপুর উত্তরপাড়ার মুজাহিদ পাঠান ইমন। ৯ মে ত্রিপোলিতে ভৈরবের আরও তিন যুবকের সঙ্গে জিম্মি হন তিনি। অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে তার ভিডিও পরিবারকে দিয়ে ১৩ লাখ টাকা চাওয়া হয়। পরিবার জুনায়েদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। পরে রংপুরের একজনের মাধ্যমে টাকা দিয়ে মুক্ত হন ইমন। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন।
শিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউনিয়ন থেকে অন্তত ৫০০ জন ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে এলাকা ছেড়েছে। প্রতি মাসে ৪-৫টি পরিবার স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। আমরা এ দেশে তাদের পরিবারকে তলব করলেও খুব একটা লাভ হয় না। কারণ এসব লেনদেনের কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেন না ভুক্তভোগীরা।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুবনা ফারজানা বলেন, ‘অবৈধভাবে বিদেশ না যেতে আমরা নিরুৎসাহিত করি। এ জন্য সভা-সেমিনারও করা হয়। আমাদের কথা না শুনে অনেকেই বিপদে পড়েন। কিন্তু পুরো প্রক্রিয়া অবৈধ হওয়ায় আমরা তাদের আইনি কোনো প্রতিকার দিতে পারি না।’