জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতায় বন্ধ হয়ে আছে পাবনার নগরবাড়িতে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক নৌবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। চলতি বছর জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ।
এদিকে, ভূমিদাতারা জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়ায় আন্দোলনে নেমেছেন। ফলে প্রকল্পের কাজ বন্ধ থাকায় বর্ধিত মেয়াদেও এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে নৌপথে পণ্য পরিবহন সুবিধা বাড়াতে পাবনার নগরবাড়িতে আধুনিক নদীবন্দর নির্মাণে ২০১৮ সালে ৫১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে যমুনা নদীর পাড়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে সরকার। ‘নগরবাড়িতে আধুনিক সুবিধাদিসহ নদীবন্দর নির্মাণ’ শিরোনামে তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছর জুনে শেষ হয়েছে। কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। আগের বাজেটের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।
এদিকে, জমিদাতাদের আন্দোলেনে কাজের অগ্রগতি থমকে গেছে। গত তিন বছরে ক্ষতিপূরণের একটি টাকাও পাননি বলে অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নেমেছেন তারা। ফলে প্রকল্পের সব ধরনের কাজ গত কয়েক মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।
তারা জানান, প্রকল্পের জন্য নগরবাড়িতে যমুনা নদীর পাড়ে মোট ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হলেও তা ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হচ্ছে না। তাদের অভিযোগ, প্রকল্পের লোকজন জোরপূর্বক জমি দখলে নিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই ক্ষতিপূরণের দাবিতে আন্দোলনে নামতে হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিক ও পুরান ভারেঙ্গা ইউপির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিকউল্লাহ বলেন, অধিগ্রহণ করা মোট ৩৬ একরের মধ্যে ২৮ একর জমিই ৬০ থেকে ৭০ জনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তারা কেউ ক্ষতিপূরণ পাননি।
নগরবাড়ির রঘুনাথপুরের বাসিন্দা আমির হোসেন, মোহাম্মদ রওশন, দেলোয়ার হোসেন, শাহীন শাহ, আব্দুল কুদ্দুসসহ বেশ কয়েকজন জমির মালিক বলেন, ক্ষতিপূরণের টাকা না দিয়ে জমি দখলে নিয়ে নেওয়ায় আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই সব জমির মালিক ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দিয়েছি। ক্ষতিপূরণ না পেলে প্রাণ গেলেও কাজ করতে দেওয়া হবে না।
তবে, বিআইডব্লিউটিএর নতুন বন্দর নির্মাণ প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী নিজাম উদ্দিন পাঠান বলেন, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে পাবনা জেলা প্রশাসনের কাছে ভূমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৯০ কোটি টাকা হস্তান্তর করেছে। বিআইডব্লিউটিএর ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানের এখতিয়ার নেই। নিয়ম অনুযায়ী জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
কাজ বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে কাজ স্থগিত ছিল। শিগগিরই কাজ শুরু হবে এবং নির্ধারিত নতুন সময়সীমার মধ্যেই কাজ শেষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন তারা।
পাবনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আফরোজা আক্তার বলেন, পাবনা আদালতে বরিশালের বাকেরগঞ্জের থানাপাড়া গ্রামের মরহুম মহিম চৌধুরীর ছেলে পরিচয়ে তারেক চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি অধিগ্রহণকৃত পুরো জমির মালিকানা দাবি করে মামলা দায়ের করায় ক্ষতিপূরণ প্রদান স্থগিত রয়েছে। মামলায় তারেক চৌধুরী দাবি করেছেন, তার পূর্বপূরুষ রঘুনাথপুর গ্রামে বসবাস করত এবং নির্মাণাধীন নতুন বন্দর যে জমিতে তৈরি হচ্ছে তা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন। কেবল আদালতের আদেশ পেলেই ক্ষতিপূরণ দেওয়া সম্ভব।
তবে, ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ রফিকউল্লাহ বলেন, ‘রঘুনাথপুর গ্রামের বাসিন্দারা তারেক চৌধুরী কিংবা তার পূর্বপূরুষের কাউকেই চিনতে পারেনি। জমি অধিগ্রহণের অর্থ বরাদ্দের আগে তারা কখনো এসব ভূমির মালিকানাও দাবি করেননি। এ সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য আদালতে জমা দিয়েছি।’
নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রকৃত মালিকরা অবশ্যই ক্ষতিপূরণ পাবেন। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।