কেন এই বিভ্রান্তি, কে দেবে মাশুল

বর্তমানে বাংলাদেশ করোনা সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দিন দিন করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা যে হারে বাড়ছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় বলা যাচ্ছে না। করোনাভাইরাস সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকেই সুষ্ঠু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, করোনা টেস্ট, কোয়ারেন্টাইন কার্যকর করা, কঠোর লকডাউন নিশ্চিত করা ও গার্মেন্টস কারখানা খোলা বা বন্ধ রাখা এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতাই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, সম্প্রতি কঠোর লকডাউন চলাকালীন দেশব্যাপী হঠাৎ রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা খুলে দেওয়ার প্রজ্ঞাপন জারি করা। এতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে সন্দেহ নেই। পোশাকশিল্পের মালিকরা ঈদের আগে থেকেই কলকারখানা লকডাউনের আওতামুক্ত রাখতে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করে আসছিলেন। সরকারও তাদের এ অনুরোধ অগ্রাহ্য করে আসছিল। ২৭ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল কারখানার মালিকদের সঙ্গে মিটিং শেষে সরকারের পক্ষে এমনই এক ঘোষণায় বলেন, ‘আমরা তাদের অনুরোধ গ্রহণ করতে পারছি না। ৫ আগস্ট পর্যন্ত পূর্বঘোষিত চলমান লকডাউনে শিল্পকারখানা বন্ধ থাকবে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, বিজিবি ও পুলিশ প্রধান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক মিটিংয়ে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয় এবং বর্তমান করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে কারখানার মালিকদের অনুরোধ নাকচ করে দেওয়া হয়। কিন্তু এরই মধ্যে এমন কী ঘটেছিল যে উল্লিখিত মিটিংয়ের সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি আমলা চ্যানেলের মাধ্যমে সবাইকে অবাক করে দিয়ে শিল্পকারখানা খোলার ব্যবস্থাও হয়ে গেল! সরকারের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের দোদুল্যতা ও বিভ্রান্তি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। কেন এই বিভ্রান্তি, এর মাশুলই বা দেবে কে?

অবস্থাগতিকে মনে হচ্ছে, সরকারের রাজনৈতিক নেতা যারা আছেন, তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর সঙ্গে আমলাদের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্তগুলো আসছে তার সঙ্গে কোনো যোগসূত্র নেই। সেখানে সম্ভবত বিরাট ফারাক রয়ে গেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত আমলানির্ভর হয়ে পড়ায় এ সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ কারণে একেক সময় একেক ধরনের সিদ্ধান্ত আসছে। এমন পরিবেশ দেশের গণতন্ত্র চর্চার পরিপন্থী। চেইন অব কমান্ড লংঘন করে কোনো কাজের তাৎক্ষণিক ফল পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু এটি সুদূরপ্রসারী ফলাফলের জন্য মোটেও ভালো নয়। তাতে প্রশাসনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়; ফলে পদ ও পদবি বিবেচনায় পারস্পরিক মান্যগণ্য থাকে না। জাতীয় সংসদের সর্বশেষ বাজেট অধিবেশনে রাজনীতির অনেক প্রবীণ নেতাকেই এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। কিন্তু এই ক্ষোভ প্রকাশেও যে কোনো ফল হয়নি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে তা আবারও বোঝা গেল।

পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ঈদের আগে ১৯ জুলাই, সরকারের ওপর মহল থেকেই নাকি বার্তা দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, করোনা সংক্রমণ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে ১ আগস্ট থেকে কারখানা খুলে দেওয়া হবে! সে অনুসারে বিজিএমইএর নেতারা ১ আগস্ট থেকে কারখানা খোলার প্রস্তুতি নিতে সদস্যদের বার্তা দিয়ে রাখেন। শেষ পর্যন্ত ১ আগস্ট থেকেই কারখানা খোলার প্রজ্ঞাপন জারি হলো। প্রশ্ন হচ্ছে, কারখানা খোলার ব্যাপারে সরকারের ওপর মহল থেকেই যদি আগাম বার্তা দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে এ বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের মিটিংয়ের প্রয়োজনই বা হলো কেন? বলা হচ্ছে, কারখানা খুলে দেওয়ার আগে সংক্রমণ পরিস্থিতি যাচাই করতেই এ মিটিং ডাকা হয়েছিল এবং সে মোতাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কারখানা বন্ধ রাখার উপরোক্ত ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণায় মালিকপক্ষ নিশ্চিতভাবেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সুতরাং তারাও বসে থাকেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণার একদিন বাদেই ২৯ জুলাই তড়িঘড়ি করে মালিকপক্ষ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফলে পরদিন সন্ধ্যার মধ্যেই সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জাস্টিফাই করার জন্য প্রথমে ‘আপাতত কারখানার আশপাশের শ্রমিকদের দিয়ে উৎপাদন চালানো হবে’ বলে পোশাকশিল্পের নেতারা নাকি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে শর্তেই কারখানা খোলার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনও একই কথা বলেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি তাই-ই হয়ে থাকে, তাহলে কারখানার মালিকরা ঢালাওভাবে সব শ্রমিককেই ১ আগস্টের মধ্যে কাজে যোগ দিতে খুদেবার্তা পাঠান কী করে? মালিকদের কেউ কেউ সেদিন যেন কোনো কর্মী অনুপস্থিত না থাকে, ফেইসবুকে এমন ঘোষণাই বা দেন কী করে? এর ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। এমন ঘোষণার পরই গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও চাকরি বাঁচাতে অসহায় পোশাক শ্রমিকদের শহরমুখী প্রবল স্রোত প্রত্যক্ষ করে দেশবাসী। ফলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়।

প্রশ্ন আরও আছে, মন্ত্রী মহোদয়রা মালিকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা বলেই কি নিজেদের দায় সারতে চাইছেন? নাকি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন? এ বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে এখনো কোনো বক্তব্য আমরা শুনতে পাইনি। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করতে গিয়ে আরও বলেছেন, ‘বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করেই সরকার সিদ্ধান্তে নেয়।’ প্রশ্ন হচ্ছে, তার কথা যদি সত্য বলে ধরে নিই, তাহলে করোনা মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ সংবাদ মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে, ‘সরকারের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে,’ একথা বলেন কী করে?

সরকার করোনা মোকাবিলা ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এ পরিস্থিতি শুধু বাংলাদেশের নয়; তামাম দুনিয়ার বর্তমান চিত্র একই। তবে অন্যান্য দেশে করোনা মোকাবিলায় কঠোর নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি যেমন গুরুত্ব দেয়; আমাদের দেশে তা উপেক্ষিত হতে দেখি। ফলে এই সংকটকালে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গিয়ে যে ঝুঁকি নেওয়া হচ্ছে তার চাপ, শেষ পর্যন্ত ওই গরিবের কাঁধে গিয়েই পড়ছে। দুর্মুখেরা বলছেন, মালিকের মুনাফা নিশ্চিত করার জন্যই শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতি যখন ঊর্ধ্বমুখী এবং সারা দেশে যখন লকডাউন চলছে, সেই সময়ে মালিকের স্বার্থে কোনো ধরনের পরিবহনের ব্যবস্থা ছাড়াই ২৪ ঘণ্টার নোটিসে কলকারখানা খুলে দিয়ে, নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে সম্পূর্ণ গণবিরোধী ও অমানবিক আচরণ করা হয়েছে।

গত ১৬ মাসে মালিকদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও করোনায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা রাষ্ট্র ও মালিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কোনো সহযোগিতা পায়নি। উল্টো রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার মালিকরা নিজেদের মুনাফা অর্জনের জন্য শ্রমিকদের যন্ত্রের মতো শ্রমদাস হিসেবে ব্যবহার করছে। অথচ করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দেখিয়ে এসব উদ্যোক্তা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনার নামে ইতিমধ্যেই বড় অংকের অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।

সরকার শুধু রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যাক টু ব্যাক এলসির আওতায় ঋণের জন্য ৫ হাজার কোটি ডলারের তহবিল করে দিয়েছে যার সুদের হার মাত্র পৌনে ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি অভিযোগ করেছে, কতিপয় উদ্যোক্তা প্রণোদনার অর্থ নিয়ে শিল্পের চলতি মূলধন হিসেবে ব্যবহার না করে গাড়ি বা জমি কিনেছেন, কেউ কেউ এই অর্থ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগও করেছেন। আবার বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নামেও প্রণোদনার ঋণ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক হিসাবে দেখা গেছে গত এক বছরে কোটিপতির সংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ১১ হাজার। এর মধ্যে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই বেড়েছে ৩৮২ জন।

অন্যদিকে, একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জরিপ বলছে, গেল বছরে নতুন করে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ গরিব থেকে আরও গরিব হয়েছে। যে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার নামে অসহায় মানুষের সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণ করা হলো, সেই জিডিপির সুফল সমাজের কয়েক হাজার শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আমলা ও চরিত্রস্খলিত রাজনৈতিক নেতারাই একতরফাভাবে নিজেরা দখল করে আছেন। এভাবেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সিংহভাগ ধনীদের হাতে গিয়ে জমা হলেও এই প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে দেশের সাধারণ মানুষ হচ্ছে বঞ্চিত। এ কারণেই আমরা দেখি, বিশ্বের অতিরিক্ত ধনাঢ্য ব্যক্তির বার্ষিক তালিকায় বাংলাদেশের নাম শীর্ষে চলে আসে।

গত এক বছর ধরে রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে সবধরনের লকডাউনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। এবার করোনার সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করায় সরকার এসব কলকারখানাকে লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধের আওতায় নিয়ে আসার শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু মালিকরা এতই প্রভাবশালী যে, শেষ পর্যন্ত সরকার তাদের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হলো। মালিকদের কাছে সরকারের অবস্থান যদি এই হয়, তাহলে পেটের দায়ে এ সমস্ত শ্রমিক তাদের কারখানা মালিকদের প্রতি কেমন বাধ্যগত হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়; শহরমুখী জনস্রোত তারই প্রমাণ দেয়। শিল্পকারখানার মালিকরা শ্রমিকের রক্ত ঘাম করা অক্লান্ত পরিশ্রমে উৎপাদিত পণ্য ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি করে আজ বিপুল বৈভবের মালিক। অথচ শ্রমিক ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে তারা যে কত উদাসীন সাম্প্রতিক এই ঘটনায়ই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। রক্ত ঘাম করা শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রমের মূল্য বুঝি তারা এভাবেই পরিশোধ করে! এ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ আমলের নীলকরদের একটি ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। আঠারো শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নীল কমিশনারকে নীল চাষে জর্জরিত চাষিদের করুণ কাহিনী বলতে গিয়ে ফরিদপুরের তৎকালীন ডেপুটি কালেক্টর মি. ডেলাতুর বলেছিলেন, ‘এমন একটা নীলের বাক্সও ইংল্যান্ডে পৌঁছায় না যেটা মানুষের রক্তে রঞ্জিত নয়।’

আমাদের প্রত্যাশা, করোনার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার নামে শুধু অর্থ উপার্জনই যেন শিল্পমালিক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের লক্ষ্য না হয়। অর্থ উপার্জনের সঙ্গে সঙ্গে এসব অসহায় ও পরিশ্রমী মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণের কথা ভেবে শিল্পকারখানার মালিকরা যেন আরও বেশি মানবিক হন।

লেখক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা