চিত্রনায়িকা পরীমণির সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় আলোচনায় আসার পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) গোলাম সাকলায়েন শিথিলকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
গতকাল শনিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বিষয়টি জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ফারুক হোসেন। তিনি বলেন, ‘এডিসি গোলাম সাকলায়েন শিথিলকে ডিবির সব দায়িত্ব থেকে নিবৃত্ত করে পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) পশ্চিমে পদায়ন করা হয়েছে।’
ঢাকা বোট ক্লাবের ঘটনায় পরীমণির ধর্ষণচেষ্টা মামলার তদন্তভার পান এডিসি গোলাম সাকলায়েন শিথিল। এরই সূত্র ধরে পরীমণির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে দুজন প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সম্প্রতি পরীমণি সাকলায়েনের বাসায় গিয়ে প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থান করেন বলে খবর প্রকাশ পায়।
সময় কাটানোকে ‘অনৈতিক’ আখ্যা দিয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘এমন কিছু হয়ে থাকলে আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘গোলাম সাকলায়েন শিথিলকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি করা হবে। তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
গতকাল সকালে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান কার্যালয়ে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. ওমর ফারুক সাংবাদিকদের জানান, পরীমণির সঙ্গে গোলাম সাকলায়েন শিথিলের অনৈতিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখছেন তারা।
পরীমণি এখন আসামি। অন্য একটি মামলার বাদী তিনি। তার সঙ্গে মামলার তত্ত্বাবধায়কের (সুপারভাইজার) অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ তদন্তে উঠে আসবে কি নাএমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই উঠে আসবে। আমরা সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করব। মামলা এবং আসামি-সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন মাধ্যম ও গণমাধ্যমে যা আসবে, তদন্তের সময় সেগুলো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
গত বুধবার র্যাব বনানীর বাসায় অভিযান চালিয়ে পরীমণিকে আটক করে। পরের দিন তার বিরুদ্ধে বনানী থানায় মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করে বনানী থানা।
গত ১৩ জুন ঢাকা বোট ক্লাবের ঘটনায় পরীমণি ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ আনার পরদিন উত্তরার একটি বাসা থেকে ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে এ ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশের গুলশান বিভাগ পরীমণিকে কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। অভিযোগ উঠেছে, মামলাটি তদন্ত করতে গিয়েই পরীমণির সঙ্গে পরিচয় হয় গোলাম সাকলায়েন শিথিলের। এরপর তিনি নিয়মিত পরীমণির বাসায় যাতায়াত শুরু করেন। গাড়ি নিয়ে তারা ঘুরতে বের হতেন। স্ত্রী-সন্তান থাকার পরও পরীমণির কাছে নিজেকে অবিবাহিত হিসেবে তুলে ধরেন সাকলায়েন। সম্প্রতি তার বাসায় এসে প্রায় ১৮ ঘণ্টা অবস্থান করেন পরীমণি। গ্রেপ্তারের পর তিনি অকপটে দুজনের সম্পর্কের কথা স্বীকার করেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পরীমণি জানান, নিয়মিত কথা বলতে বলতে গোলাম সাকলায়েন শিথিলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয় তার। এরপর তারা নিয়মিত গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বের হতেন। সাকলায়েন তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন। সর্বশেষ গত ১ আগস্ট সাকলায়েনের সরকারি বাসভবন রাজারবাগের মধুমতী ফ্ল্যাটে যান পরীমণি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পরীমণির সহযোগী আশরাফুল ইসলাম দীপু জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, ঈদুল আজহার পর তিনি পরীমণির বাসায় গিয়ে জানতে পারেন গোলাম সাকলায়েন এসে তার বাসায় তিন দিন ছিলেন। গোলাম সাকলায়েনের সঙ্গে পরীমণির প্রেমের সম্পর্কের কথা জানতেন তিনি। পরীমণিই বিষয়টি তাকে জানিয়েছেন। তবে গোলাম সাকলায়েন নিজেকে অবিবাহিত বলে দাবি করেন। পরে সাকলায়েন বিবাহিত জানতে পেরে পরীমণি ক্ষুব্ধ হন। এ সময় সাকলায়েন স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেছে বলে দাবি করেন।
গোলাম সাকলায়েনের স্ত্রী প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ঢাকার পার্শ্ববর্তী একটি জেলায় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। এ দম্পতির একটি সন্তান রয়েছে।
গোলাম সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনের সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, গত ১ আগস্ট সকাল ৮টার দিকে পরীমণি নিজের হ্যারিয়ার গাড়ি নিয়ে গোলাম সাকলায়েনের মধুমতীর ফ্ল্যাটে যান। এ সময় ১০তলা থেকে গোলাম সাকলায়েন এসে পরীমণিকে রিসিভ করে বাসায় নিয়ে যান। পরীমণির খালাতো বোন শায়লা ও তার স্বামীও ওই রাতে সেখানে যান। পরে রাত ২টার দিকে পরীমণি ও তার স্বজনরা বাসা থেকে বের হয়ে যান।
সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পরীমণিকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে সাকলায়েনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক জানা যায়। পরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে পেরে মধুমতী বাসভবনের তত্ত্বাবধায়ক শামীমকে সিসিটিভি ফুটেজের ডিভিআরসহ পুলিশ সদর দপ্তরে ডেকে পাঠান। ফুটেজ দেখে তারা পরীমণির বক্তব্যের সত্যতা পান। এরপরই গতকাল তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
পরীমণির গাড়িচালক নাজির হোসেন জানান, গত ১ আগস্ট পরীমণিকে নিয়ে তিনি রাজারবাগের সরকারি কোয়ার্টারে একটি বাসার সামনে নামিয়ে দেন। এরপর তিনি সেখান থেকে বনানীর বাসায় চলে যান। রাতে তাকে পরীমণি গাড়ি নিয়ে তার খালাতো বোন ও বোন জামাইকে নিতে রাজারবাগের ওই বাসায় যেতে বলেন। তিনি আরও জানান, ওই লোকের (সাকলায়েন) সঙ্গে পরীমণি দুদিন রাতের বেলা হাতিরঝিলে ঘুরতে গিয়েছিলেন। সেখানে গাড়িতে বসেই তারা মদপান করেন।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে গোলাম সাকলায়েন শিথিল সাংবাদিকদের জানান, পরীমণির সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে। তবে তা প্রেমের সম্পর্ক নয় এবং তারা বিয়েও করেননি। তার বাসায় পরীমণির যাওয়ার কথাও অস্বীকার করেন গোলাম সাকলায়েন।