প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সুখ ফিরেছে ২৫৩ পরিবারে

ঘরের সামনে কলা, মাল্টা, কমলা ও আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির সারি সারি ফলদগাছ। মাচায় ঝুলছে লাউ, মিষ্টি কুমড়া, করলা ও শিমসহ মৌসুমি বিভিন্ন সবজি। প্রথম দেখায় যে কারোরই মনে হতে পারে এটা হয়তো পুরোদস্তুর কোনো কৃষকের ঘর। কিন্তু আসলে তা নয়, ঘরটি যার তিনি মোটেও কৃষক নন। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া উপহারের ঘর এটি, যার বরাদ্দ আবদুল সালামের নামে।

ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ি গ্রামের উত্তরপাড়ার সাবেক বাসিন্দা আবদুস সালাম পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। গ্রামে আড়াই শতাংশ জমির ওপর নিজের একটি বাড়ি থাকলেও সরল বিশ্বাসে ছেলের নামে তা লিখে দেওয়ার পর থেকেই নানানভাবে অবহেলিত হতে থাকেন। এরই মধ্যে ডায়াবেটিসসহ লিভারের সমস্যা ধরা পড়ে তার। ছেলের অবহেলার কারণে ভাড়া বাসায় গিয়ে ওঠার মতো সক্ষমতাও ছিল না তার। চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে আসতে শুরু করে। এরই মধ্যে হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর ঘর উপহার দেওয়ার খবর শুনতে পান। আবেদন করার পর ঘর পেয়েও যান তিনি। ঘর নয়, যেন নতুন করে বাঁচার রসদ খুঁজে পেয়েছেন আবদুস সালাম। হতাশা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে আলোর প্রদীপ জ¦লতে শুরু করেছে তার।

রংপুর বিভাগের সর্ববৃহৎ আবাসন প্রকল্প দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার খয়েরবাড়ি ইউনিয়নের বালুপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শাখা যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে একই জায়গায় প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ২৫৩টি ঘর নির্মাণ করে একটি নতুন আদর্শ গ্রাম স্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগও দেওয়া হয়েছে। এই গ্রামের মাঝে রয়েছে একটি খেলার মাঠ, গ্রামের পাশ দিয়ে অনেক ফাঁকা জায়গাও পড়ে রয়েছে, সেই জায়গায় আবাসনের বাসিন্দারা গড়ে তুলেছেন মৌসুমি সবজির বাগান। এছাড়া বাড়ির সঙ্গে ঘর করে শুরু করেছেন গবাদিপশু পালনও।

তৃপ্তি আর আনন্দমাখা মুখে আবদুল সালাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ঘর পাওয়ার আগে যে হতাশা আর দুঃখ-কষ্টে ছিলাম তা অনেকটাই দূর হয়েছে। এখন যদি একবেলা ডাল-ভাত খেয়ে থাকি তবু শান্তিতে এই ঘরে ঘুমাতে পারি। আমি একজন কাঠমিস্ত্রি। ডায়াবেটিক আর লিভারের সমস্যার কারণে এখন তো আর কাজ করতে পারি না। তাই এই ঘরে আসার পর থেকে অবসর সময়টা কাটানোর জন্য বিভিন্নরকম গাছ লাগাতে শুরু করি।’

পাশের জমি থেকে মাটি তুলে ঘরের চারপাশটা ভরাট করেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তারপর কলা, মাল্টা, কমলা, আমসহ বিভিন্ন ফলের গাছ লাগাই। আর লাউ, কুমড়া, শিমগাছের জন্য মাচাংয়ের ব্যবস্থা করলাম। এখন মাচাংভর্তি লাউ-কুমড়া ধরতেছে। নিজে এগুলো খাচ্ছি আর প্রতিবেশীদেরও দিচ্ছি। আশা করছি লাউ, শিম আর মিষ্টি কুমড়া কিছুদিন পর বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করতেও পারব। আসলে ঘর নয়, আমি যেন নতুন করে বাঁচার পথ খুঁজে পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের এই ঘর যে দান করলেন, আমার কাছে মনে হয় এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দান। এর চেয়ে বড় দান আর পৃথিবীতে হয় না।’

আবদুস সালামের স্ত্রী রাশেদা বেগম বলেন, ‘ঘর পাওয়ার পর থেকে এখন আমরা ভালোই আছি। আমি প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রতিদিন দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ রাখেন, অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখেন। এখন বেঁচে থাকার জন্য এ ঘরটাই আমাদের সম্বল। আমি আর আমার স্বামী মিলে ঘরের পাশে বিভিন্নরকম গাছ লাগাইছি। আমাদের গাছ লাগানো দেখে এখন প্রতিবেশীরাও গাছ লাগাচ্ছে। আমরাও তাদের গাছ লাগাতে সাহায্য করতেছি।’

প্রতিবেশী কল্পনা বেগম বলেন, ‘সালাম ভাইয়ের গাছগুলো দেখে আমি তো বেশ অবাক হয়ে গেছি। এত অল্প সময় আর অল্প জায়গার মধ্যে এত সুন্দর একটা বাগান করছে। আমিও আমার ঘরের পাশে গাছ লাগাব। পাশের জমি থেকে মাটি তুলে ভরাট করতেছি। কয়েক দিনের মধ্যে গাছ লাগাতে পারব। নিজে খাওয়ার মতো একটু শাকসবজি হলে অনেকটা খরচ বেঁচে যাবে।’

ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, প্রথম ও দ্বিতীয় দফায় এই উপজেলায় ৯৬৯টি ঘর বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৭৬৯টি এবং দ্বিতীয় দফায় ২০০টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম দফায় এলুয়াড়ী ইউনিয়নে ১০৫টি, আলাদিপুর ইউনিয়নে ১১৬টি, কাজিহাল ইউনিয়নে ১০১টি, বেতদীঘি ইউনিয়নে ১০৪টি, খয়েরবাড়ি ইউনিয়নে ২৫২টি, দৌলতপুর ইউনিয়নে ৫৬টি, শিবনগর ইউনিয়নে ৩৫টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এছাড়া দ্বিতীয় দফায় এলুয়াড়ী ইউনিয়নে ৩৫টি, আলাদিপুর ইউনিয়নে ৩০টি, কাজিহাল ইউনিয়নে ৩০টি, বেতদীঘি ইউনিয়নে ৩০টি, খয়েরবাড়ি ইউনিয়নে ২৫টি, দৌলতপুর ইউনিয়নে ৫০টি ঘর নির্মাণ করা হয়। এসব ঘরের মধ্যে ৪০ থেকে ৫০ জন ভূমিহীন ভিক্ষুক বরাদ্দ পেয়েছে। বাদবাকি ঘর পেয়েছে প্রতিবন্ধী, সমাজের অসহায় ও ভূমিহীনরা।

ফুলবাড়ীর ইউএনও রিয়াজ উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবাসনের বাসিন্দাদের স্বাবলম্বী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে অনেককে সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তারা যেন প্রধানমন্ত্রীর ঘরে স্বাবলম্বী ও আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। এছাড়াও ঘর পাওয়াদের স্বাবলম্বী হতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ঘর পাওয়া উপকারভোগীরা নিজেদের বাড়ির পাশে বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূল চাষ করে পরিবারের পুষ্টির ব্যবস্থা করছে।’

গত ৩১ জুলাই ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর পরিদর্শন করে জেলা মনিটরিং কমিটি। পরিদর্শনে নেতৃত্ব দেন জেলা মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী। এ সময় কমিটির সদস্য ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুল ইমাম চৌধুরী, সদস্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুরাদ হোসেন, সদস্য সচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) শরিফুল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিয়াজ হোসেন, উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মিল্টন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে কমিটির সদস্যরা উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় উপকারভোগীরা বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরলে শিগগিরই সমস্যাগুলোর সমাধানের আশ্বাস দেন কমিটির সদস্যরা। জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভূমিহীনদের জন্য এ ঘর নির্মাণ করেছেন। এ ঘর নির্মাণে কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এছাড়াও প্রকৃত ভূমিহীনরা যেন এ ঘর বরাদ্দ পায় সে ব্যাপারে জেলা মনিটরিং কমিটি কাজ করছে। উপকারভোগীদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। অভিজ্ঞতার ওপর বিবেচনা করে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করব আমরা। এছাড়াও আগামীতে আমাদের মনিটরিংয়ের কার্যক্রম চলমান থাকবে।’