করোনা মহামারীকালে কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রম, সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও সহায়তার ফলে এবারের বোরো মৌসুমে গত বারের চেয়ে প্রায় ৫ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। এখন সারা দেশে চলছে আউশ ধান কাটা-মাড়াই। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আউশের ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছে। শস্য কর্তনকালে দেশের অনেক স্থানে আউশের উচ্চফলনশীল জাত ব্রি-ধান ৪৮-এর বিঘাপ্রতি ফলন পাওয়া গেছে ১৭ থেকে ১৮ মণ। পাকিস্তান আমলে বিঘাপ্রতি আউশের ফলন ছিল ৩ থেকে ৪ মণ। উচ্চ ফলনশীল নতুন জাতের উদ্ভাবন, হাইব্রিড জাতের চাষ বৃদ্ধি এবং সময়মতো আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে প্রতি বছরই বাড়ছে চালের উৎপাদন। ২০০৯ সাল থেকে গড়ে ৬ লাখ টন হারে চালের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। চালের উৎপাদন ইতিমধ্যে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশ ইন্দোনেশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বে তৃতীয় শীর্ষ চাল উৎপাদনকারী দেশের গৌরব অর্জন করেছে। চাল ছাড়াও দেশে ১২ লাখ টন গম ও ৫৪ লাখ টন ভুট্টা উৎপাদিত হয়েছে। তারপরও প্রতি বছর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কেন চালের দাম? তা মোটেও বোধগম্য নয়। তা হলে কি মাঠের সঙ্গে পরিসংখ্যানের গরমিল আছে? না এটা চাল সিন্ডিকেটের কারসাজি এমন প্রশ্ন সচেতন মানুষকে বিচলিত করে তুলছে।
লকডাউনের কারণে এমনিতেই মানুষের আয়-উপার্জন কমে গেছে। কাজ হারিয়ে অসংখ্য মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এরই মধ্যে চালের দামসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি ও আটার মূল্যবৃদ্ধি স্বল্প আয়ের মানুষকে একবারে দিশেহারা করে তুলছে। উল্লেখ্য, করোনা মহামারীর কারণে শতকরা ৮০ ভাগ ব্যবসায়ী পুঁজি ভেঙে খাচ্ছেন। সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন ৬০ শতাংশ মানুষ। চরম দুর্দিন যাচ্ছে ৮৬ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীর। কর্ম হারিয়ে বেকার হয়েছেন ২৬ লাখ মানুষ। কভিডের কারণে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। সিডিপির গবেষণা প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, করোনার কারণে ৬২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আয় কমে যাওয়ায় ৫২ শতাংশ মানুষ খাওয়া খরচ কমিয়ে দিয়েছেন।
গত বছরের একই সময়ের চেয়ে এবার চালের দাম বেড়েছে ১২ শতাংশ। গত জুন মাস থেকে অদ্যাবধি চালের দাম প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের চাহিদা মোটা চালের। অটো মিল মালিকরা গরিবের সেই মোটা চালকে চিকন চালে রূপান্তর করে নাম দিচ্ছে মিনিকেট, যদিও মিনিকেট নামে বাংলাদেশে কোনো ধানের অস্তিত্ব নেই। এখন স্বর্ণা, গুটি স্বর্ণার মতো মোটা চাল খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫১ টাকা কেজিতে, যা এক মাস আগেও বিক্রি হয়েছে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। গত বছর বোরো মৌসুমের এ সময়ে মোটা চাল বিক্রি হয়েছিল প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৪৪ টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বৃদ্ধি পেল কেজিপ্রতি ৭ থেকে ১০ টাকা। শুধু মোটা চাল নয়; মাঝারি ও সরু চালের দামও বেড়েছে। সরু চালের মধ্যে মিনিকেট ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা, নাজিরশাইল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে সরু চাল মিনিকেটের দাম ছিল ৫৬ থেকে ৬০ এবং নাজিরশাইল ৬২ থেকে ৬৫ টাকা। এ ছাড়া মাঝারি চাল বিআর ২৮ ও বিআর ২৯ বিক্রি হচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৬ টাকা, যা আগে ছিল ৪৮ থেকে ৫০ টাকা। ফলে চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকার।
সংকট কাটাতে বেসরকারিভাবে ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্কে ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশে রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদন হওয়া সত্ত্বেও চালের দাম না কমায় অস্তিত্ব প্রকাশ করেছেন মন্ত্রী-সচিবসহ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কারও কারও মতে, লকডাউনের কারণে পরিবহন খরচ বৃদ্ধির ফলে চালের দামের এ বৃদ্ধি ঘটেছে। আবার কেউ কেউ বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে মৌসুমি চাল ব্যবসায়ীরা মজুদ গড়ে তুলেছেন। দাম বাড়ার এটিও একটি বড় কারণ। সরকার চাল আমদানি করে বাজারে ছেড়ে দিলেই দাম কমে আসবে। মিল মালিকদের কথা এবার বোরো মৌসুমের শুরু থেকেই বাজারে ধানের দাম ছিল সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি।
সম্প্রতি ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে প্রতি মণ মাঝারি সরু বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে ১১৪০ থেকে ১১৫০ টাকা মণ দরে, যা এক মাস আগেও বিক্রি হয়েছে ১২০০ টাকা দরে। খাদ্যমন্ত্রীর কথায় পর্যাপ্ত উৎপাদনের পরও চালের দাম ঊর্ধ্বগতি। অবৈধভাবে ব্যবসা করেন এমন মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে ধান মজুদ আছে। যদি বেসরকারিভাবে নন-বাসমতি সেদ্ধ সরু চাল আমদানি করা হয়, তাহলে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বোরো মৌসুমে ছয় লাখ ৫০ হাজার টন ধান, ১০ লাখ টন সেদ্ধ চাল এবং এক লাখ টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ৪০ শতাংশ ধান ও ৫৭ শতাংশ চাল সংগ্রহ হয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি গুদামে কমপক্ষে ১০ লাখ টন চাল মজুদ রাখতে হয়। এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহের মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ টন আর আমদানির মাধ্যমে ৫ লাখ টন সংগ্রহ হবে, যা বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। চলতি মাসে গড়ে ১০% বেড়েছে চালের দাম। মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে কী পরিমাণ মজুদ আছে তা পর্যবেক্ষণের জন্য সব জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। অবৈধ মজুদ থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সব জেলায় চিঠি পাঠিয়েছে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম ৪ শতাংশ এবং সরু ও মাঝারি চাল প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। তবে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে সরু ও মাঝারি চাল ১২ শতাংশ ও মোটা চাল ১৩ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অপর দিকে বিশ্ববাজারে চালের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ২ থেকে ৫ শতাংশ কমেছে। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন চাল ৩৬৩ থেকে ৪১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। সে হিসেবে প্রতি কেজি চালের দাম পড়েছে ৩০ থেকে ৩৪ টাকা। এ চাল দেশে আনার পর প্রতি কেজির দাম পড়বে ৩৩ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৪০ টাকা। অথচ দেশের বাজারে মোটা চালের দাম বিশ্ববাজার থেকে ১০ টাকা বেশি।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে চালে চাহিদা মিটিয়ে আরও ৩০ লাখ টন উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতে, এবার বোরো মৌসুমে চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই কোটি পাঁচ লাখ ৮১ হাজার ৩০০ টন। আর উৎপাদন হয়েছে দুই কোটি আট লাখ ৮৫ হাজার ২৬২ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে তিন লাখ তিন হাজার ৯৬২ টন বেশি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য মোতাবেক ৩০ জুলাই পর্যন্ত সরকারি গুদামে চাল মজুদ ছিল ১১ লাখ ৯৫ হাজার টন। বাম্পার ফলনেও খাদ্য মজুদ ও সংগ্রহ কম থাকায় এবার সরকার আমদানি বাড়াচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কথা- সরকার যদি গুদামে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল সংগ্রহ করতে পারে, তাহলে মিলার বা কিংবা মজুদদার চক্র তৎপরতা দেখাতে পারবে না। সরকার বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করে মজুদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। এতে ওই চক্র বাজার ব্যবস্থায় তেমন প্রভাব খাটাতে পারবে না।
এ বছর ১ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর বেশি জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এ ছাড়া গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের আবাদ বেড়েছে। হাইব্রিড ধানের গড় ফলন ইনব্রিড ধানের চেয়ে এক থেকে দেড় টন বেশি। হাইব্রিড ধানের আবাদ বৃদ্ধির জন্য ১৪ লাখ ৯৬ হাজার ৯৭০ জন কৃষককে দুই লাখ হেক্টর জমি আবাদে ৭৬ কোটি টাকার হাইব্রিড বীজ বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। গত বছর দেশে বোরো ধানের গড় ফলন ছিল হেক্টরে ৩ দশমিক ৯৭ টন। এ বছর গড় ফল পাওয়া গেছে ৪ দশমিক ১৭ মেট্রিক টন। সে হিসেবে গড় ফলন বেড়েছে শূন্য দশমিক ২০ টন (৫ দশমিক ৪ শতাংশ)। এ বছর ১৩ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ করে ৩৪ লাখ ৮৫ হাজার টন চাল উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, শস্য কর্তনের ফলাফল বলছে তার চেয়েও বেশি পরিমাণ চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে স্বল্পকালীন আউশ মৌসুমে।
এসব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলা যায়, দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। এক শ্রেণির মিল মালিক ও চাল ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটির দাম তাদের খেয়াল-খুশি মতো বৃদ্ধি করে স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুষদের মহাবিপদে ফেলেছেন। এটা কারসাজি ছাড়া কিছু নয়। করোনা মহামারীর মতো বৈশ্বিক বিপদও তাদের এই অশুভ তৎপরতা থেকে বিরত রাখতে পারছে না। এদের কাছে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মানবতা।
আমরা জানি, উৎপাদিত চালের মাত্র শতকরা ৫ থেকে ৬ ভাগের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সরকার। বাকি ৯৫ থেকে ৯৬ ভাগের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে বেসরকারি মিলমালিক, মজুদদার ও বড় ব্যবসায়ীরা। তাই নিয়মিত চালের বাজার মূল্যায়ন করে অবৈধ মজুদদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, চুক্তিভঙ্গকারী মিলমালিকদের লাইসেন্স বাতিল, কালো তালিকাভুক্তি এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নসহ দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। এ ছাড়া চাল নিয়ে এই অপতৎপরতা, মানুষকে বিপদে ফেলার কারসাজি কখনো বন্ধ হবে না।
লেখক বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক
netairoy18@yahoo.com