আলোচিত চলচ্চিত্র নায়িকা পরীমণি এবং মডেল পরিচয়ধারী ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা ও মরিয়ম আক্তার মৌসহ তাদের চক্রের অন্য সদস্যদের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল এমন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি গ্রুপ চাঁদাবাজি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশ জুড়ে আলোচনায় থাকা এসব নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিষ্ঠিত কয়েকজন ব্যক্তির কাছ থেকে ইতিমধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্যও মিলেছে।
পরীমণি, পিয়াসা ও মৌ এবং তাদের সরবরাহ করা নারীসঙ্গীদের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটানো ওইসব প্রভাবশালীর তালিকা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হয়। আর এ নিয়ে দেশ জুড়ে আলোচনার সুযোগ নিয়ে চাঁদাবাজরা ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওইসব প্রভাবশালীর কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে পরীমণি, পিয়াসা ও মৌর বাসায় যাতায়াত ছিল এমন ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিদের কোনো তালিকা করা হচ্ছে না বলে গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) শফিকুল ইসলাম।
জানা গেছে, পরীমণি ও পিয়াসা সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রেপ্তারের পর একটি গ্রুপ যেন শুরু করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের পাল্লাপাল্লি। নিজেদের স্বার্থ হাসিলে কাউকে পরীমণি সিন্ডিকেটের গডফাদার, কাউকে প্লেজার ট্যুরের সঙ্গী কিংবা কোটি টাকার উপহারদাতা বা ওইসব চক্রের ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হিসেবে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লাগে তারা। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামও এ নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনার রাজধানীতে তার কার্যালয়ে বসে সাংবাদিকদের বলেন, পরীমণি, ফারিয়া মাহবুব ও মরিয়মের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে একটি গ্রুপ চাঁদাবাজি করছে বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। তাদের কবল থেকে রক্ষা পেতে দুই-তিনজন ব্যবসায়ী ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ভুক্তভোগীরা এসব চাঁদাবাজের বিষয়ে তথ্য দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ। তিনি চাঁদাবাজদের কল রেকর্ড করতে ভুক্তভোগীদের পরামর্শ দেন। এসব কল রেকর্ড পরে পুলিশের কাছে জমা দিতে বলেন। পাশাপাশি এ চাঁদাবাজদের বিষয়ে স্থানীয় থানা বা ডিএমপিকে তথ্য জানাতে অনুরোধ করেন।
শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তিনজন ব্যবসায়ী এমন চাঁদাবাজদের হাত থেকে রক্ষা পেতে ডিএমপির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। লোকলজ্জার ভয়ে গুলশানের আতঙ্কিত একজন ব্যবসায়ী ডিএমপি কমিশনারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকা তো বেআইনি নয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত এ বিষয়ে মামলা না হয়।’
পরীমণির ইয়াবা আসক্তির তথ্য জানালেন তদন্ত কর্মকর্তারা : বাংলা সিনেমার হালের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা পরীমণি মরণঘাতী নেশা ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ইয়াবাসহ পরীমণির কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ করিম জিমি গ্রেপ্তারের পরই এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন তারা। তাছাড়া পিয়াসাও ইয়াবায় আসক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে এমনই তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের। গ্রেপ্তারের সময় পিয়াসার মুখের মাস্কটির দাম ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা। তার হাতের রোলেক্স ঘড়ির মূল্য ৫০ লাখ টাকা। গতকালও পরীমণি, পিয়াসা, রাজসহ অন্যদের কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। প্রতিদিনই তারা নতুন নতুন তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন বলে পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী মাদক ব্যবসা করে কোনো ব্যক্তি যদি অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন, তাহলে তার ব্যাংক হিসাব, আয়কর বিবরণী, সম্পদের কর সম্পর্কিত যাবতীয় রেকর্ডপত্র যাচাই-বাছাই ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ব্যবস্থা নিতে পারবেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। আমরা সে পথেই হাঁটছি। রাজ মাদকের সাপ্লায়ার সে ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণ আমরা পেয়েছি। সংগত কারণে তার ব্যাংক হিসাব, আয়কর বিবরণী, সম্পদের কর-সম্পর্কিত যাবতীয় রেকর্ডপত্র যাচাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেওয়া হবে।’
তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাজধানীর কড়াইল এলাকা থেকে তারা ইয়াবা সংগ্রহ করতেন। ২০২০ সালে তারা প্রথম শখের বসে ইয়াবা সেবন শুরু করেন। পরে তার মাত্রা বেড়ে যায়। জিমির কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ২২৫ পিস ইয়াবাও পরীর জন্য সংগ্রহে রাখা হয়েছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জিমি দাবি করেছেন। জিমির বাসায়ই পরী ইয়াবা সেবন করতেন বলে দাবি করেছেন। তবে জিমির এমন বক্তব্যে আমলে নেয়নি গোয়েন্দারা। পরীর বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধারের পর এমনটিই ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি তার বাসা থেকে ইয়াবা সেবনের কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। তবে জিমির বাসা থেকে আলামত পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘রবিবার রাতে জিমির মামলা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়েছে। তার কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি কড়াইল এলাকা থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করতেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। এর আগেও তার নামে ২০১৬ সালে মাদক আইনে মামলা রয়েছে। ইয়াবার উৎস ও ব্যবহারকারীদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পরীমণি ও পিয়াসা ইয়াবা সেবন করতেন। তারাও তথ্য জানিয়ে বলেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে গেলে ইয়াবার পাশাপাশি অন্যান্য মাদকও সেবন করতে হতো।’
গুলশান এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পিয়াসাকে আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। গ্রেপ্তারের সময় তার মুখের মাস্কটির দামই ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকা। রোলেক্স ঘড়ির দাম ৫০ লাখ টাকা। জামা-কাপড়ের মধ্যে প্রতি পিসের দাম ২ থেকে ৩ লাখ টাকা।’
ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, পিয়াসার অন্যতম সহযোগী মিশু। আর পরীমণির বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন জুনায়েদ করিম জিমি। সার্বক্ষণিক তার সঙ্গেই চলাফেরা করতেন। এমনকি বিভিন্ন ক্লাব ও বারে তারা একসঙ্গেই আসা-যাওয়া করতেন। এ ধরনের একাধিক ফুটেজ এখন গোয়েন্দাদের হাতে। এ কারণে পরীমণির নামে করা মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছেন জিমি।
গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ২০১৬ সাল থেকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন পরীমণি। ওই সময় তিনি প্রযোজক রাজের সঙ্গে নিয়মিত মদপান করতেন। এরপর তার সঙ্গে পরিচয় হয় জিমির। পরে তারা বিভিন্ন সময় রাতে-দিনে ঘোরাফেরা শুরু করেন। একপর্যায়ে জিমির প্ররোচনায় ২০২০ সালে ইয়াবা সেবন শুরু করেন পরীমণি। প্রথম অবস্থায় অস্বস্তি দেখা দেওয়ায় বন্ধ করে দেন। এরপর রাত জেগে থাকার কারণে আবারও ইয়াবা সেবন শুরু করেন।
মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, ‘আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারা এ বিতর্কিতদের অর্থ দিয়ে সহায়তা করতেন সে বিষয়ে একটা ধারণা পাওয়া গেছে। কিসের বিনিময়ে তারা এসব অর্থ তাদের দিয়েছেন এসব তদন্ত করে দেখা গেছে।’
তিনি আরও বলেন, “রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ দিয়েছেন আসামিরা। সেসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আমরা তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পেশার অনেকের নাম পেয়েছি। কেউ শত্রুতাবশতও দিতে পারে। সিআইডি এগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করবে। কোনো নিরীহ মানুষ যেন দোষী না হয় সিআইডি এটা দেখছে। রাজের বাসা থেকে আমরা শনিবার দুটি গাড়ি জব্দ করেছি। গাড়ি দুটি কীভাবে কেনা, গাড়ি দুটি কার নামে কেনা, কোথা থেকে, কবে কেনা সেটা আমরা খতিয়ে দেখছি। এই গাড়ি কেনার অর্থ কীভাবে পেয়েছেন সেটাও আমরা খতিয়ে দেখব।’
রাজ পরীমণির বাসায় মদের সাপ্লায়ার ছিলেন জানিয়ে এই সিআইডি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এছাড়া কথিত মডেলদের দিয়ে বিভিন্ন পার্টি এবং ইনডোর প্রোগ্রামের আড়ালে বিশিষ্টজন-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তা আপাতত প্রকাশ করা হচ্ছে না।’
তদন্তেসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পরীমণি, পিয়াসা, মৌ, রাজসহ ১০-১২ জনের একটি সিন্ডিকেট অভিজাত এলাকায় নিয়মিত আসর বসাত। আসরগুলোতে মদপান, ডিজে পার্টিসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলত। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, মোবাইল ফোন, কললিস্ট, মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাপস থেকে সিন্ডিকেটভুক্তদের আসরে যাতায়াত করা শতাধিক ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। প্রাপ্ত নামের অনেকগুলোই ছদ্মনাম বা সাংকেতিক নাম। সিআইডি তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় প্রকৃত নাম, ঠিকানা, পেশা, আয়ের উৎস ইত্যাদি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে। রাজ জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, এ জাতীয় অবৈধ কাজ থেকে অর্জিত অর্থ নামে-বেনামে বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ (আমদানি, ড্রেজার বালু ভরাট, ঠিকাদারি ও শোবিজ জগৎ) করতেন। এসব ব্যবসায় বেশ কয়েকজন অবৈধ অর্থের জোগানদাতার সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। গ্রেপ্তার প্রত্যেকের ব্যবসায়িক কাঠামোতে অস্বচ্ছতা রয়েছে।
৭ জনের ১০ মামলার তদন্তভার চায় র্যাব : র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গতকাল সোমবার বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীর, চিত্রনায়িকা পরীমণি, মডেল পিয়াসা, নজরুল ইসলাম রাজসহ সাত আসামিকে সম্প্রতি গ্রেপ্তারের পর মামলা করেছে র্যাব। ওই মামলাগুলোর তদন্তভার র্যাবকে দেওয়ার অনুমতি চেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে গত রবিবার একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগেও র্যাব অভিযান চালিয়ে যেসব আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল, গুরুত্ব বিবেচনায় কোনো কোনো মামলার তদন্তভার দেওয়ার অনুমতি চেয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। থানা পুলিশ থেকে প্রথমে মামলাগুলোর তদন্তভার পেয়েছিল গোয়েন্দা পুলিশ। পরে পুলিশ সদর দপ্তর এসব মামলার তদন্ত করার জন্য পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) দায়িত্ব দেয়।
পরীমণি-পিয়াসাকা-ে কাউকে হয়রানি করা হবে না : পরীমণি ও পিয়াসার সঙ্গে সম্পর্ক থাকা অনেকের নামের তালিকা পাওয়ার খবর ছড়ালেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে হয়রানি করা হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কারও নাম বললেই কি হবে নাকি? যাচাই-বাছাই রয়েছে না। আপনারা (সাংবাদিক) ভালো করে প্রচার করেন যে, কাউকে হয়রানি করা হবে না।’