দলে ‘শুদ্ধি অভিযান’ চান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের নেতারা। আগামী বছর দলের দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আগেই বিতর্কিত ও বিভিন্ন কমিটিতে স্থান পাওয়া অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে দলের বেশিরভাগ নেতা। বিনোদন জগতের কোনো কোনো তারকার বিতর্কিত কর্মকা- নিয়ে চলমান ধরপাকড়েরও পক্ষে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। তারা মনে করেন, টানা
তৃতীয়বার দল ক্ষমতায় থাকার কারণে গত ১২ বছরে দলে সুবিধাবাদীরা নিজেদের অপকর্মের জন্য ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন কেউ কেউ। তারা দলের ইমেজ ক্ষুন্ন করছেন। চিত্রনায়িকা পরীমণি, মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, মরিয়ম আক্তার মৌসহ অন্য সব মডেল ও চিত্রজগতের নায়ক-নায়িকাদের এসব অপকর্মের সঙ্গে দলীয় বা প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পক্ষে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। তারা বলেন, অপসংস্কৃতির মাধ্যমে দেশকে এবং দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী যারাই করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতেই হবে। পাশাপাশি উপকমিটি বা আওয়ামী লীগের যেকোনো কমিটির নেতাকর্মী যারা দুর্নীতি ও বিতর্কিত কাজ করছেন তাদের জন্য দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা কেউই মানবে না। তারা মনে করেন, আওয়ামী লীগের সমর্থন বাড়ছে এটা যেমন সত্যিই, তেমনি সুবিধা নেওয়ার সংখ্যাও বাড়ছে। বিতর্কিত এই নেতাকর্মীদের এখনই চিহ্নিত করে দল থেকে বাদ দিতে হবে এবং অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী তাদের শাস্তিও দিতে হবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, গত ১০/১২ বছর ধরে দলে অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা বেড়েছে। এরা অনেকেই প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন। দলের নাম ব্যবহার করে দুর্নীতি ও অবৈধ ব্যবসা করছেন। এক্ষেত্রে তৃণমূলের ত্যাগী নেতারাও কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সব স্তরে শুদ্ধি অভিযানের দাবি তুলেছেন। সম্প্রতি উপকমিটির হেলেনা জাহাঙ্গীর, দর্জি মনিরসহ বিনোদন জগতের অনেকের অপকর্মের বিষয় বেরিয়ে আসায় দল আরও সোচ্চার হয়েছে শুদ্ধি অভিযানে। রিমান্ডে বিনোদন জগতের গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে অনেকের জড়িত থাকার বিষয়টিও বেরিয়ে এসেছে।
দলের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৃণমূলের নেতারা দলীয় সভাপতির কাছেও নব্য ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। তারা বলেছেন, ‘জেলা ও উপজেলায়ও অনেক এমপি অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন। তারা দলের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো বিতর্কিতদের অনেককেই কমিটিতে নিয়েছেন। আবার অনেকেই দল না করেও উপকমিটিতে স্থান পেয়েছেন। এদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিলে আগামী নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা বাড়বে। আর সম্মেলনের আগেই এদের চিহ্নিত করতে হবে।’ সভাপতিমণ্ডলীর ওই সদস্য বলেন, ‘দলীয় সভাপতি কেন্দ্রীয় নেতাদের গত দুই মাস আগেই নির্দেশ দিয়েছেন বিতর্কিতদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে। এর জন্য কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ বড় একটি দল। এখানে বিতর্কিতরা আসতে পারে। আবার অনেকেই পদ পদবি পেয়ে দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। দল সব সময়ই বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর। এর আগেও শুদ্ধি অভিযান হয়েছে। উপকমিটির মধ্যে যারা বিতর্কিত কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর চলমান অভিযানে বিনোদন জগতের যেসব তথাকথিত সেলিব্রেটি অপসংস্কৃতি ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর হওয়ার পক্ষে আমরা। যারা তরুণ সমাজকে নষ্ট করার কাজ করবে তাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান কঠোর।
আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, ‘উপকমিটি কেন, যেকোনো কমিটিতেই পদ দিতে হলে আমাদেরকে কর্মী সম্পর্কে জানতে হবে। সুপারিশ কেউ করতেই পারেন। তবে যাচাই-বাছাই হতে হবে। সেখানে ব্যক্তিগত বলয় গড়ে তোলা হলে বিতর্কিতদের সংখ্যা বাড়বে। তাতে দল ও সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। তিনি বলেন, ‘যাচাই-বাছাই করে পদ দিলে পরে ওই ব্যক্তিকে অব্যাহতি বা বহিষ্কার করার প্রয়োজন হয় না।’
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘শিল্প-সংস্কৃতির নামে অবৈধ-অনৈতিক কর্মকা- যারা করছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হতেই হবে। কারণ এখানে অনেক বড় বড় সেলিব্রেটিরা রয়েছেন। তাই যারা অপরাধ করছেন তাদের আলাদা করতে পারলে এই অঙ্গনের সুনাম অক্ষুন্ন থাকবে। কেউ এখানে এসে ধান্ধাবাজি করতে পারবেন না।’ আওয়ামী লীগের উপকমিটি বা তৃণমূলে ঘাপটি মেরে থাকা অনুপ্রবেশকারী ও সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগে বিতর্কিত এবং অপকর্মকারীদের স্থান হবে না। আমাদের সভাপতি শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে কোনো ছাড়ই দেবেন না। বড় দল হিসেবে অনেকেই এখানে আসে। কিন্তু যখনই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তখনই আমরা তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। সম্মেলন বা নির্বাচন কেন, সব সময়ই শুদ্ধি অভিযান চলমান।’ বিনোদন জগতের কয়েকজনের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান ও মামলা সম্পর্কে নাছিম বলেন, ‘অপসংস্কৃতির কোনো প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।’
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, দলে ঢুকে যারা সরকারের ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে তাদের অধিকাংশই নেতাদের কারও না কারও সুপারিশে আওয়ামী লীগে পদ পেয়েছেন। এমনকি করোনা মহামারীকালে করোনার ভুয়া পরীক্ষা করে ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত শাহেদও আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক উপকমিটির সদস্য হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশেই। সম্প্রতি ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে হঠাৎ বিতর্কের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিতে আসা আলোচিত-সমালোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীর। তিনি আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটিরও সদস্য। সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য সদ্য উপকমিটির সদস্য পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।