বর্তমানে করোনার প্রকোপ প্রবলভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যেকটা দিন এখন অনিশ্চয়তায় আর সংশয়ে কাটছে। মানবজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন মহামারী সময়ে অটিস্টিক শিশুরা নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে এবং তাদের অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেক অভিভাবক বুঝতে পারছেন না এই সময়ে তাদের সন্তানের জন্য কী করণীয়।
গত ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে কভিড-১৯ এর কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। হঠাৎ করেই স্কুল, শিক্ষক, সহপাঠী ও বন্ধুবান্ধব তথা স্কুলের পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ফলে তাদের এখন সবকিছু মানিয়ে নিতে যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনই অনেকের মধ্যেই তীব্র অস্থিরতা, চঞ্চলতা এবং খিটখিটে মেজাজ, রাগান্বিত আচরণ প্রকাশ পাচ্ছে।
করোনার আগে অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের যে অগ্রগতি হয়েছিল তা করোনাকালীন সময়ে ব্যাহত হয়েছে,যেহেতু এই শিক্ষার্থীদের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। সুতরাং শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের জন্য এটা একটা নতুন চ্যালেঞ্জ। তাই অভিভাবকদের উচিত তাদেরকে নিয়মিত অনুশীলনের মধ্যে রাখা। অভিভাবকদের এবং শিক্ষকদের উচিত একটি নমনীয় রুটিন তৈরি করা। সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা তাদের কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করতে হবে এবং তাদের প্রতিটি কাজ শেষে প্রশংসা করতে হবে।
করোনাকালীন সময়ে বর্তমানে অনলাইনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক অটিস্টিক শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করতে চায় না যা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিছু স্কুল সপ্তাহে ২-৩ দিন ক্লাস নিচ্ছে। কিছু শিশু অনলাইন ক্লাসে উপস্থিত হতে পেরে খুশি। কিন্তু বেশির ভাগ অটিস্টিক শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিছু বাবা-মা অনলাইনে বিশেষজ্ঞ নন এবং অনেক অভিভাবক আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। আবার কেউ কেউ ইন্টারনেটের ধীরগতির জন্য সংযুক্ত হতে পারেন না। তাই অভিভাবকদের এবং বিশেষ শিক্ষকদের উচিত একে অন্যের সঙ্গে সংযুক্ত থাকা এবং সেই পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পরিচালিত করা।
যেহেতু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন, তাই অভিভাবকদের উচিত মাঝে মাঝে ভিডিও কলে শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-পরিজনদের সঙ্গে কথা বলানো। এতে করে অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের সামাজিক আচরণ উন্নয়ন হবে। উন্নত দেশগুলো অটিস্টিক শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করে থাকে। যেমন- টেলিসেবা, ভিডিওতে কাউন্সেলিং করানো বা থেরাপিস্টরা বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে স্বাভাবিক সময়ে এই বিষয়টি তেমন পরিলক্ষিত হয় না। কিছু অভিভাবক এই সেবা গ্রহণ করলেও করোনাকালীন সময়ে এই সেবা অনেকেই নিতে পারছেন না। ফলে অটিস্টিক শিশুদের নানা ধরনের জড়তা, সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সুতরাং অভিভাবকদের উচিত হবে স্পিচ থেরাপিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট বা চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। সেই অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করাতে হবে। পরিবারের সদস্যের উচিত অটিস্টিক শিশুর সঙ্গে গুণগত সময় কাটানো। তাকে নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা। যেমন- ছবি আঁকা, গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয় শেখানো, বাগান করতে শেখানো, ছোট ছোট গৃহস্থালির কাজ শেখানো। এতে করে সে নতুনত্বের স্বাদ পাবে। প্রতিটি কাজের পর তাকে প্রশংসা করতে হবে এবং অবশ্যই তার প্রতিটি কাজকেই গুরুত্ব দিতে হবে যাতে করে তারা কাজ করতে আগ্রহী হয়। অনেকের মোবাইলের প্রতি তীব্র আসক্তি থাকে। সুতরাং মোবাইলের প্রতি আসক্তি যেন না বাড়ে, সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে।
এ ধরনের বিশেষ চাহিদার শিশুদের জন্য এমন কিছু খেলার আয়োজন করা, যাতে তাদের মোটর স্কিল বিকশিত হয়। খেলার সরঞ্জামসমূহ সতর্কভাবে বেছে নিতে হবে। খেলতে খেলতেই বিকাশ পাবে কাজ করার ক্ষমতা, বুদ্ধি, মেধা এবং মোটর স্কিলের ( Fine and Gross motor)। এই সময় অনেকের হাইপার অ্যাক্টিভিটি, ক্ষুধামন্দা বেড়ে গেছে। তাই খাবারের প্রতি সতর্ক থাকতে হবে। গ্লুটিন ও কেজিনযুক্ত খাবার বর্জন করতে হবে। অটিস্টিক শিশুদের খাদ্যে গ্লুটিন যেমন- গম, যব, বার্লি, রাই, ইস্ট এবং কেজিন (দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার) বর্জন করতে হবে। কারণ গ্লুটিন ও কেজিনযুক্ত খাবার অটিস্টিক শিশুদের ত্রুটিপূর্ণ পাচন, শোষণ ও বিপাক ঘটায়। ফলে শিশুদের মধ্যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সে জন্য খাদ্যতালিকা থেকে গ্লুটিন ও কেজিনযুক্ত খাবার ধীরে ধীরে সরিয়ে অস্থিরতার পরিমাণ কমানো যায়। অন্যদিকে, সয়া সসযুক্ত খাবার ও টেস্টিং সল্টযুক্ত খাবারও শিশুর অস্থিরতা বাড়ানোর অন্যতম কারণ। অটিস্টিক শিশুদের চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার না দেওয়াই ভালো। তাই খাদ্যতালিকার প্রতি আলাদা নজর দেওয়া প্রয়োজন।
অনেক অভিভাবক এখনো সচেতন নন। এতে করে তাদের সন্তানদের অবস্থা জটিল হতে পারে। অভিভাবকদের উচিত হবে স্কুলের শিক্ষক, অন্য অভিভাবক এবং বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। সর্বদা নিজের প্রতি এবং সন্তানের প্রতি সচেতন থাকতে হবে।
পিতা-মাতা, ভাই- বোনের সঙ্গে যেন অটিজম শিশুরা বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে সময় কাটাতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। স্কুলের শিক্ষকদের উচিত তাদের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। এইরূপ বিরূপ পরিস্থিতে অবশ্যই অভিভাবককে নিজের প্রতি যত্নশীল হতে হবে এবং সেই সঙ্গে ধৈর্যশীল হতে হবে। যদি কোনো সময় বিচলিত হয়ে পড়েন, তাহলে নিজেদের জন্য সময় নিন। এমন কোনো কাজ করুন যাতে মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে পারেন।
লেখক: তন্বী আক্তার
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়