কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ায় সরকারের প্রতিটি স্তরে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। নিজ নিজ অবস্থানে থেকে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এ আদেশের রহস্য খোঁজার চেষ্টা করছেন। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে এর কারণ বের করতে না পেরে তারা নিজ নিজ ফোরামের নেতাদের কাছে জানতে চাচ্ছেন। সেখানে সমাধান না পেয়ে যাচ্ছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। সবকিছু মিলিয়ে মহামারী-কবলিত প্রশাসনে সম্পদের হিসাব নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
গত ২৭ জুলাই ছিল পাবলিক সার্ভিস দিবসের উদ্বোধন এবং ২০২০ ও ২০২১ সালের জনপ্রশাসন পদক প্রদান অনুষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে এ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়েছিলেন। আর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ওসমানী মিলনায়তনে জড়ো হয়েছিলেন। এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা, সংস্থা বা দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের জনসেবা ও উদ্ভাবনী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এই পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের সচিব, গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছিলেন। কর্মকর্তাদের এ মিলনমেলাটি পরিণত হয়েছিল সরকারের হঠাৎ কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়ার কারণ অনুসন্ধানের আলোচনার মেলায়। বিভিন্ন ফোরামের নেতাদের কাছে পেয়ে ব্যাচমেট থেকে শুরু করে জুনিয়র কর্মকর্তারা পর্যন্ত এ বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক একজন সভাপতির কাছে একাধিক কর্মকর্তা জানতে চেয়েছিলেন, ‘স্যার, সম্পদের হিসাব চাওয়ার কারণ কী?’
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ওইদিন সাবেক ওই সভাপতিও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করতে পারেননি। তিনি জুনিয়র কর্মকর্তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিধান তো রয়েছেই। কাজেই আমাদের সম্পদের হিসাব দিতে আপত্তি কোথায়। কিন্তু জুনিয়র কর্মকর্তাদের জবাব ছিল, হঠাৎ করে এমন কী হয়েছে? এই সময়ে এসে সরকার কেন সম্পদের হিসাব চাচ্ছে?
ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারাও। তাদের কাছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা হঠাৎ সম্পদের হিসাব চাওয়ার কারণ বোঝার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. ফরহাদ হোসেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আলী আজম এমনকি শৃঙ্খলা শাখার কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থানে সরকারের কর্মকর্তাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেক কর্মকর্তা সম্পদের হিসাব চাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না তা জানতে চাচ্ছেন।
হঠাৎ সম্পদের হিসাব নেওয়ার কারণ এবং এ হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করা হবে কি না জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব কে এম আলী আজম বিষয়টি নিয়ে শৃঙ্খলা ও তদন্ত বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এ এফ এম হায়াতুল্লাহর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ এফ এম হায়াতুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কৌতূহলের কিছু নেই। সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময়ই সম্পদের হিসাব দিতে হয়। এরপর পাঁচ বছর পরপর সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা রয়েছে। সম্পদের হিসাব নেওয়া নিশ্চিত হলে দুর্নীতি কমবে, সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।
অতিরিক্ত সচিব জানান, আমরা প্রথমে তাগিদ দিয়ে চিঠি দিলাম। কিছুদিনের মধ্যে সময় বেঁধে দেওয়া হবে। আমরা সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত কাজের অংশ করে নিতে চাই। কেউ চাকরি জীবনে এলে, অন্যান্য কাজের মতো সম্পদের হিসাব দেওয়ার বিষয়টি তার রুটিন দায়িত্বের মধ্যে থাকবে। এটা হলে কর্মকর্তারা তার সম্পদের বিষয়ে আপডেটেড থাকবেন।
অতীতেও এভাবে সব সরকারি কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সম্পদের হিসাব নেওয়া পর্যন্তই। সরকার এসব হিসাবের বিশ্লেষণ করেনি। এতে করে সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্দেশ্যই পূরণ হচ্ছে না। বিশ্লেষণ করে কার সম্পদ বেড়েছে বা কমেছে তা যাচাই না করা হলে এ হিসাব নেওয়ার দরকার কী এই প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত সচিব বলেন, এবার সম্পদের হিসাব নেওয়া হবে এবং পর্যালোচনাও করা হবে। কারও সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে তার কাছে সেটার ব্যাখ্যা চাওয়া হবে। আগে সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিধান থাকলেও তা পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল না। এবার সেই বিধানও যুক্ত করা হচ্ছে।
হঠাৎ করে এভাবে সম্পদের হিসাব চওয়ার কারণ কীজানতে চাইলে এ এফ এম হায়াতুল্লাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা বলেছেন। তিনি সর্বশেষ যখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করেন তখনও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশনা কার্যকর করার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়টিও এরই ধারাবাহিকতার অংশ। দীর্ঘ সময় নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়টি মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদন নিয়েই সব সরকারি কর্মচারীর সম্পদের হিসাব চাওয়া হয়েছে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে চিঠি দিতে পারে না মন্ত্রণালয়।
সব সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দিতে গত ২৪ জুন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল এবং স্থাবর সম্পত্তি অর্জন বা বিক্রির অনুমতি নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ নিয়ম মানছেন না, এ বিষয়ে সরকারেরও কোনো তদারকি নেই।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে জানানো হয়, ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি ১১, ১২ ও ১৩-তে সরকারি কর্মচারীদের স্থাবর সম্পত্তি অর্জন, বিক্রয় ও সম্পদ বিবরণী দাখিলের বিষযয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুশাসন নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত বিধিসমূহ কার্যকরভাবে কর্মকর্তাদের অনুসরণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন। ‘সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮’-এর আওতাভুক্তদের তাদের নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়, দপ্তর, সংস্থায় কর্মরত সব সরকারি কর্মকর্তার সম্পদ বিবরণী দাখিল, ওই সম্পদ বিবরণীর ডাটাবেজ তৈরি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে স্থাবর সম্পত্তি অর্জন ও বিক্রয়ের অনুমতি নেওয়ার বিষয়ে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ১১, ১২ এবং ১৩ বিধি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিপালনের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানোর নির্দেশনা দেওয়া হয় ওই চিঠিতে। এছাড়া সরকারি কর্মচারীর জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট বা যেকোনো সম্পত্তি কেনা বা অর্জন ও বিক্রির অনুমতির জন্য আবেদনপত্রের নমুনা ফরম এবং বিদ্যমান সম্পদ বিবরণী দাখিলের ছকও চিঠির সঙ্গে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ২০১৯ সালে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ভূমি মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তর ও সংস্থার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়া হয়েছিল। দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব ভূমি সেবা দিতে অন্যতম কৌশল হিসেবে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার ঘোষণা দেন।
ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব দপ্তরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ জারি করে ভূমি মন্ত্রণালয়। নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হওয়ায় প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব নিতে পারেনি ভূমি মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তারাও পার পেয়েছিলেন বিধিবিধানের কারণেই।
ভূমি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সংস্থার ১৭ হাজার ৫৭৬ জন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে ১৭ হাজার ২০৮ সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিল করে। বিভাগীয় মামলায় সাময়িক বরখাস্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে থাকার কারণে ৩৬৮ জন কর্মচারী সম্পদের বিবরণী দাখিল করতে পারেননি। একা সম্পদের হিসাব চাওয়ায় অনেক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী।