পদ্মা সেতুর ১০ নম্বর পিলারে ধাক্কা

ফেরির মাস্টার-সুকানি বরখাস্ত সেতুর নিচে ভারী যান বন্ধ

পদ্মা সেতুর পিলারে ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’-এর ধাক্কার ঘটনায় জলযানটির মাস্টার মো. দেলোয়ারুল ইসলাম এবং সুকানি মো. আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) কর্র্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সংস্থাটি। গতকাল মঙ্গলবার বিআইডব্লিউটিসির চিফ পারসোনাল ম্যানেজার মানসুরা আহমেদ স্বাক্ষরিত আলাদা দুটি চিঠিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এছাড়া সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কার ঘটনায় মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে পদ্মা সেতু কর্র্তৃপক্ষ।

এদিকে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে তিনটি পিলারে ফেরির ধাক্কার ঘটনার পর পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে আপাতত ভারী যানবাহন নিয়ে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। সর্বশেষ দুর্ঘটনার এক দিন পর গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ নির্দেশ দেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এরপর গতকাল রাতে ঢাকার অফিসার্স ক্লাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বিআইডব্লিউটিসির কর্মকর্তাদের বৈঠক হয়। বৈঠকের পর বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তাজুল ইসলাম জানান, যত দিন নদীতে তীব্র স্রোত থাকবে, তত দিন ফেরিতে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ভারী যানবাহন তোলা যাবে। বাকিটা হালকা যানবাহন থাকবে। এতে ফেরি হালকা থাকবে। এ ছাড়া সতর্কতা হিসেবে পদ্মা সেতুর পিলারে রাবারের আস্তর দেওয়া যায় কি না, সেই বিষয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।

ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর’র মাস্টার ও সুকানিকে সাময়িক বরখাস্তের চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারপ্রাপ্ত মাস্টার অফিসার ও হুইল সুকানি দক্ষতার সঙ্গে ফেরিটি পরিচালনা করলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। দায়িত্বপূর্ণ কর্মচারী হিসেবে ফেরিটি অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে পরিচালনা করা তাদের উচিত ছিল। পদ্মা সেতুর নিচে এ ধরনের দুর্ঘটনা কোনোমতেই কাম্য নয়। তাদের এ ধরনের কার্যকলাপ কর্মচারী চাকরি নিয়ম শৃঙ্খলার পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ধরনের কার্যকলাপ অদক্ষতার পরিচয় বহন করে।

বিআইডব্লিউটিসির আরেক চিঠিতে সেতুর পিলারে ফেরির ধাক্কার ঘটনা তদন্তে সংস্থাটির পরিচালক (কারিগরি) মো. রাশেদুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বিআইডব্লিউটিসির জিএম (মেরিন) ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ হাসেমুর রহমান চৌধুরী, পরিচালক (নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালনা) মো. শাহজাহান এবং মাওয়ার এজিএম (প্রকৌশলী) মো. রুবেলুজ্জামান ও এজিএম (মেরিন) আহমেদ আলী। সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের শনাক্ত ও দায়-দায়িত্ব নিরূপণসহ সুপারিশ সহকারে আগামী তিন দিনের মধ্যে বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে এ কমিটিকে।

এদিকে গত সোমবার সন্ধ্যায় সেতুর ১০ নম্বর পিলারে ফেরির ধাক্কার ঘটনার পর ওইদিনই রাত ১১টার দিকে পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থানায় একটি জিডি করেছেন। এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) সুমন দেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করবে মাওয়া নৌপুলিশ।’

ভারী যানবাহন নিয়ে ফেরি চলাচল বন্ধের নির্দেশ : পদ্মা নদীতে স্রোতের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া-মাদারীপুরের বাংলাবাজার নৌরুটে চলাচলকারী ফেরিতে ভারী যানবাহন (যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী) পরিবহন বন্ধ থাকবে। শুধু ছোট হালকা যানবাহন (প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স ও মাইক্রোবাস) ফেরিতে পরিবহন করা হবে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে ভারী যানবাহন (যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী) মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া-রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া এবং চাঁদপুরের হরিণা ও শরীয়তপুরের আলুবাজার নৌরুটের ফেরিতে পারাপার করা হবে। গতকাল থেকেই এ নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছে। গতকাল নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বিআইডব্লিউটিসি এবং বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তদন্ত কমিটির সুপারিশ নিয়ে আলোচনা শেষে এসব তথ্য জানান। বৈঠকে অন্যদের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিসি চেয়ারম্যান সৈয়দ মো. তাজুল ইসলাম এবং বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক উপস্থিত ছিলেন।

খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘পদ্মা সেতু আমাদের মর্যাদার স্থাপনা, আত্মসম্মানের অনুভূতি। এ সেতুর পিলারের সঙ্গে ফেরির সংঘর্ষের ঘটনায় আমরা বিব্রত ও দুঃখিত। এটি আমাদের জন্য উৎকণ্ঠার বিষয়। পদ্মা সেতুতে আঘাত মানে আমাদের হৃদয়ের মধ্যে আঘাত। বারবার হৃদয় ক্ষত হোক, সেটা চাই না। পদ্মা সেতু আমাদের চ্যালেঞ্জ, মানমর্যাদার স্থাপনা।’

গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে পদ্মা সেতুর ১০ নম্বর পিলারে ধাক্কা দেয় রো রো ফেরি বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর। বাংলাবাজার ঘাট থেকে ফেরিটি শিমুলিয়া ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। পথে সেতুর পিলারের সঙ্গে ফেরিটির ধাক্কা লাগে। এতে কয়েকজন যাত্রী আহত হন। তাছাড়া ফেরিতে থাকা পণ্যবোঝাই একটি ট্রাক পাশের প্রাইভেট কারের ওপর পড়লে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগে গত ২৩ জুলাই সকালে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর ১৭ নম্বর পিলারের সঙ্গে ‘শাহ জালাল’ নামে একটি রো রো ফেরির ধাক্কা লাগে। এরপর জানা যায় গত ২০ জুলাই সেতুর ১৬ নম্বর পিলারে ধাক্কা দিয়েছিল আরেকটি ফেরি।