দেশে করোনার গণটিকাদান কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন ছিল গতকাল রবিবার। এদিন দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং প্রথম দিন যেসব এলাকায় টিকা দেওয়া যায়নি সেসব এলাকার মানুষ টিকা পেয়েছেন। প্রথম দিনের মতো গতকালও টিকা নিতে কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিল। টিকার তুলনায় মানুষ বেশি হওয়ায় যথারীতি প্রথম দিনের মতোই অসংখ্য মানুষকে ফিরে যেতে হয়েছে টিকা ছাড়াই। চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়েছে কেন্দ্রের কর্মীদের। বেশকিছু জায়গায় বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টি হয়।
রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গতকাল গণটিকাদানের দ্বিতীয় দিনেও গ্রহীতাদের মধ্যে ছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা। তবে কিছু কিছু কেন্দ্রে টিকা না পাওয়ায় বিশৃঙ্খলাও হয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় টিকা সংকটে স্থগিত করা হয়েছে কর্মসূচি বলে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় দিন টিকা নিতে আসা মানুষের যে ভিড়, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে কভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর ডা. শামসুল হক বলেন, ‘যে পরিমাণ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ছয় দিনে ৩৫ লাখের বেশি মানুষ টিকার প্রথম ডোজের আওতায় আসবে।’
এ কর্মকর্তা জানান, কর্মসূচির আওতায় দুর্গম এলাকাগুলোতে টিকাদান নিশ্চিত করতে হেলিকপ্টারে টিকা পাঠানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছেন।
ডা. শামসুল হক বলেন, ‘প্রত্যেক এলাকার মানুষ যেন টিকা পান, সে চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেক বড় এলাকা আছে যেগুলোতে শনিবার টিকা দেওয়া যায়নি। যেমন বরিশাল, খুলনা, কক্সবাজার এলাকায় প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে; সেখানে টিকা দেওয়া হবে। একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে হেলিকপ্টার দিয়ে আমরা আগামীকাল (আজ) টিকা পাঠাব। হেলিকপ্টারে টিকা নামবে, কর্মীরা কাজ করে চলে আসবে।’
তিনি জানান, কভিড মহামারীতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ঠেকাতে ১৪ কোটি নাগরিককে বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে টিকা পেয়েছেন পৌনে দুই কোটির বেশি মানুষ। গত ৭ ফেব্রুয়ারি দেশে গণটিকাদান শুরু হলেও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে কেনা টিকা সময়মতো না পাওয়ায় তার গতি ব্যাহত হয়।
ভারত থেকে টিকা না আসায় চীন থেকে টিকা কিনছে সরকার। পাশাপাশি টিকা সরবরাহের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম কোভ্যাক্স থেকেও টিকা আসতে শুরু করেছে। বর্তমানে দেশে মডার্না ও সিনোফার্মের পাশাপাশি দ্বিতীয় ডোজ হিসেবে অ্যাস্ট্রাজেনেকা এবং ফাইজারের টিকা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের কেনা, উপহার পাওয়া এবং কোভ্যাক্সের মাধ্যমে পাওয়া টিকা মিলিয়ে এ পর্যন্ত দেশে এসেছে ২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার ৯২০ ডোজ টিকা।
সরকারের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে সারা দেশে ইউনিয়ন পর্যায়ে ছয় দিনব্যাপী করোনার গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। তবে এ সময় সরকারের পূর্বঘোষণা অনুযায়ী এক কোটি মানুষকে টিকা দেওয়ার কথা থাকলেও এখন দেওয়া হবে ৩২ লাখ মানুষকে। সে হিসাবে ৬৮ লাখ টিকা কমিয়ে আনা হয়েছে। ১২ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশের ১৫ হাজারের বেশি টিকাদান কেন্দ্রে প্রায় ৩২ লাখ মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হবে। এ সময় শুধু ২৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সী মানুষই টিকা পাবেন। টিকায় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়স্ক জনগোষ্ঠী, নারী এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে। এই ছয় দিন টিকা নিতে আগে থেকেই নিবন্ধন করতে হবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে গেলেই টিকা পাবেন ২৫ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষ।
কর্মসূচির প্রথম দিন গত শনিবার দেশের সব ইউনিয়ন, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে টিকা দেওয়া হয়েছে। সেদিন যেসব ইউনিয়নে নিয়মিত টিকাদান চালু ছিল, সেসব ওয়ার্ডে এবং পৌরসভার বাদ পড়া ওয়ার্ডের মানুষ গতকাল টিকা পেয়েছেন এবং এসব এলাকায় আজও টিকা দেওয়া হবে। গতকাল থেকে দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে এবং চলবে আজ পর্যন্ত। এরপর আগামী ১০-১২ আগস্ট ৫৫ বছরের বেশি বয়সী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের টিকা দেওয়া হবে।
প্রথম দিন টিকা ২৯ লাখ : দেশে গণটিকাদান কর্মসূচির প্রথম দিন গত শনিবার ২৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭০ জনকে করোনার টিকা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ডা. শামসুল হক বলেন, ‘যে টার্গেট ছিল, আমরা তার কাছাকাছি চলে এসেছি। ২৯ লাখ মানুষ টিকা নিয়েছেন। আমাদের ধারণা এটা ৩৫ লাখের ওপরে চলে যাবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণটিকাদান কর্মসূচির কারণে গত শনিবার এক দিনে এই প্রথম সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষকে টিকা দেওয়া হয়। শনিবার পর্যন্ত দেশে মোট প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয় ১ কোটি ৩০ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৯টি। এর মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৫৮ লাখ ২০ হাজার ৬৩টি, ফাইজারের ৫০ হাজার ২৫৫টি, সিনোফার্মের ৫৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৩টি এবং মডার্নার ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৬১৮টি।
গণটিকা কার্যক্রমের প্রথম দিন এবং স্বাভাবিক টিকা প্রদান কার্যক্রম মিলিয়ে শুধু গত শনিবার প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ২৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৭২টি। যেখানে সিনোফার্মের ২৪ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫১টি এবং মডার্নার ২ লাখ ৮৩ হাজার ৭২১টি টিকা দেওয়া হলেও এদিন প্রথম ডোজে দেওয়া হয়নি অ্যাস্ট্রাজেনেকা ও ফাইজারের টিকা।
অন্যদিকে শনিবার পর্যন্ত দেশে মোট দ্বিতীয় ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে ৪৪ লাখ ৯৭ হাজার ৩১৫টি। যার মধ্যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ৪৩ লাখ ৭১ হাজার ৩১০টি, ফাইজারের ১১ হাজার ৭১২টি, সিনোফার্মার ১ লাখ ১৪ হাজার ২৯৩টি এবং মডার্নার এখন পর্যন্ত দ্বিতীয় ডোজের কোনো টিকা প্রদান করা হয়নি। নারী-পুরুষের টিকা প্রদানের হিসাবে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৬ পুরুষ ও ১২ লাখ ৬৮ হাজার ২৩৬ জন মহিলা প্রথম ডোজের টিকার আওতায় এসেছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় ডোজ টিকার আওতায় আসা পুরুষের সংখ্যা ৩৩ হাজার ২৩৭ এবং নারী সংখ্যায় ২০ হাজার ৫৬১ জন।
রাজশাহী সিটিতে কার্যক্রম স্থগিত : রাজশাহী সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, টিকা না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে গণটিকাদান ক্যাম্পেইন আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। আজ সোমবার থেকে সরকার নির্ধারিত চারটি কেন্দ্রে দেবে। নিবন্ধিত যারা টিকা নিতে এসএমএস পাবেন, শুধু তাদের টিকা দেওয়া হবে। এই চারটি কেন্দ্র হচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (স্থান : টিচার্স ট্রেনিং কলেজ) কেন্দ্র, পুলিশ হাসপাতাল, আইডি হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএএইচ) কেন্দ্র।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. এফএমএ আঞ্জুমান আরা বেগম জানান, রাজশাহী মহানগরীতে গণটিকাদানের দুদিনে ৭৮ হাজার ৮৭৩ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল দ্বিতীয় দিনে ৪৪ হাজার ৪৮৮ জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। এর আগে প্রথম দিন মোট ৩৪ হাজার ৩৮৫ জনকে টিকা প্রদান করা হয়। টিকা না থাকায় ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাদান ক্যাম্পেইন আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দিনেও টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন অনেকে : টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে গণটিকা কার্যক্রমের দ্বিতীয় দিনেও করোনার টিকা নিতে এসে টিকাকেন্দ্র থেকেই লোকজন ফিরে গেছেন। চাহিদার তুলনায় কমসংখ্যক টিকা সরবরাহ থাকায় এ অবস্থা হয়েছে। যারা টিকা পেয়েছেন তারা জানান, সুশৃঙ্খল পরিবেশে টিকা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে উপজেলার চারটি কেন্দ্রে একযোগে গণটিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। সকাল থেকেই টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচেপড়া ভিড়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মাকসুদা খানম জানান, সদরের টিকাকেন্দ্রে লোকজনের ভিড় বেশি ছিল। যারা টিকা দিতে পারেননি, তাদের হতাশার কিছু নেই। পর্যায়ক্রমে সবাই টিকা দিতে পারবেন।
লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকাদান : ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড পর্যায়ে করোনার গণটিকাদান কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। দ্বিতীয় দিনে ওয়ার্ড পর্যায়ে দ্বিতীয় দিনে লক্ষ্যমাত্রার অধিক দেওয়া হয়েছে। ১৯ হাজার ৮০০ জনকে টিকা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০ হাজার ৩৫৭ জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে। এ নিয়ে দুদিনে সিটিতে ৩৭ হাজার ৪১০ জনকে টিকা প্রদান করা হয়েছে।
গতকাল টিকাদান কেন্দ্র পরিদর্শনকালে মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু বলেন, ‘ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচিকে সফল করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি ও সব ধরনের সমস্যা নিরসনে প্রতি কেন্দ্রে সমন্বয়ের জন্য কর্মকর্তা, আনসার ও পুলিশ নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’