চুলের বাজার

চুল নিয়ে ভাবনার শেষ নেই। প্রতিনিয়ত চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণও। চুল কেন ওঠে, মাথায় টাক কেন পড়ে, কোঁকড়ানো চুল হয় কেন, কেন চুল পাকে ইত্যাদি। এমন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আমাদের যাপিত জীবনে। প্রতিদিন চুলের যতেœও আমরা অনেক সময় ব্যয় করি। পরচুলার ব্যবহার বাড়লেও একবিংশ শতাব্দীতেও নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে নারীর দিঘল কালো চুলের কদর রয়েছে। চুল বাঙালি নারীর চিরায়ত সৌন্দর্যের উপাদান।

শিল্প-সাহিত্য-সংগীতেও চুলের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কবি-সাহিত্যিকরা নানাভাবে চুলের মহিমা কীর্তন করেছেন যুগে যুগে। লোকসাহিত্যে আছে, ‘কুচবরণ কন্যা রে তার মেঘ বরণ চুল’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রিয়ার খোঁপা তারার ফুল দিয়ে সাজানোর বাসনা ব্যক্ত করেছেন। কবি জীবনানন্দ দাস লিখেছেন, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’।

চুল এত দিন সৌন্দর্যের বন্দনায় বন্দি হয়েছিল। সেখান থেকে বের হয়ে চুল এখন রপ্তানিপণ্য! এই চুল যে এক দিন রপ্তানিপণ্য হয়ে উঠবে সেটা হয়তো আমাদের অনেকের ভাবনাতেই ছিল না। ইতিহাস থেকে জানা যায় প্রাচীনকালেও পরচুলার ফ্যাশন ছিল। সে যুগে রোমের সুন্দরীদের মধ্যে পরচুলা ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ইরান থেকে পরচুলা রপ্তানি হতো গ্রিসে। সে সময় সেলুন বা বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে চুল সংগ্রহ করা হতো না। অমানবিক হলেও সত্যি যে, যুদ্ধে পরাজিত জাতির নারীদের মাথার চুল কেটে নিয়ে এই চাহিদা মেটানো হতো। রোমান নারীদের পরচুলার মধ্যে লুকিয়ে থাকত হতভাগ্য বিভিন্ন জাতির ললনাদের দীর্ঘশ্বাস।

মানুষের মাথার চুল বড় হলে কেটে ফেলা হবে এটাই ছিল এত দিন স্বাভাবিক। সেই চুল আবর্জনা হিসেবে ফেলে দেওয়া হতো। কুসংস্কারবশত কেউ কেউ চুলে থুতু দিয়ে ফেলে দিতেন। এখন চুল আঁচড়ানোর পর ঝরেপড়া চুল ফেলে না দিয়ে গুছিয়ে রাখা হচ্ছে বিক্রির জন্য। গ্রাম ও শহর দুই জায়গাতেই। নারী বা পুরুষ কারোর চুলই ফেলনা নয়। এই চুল এখন মূল্যবান জিনিস। গ্রামে ফেরিওয়ালারা মাসে একবার চুল কিনতে আসেন। চুল সংগ্রহ করার ঘটনা নতুন নয়। মূলত স্বাধীনতার পর থেকেই এই ব্যবসা শুরু। তবে এই ব্যবসার বিস্তার ঘটে ১৯৯৯-২০০০ সালের পর থেকে।

ফেরিওয়ালাদের হাঁক-ডাক পাড়া-মহল্লায়, অলি-গলিতে শোনা যায় : ‘চুল আছে... চুল।’ বাসাবাড়ির পাশাপাশি সেলুন ও বিউটি পার্লার থেকেও বিপুল পরিমাণ চুল সংগ্রহ করছেন ব্যবসায়ীরা। যদিও এখন ছোট চুলের চাহিদা কম। ক্রেতারা সাধারণত ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি লম্বা চুল কেনেন। চুল যত লম্বা হয়, দামও তত বেশি। লম্বা চুল ৮০০ থেকে ১৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়। সংগ্রহ করা চুল যাচাই-বাছাই করার পর প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এক কেজি চুল প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ৬০০ গ্রাম হয়। প্রক্রিয়াজাত করা চুল গ্রেড হিসেবে কেজিপ্রতি ৭ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। চুলের বিনিময়ে টাকার পাশাপাশি মেয়েদের মাথার ক্লিপ, সেফটিপিন, স্টিলের বাটি, চামচসহ নানা সামগ্রী ও বাচ্চাদের হরেক রকম খেলনাও বিনিময় করেন থাকে ফেরিওয়ালারা।

দিন দিন বিদেশের বাজারে বাংলাদেশের চুলের চাহিদা বাড়ছে। এসব চুল দিয়ে পরচুলা, পলিশ ও বিভিন্ন ধরনের ক্রিম তৈরি করা হয়। এর মধ্যে চুল দিয়ে তৈরি ক্রিম নারীদের রূপচর্চায়ও ব্যবহার হয়। কোনো কোনো কোম্পানি চুল থেকে চোখের আইল্যাশ বা চোখের পাপড়িও তৈরি করছে। নানা দেশে চুল দিয়ে ক্যাপ তৈরি ও টাক মাথায় হেয়ার প্ল্যান্টেশনসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হয়। জার্মানি, ইউরোপ, চীন ও ভারতে এ ধরনের নানা কারখানা গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নারীদের চুল এখন ভারত, মিয়ানমার, চীন, জাপান, কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

চুলশিল্পের প্রসার গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। সারা দেশেই চুলের ব্যবসা জনপ্রিয় হচ্ছে। চুল বেচাকেনার জন্য নওগাঁয় এখন হাট বসে। সেখানে চীন থেকে ক্রেতারা আসেন চুল কিনতে। শুধু নওগাঁতেই নয় সাতক্ষীরা, যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, নড়াইল, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, কক্সবাজার, সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে চুল বেচাকেনার কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।

আগে চুয়াডাঙ্গার কিছু অঞ্চলের মানুষ দুমুঠো ভাতের জন্য অন্যের বাড়িতে দিনমজুরের কাজ করত। আজ সেখানে চুলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেই কাজ করছে ১৫ থেকে ২৫ জন শ্রমিক। এভাবে অনেকের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। চুল প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করে অনেকেই বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে পাচ্ছে। চুল রপ্তানি কাজের সঙ্গে যুক্ত থেকে এই জেলার কয়েক হাজার মানুষের ভাগ্যের চাকা সচল হয়েছে।

বর্তমানে ফেলে দেওয়া চুলকে ঘিরেই দেশে গড়ে উঠেছে বেশকিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষ নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করছে ফেলে দেওয়া চুলকে কেন্দ্র করে। ফেলে দেওয়া চুলই এখন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। প্রথম প্রথম এলাকার মানুষ চুল সংগ্রহ করাকে ও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীদের ছোট নজরে দেখত। তবে পরে তাদের সে ধারণা পাল্টায়। দেশের অনেক নারী চুল বিক্রি করতে ইচ্ছুক কিন্তু ধর্মীয় কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিক্রি করতে পারছেন না। একসময় হয়তো রক্তদান, চক্ষুদান, কিডনিদান কিংবা মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের মতো চুল বিক্রিও স্বাভাবিক হয়ে আসবে। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় সমাজ চুল বিক্রিকেও মেনে নেবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, চুল রপ্তানি করে বাংলাদেশ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ৯৫ লাখ ডলার আয় করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয় ২ কোটি ২৩ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ কোটি ২৫ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলারের কৃত্রিম চুল ও মানুষের মাথার চুল রপ্তানি হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১ কোটি ৪৬ লাখ ডলারের চুল ও পরচুলা রপ্তানি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিগত ২০১৫-১৯ এই পাঁচ অর্থবছরে চুল রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে প্রায় ১০ কোটি ডলার। প্রতি অর্থবছরে চুল রপ্তানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তালিকায় ‘উইগ’ এবং ‘হিউম্যান হেয়ার’কে অপ্রচলিত পণ্য হিসেবে বলা হয়েছে। এখন প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে, তার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে ফেলে দেওয়া চুল। এভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে চুলের ব্যবসা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের গ্লোবাল আউটলুক ও ফোরকাস্ট বলছে, ২০২৩ সালের মধ্যে পরচুলার বৈশ্বিক বাজার হবে ১ হাজার কোটি ডলারের, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৮৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত।

রূপসজ্জা শিল্পের উন্নতির কারণে চীনে এই চুলের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি ফ্যাশন দুনিয়াতেও নকল চুল লাগিয়ে সাজসজ্জার রীতি প্রচলিত রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। দিন দিন তা বাড়ছে। এভাবেই ফেলে দেওয়া চুল রপ্তানিপণ্য হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এ খাতটি ছোট হলেও ধীরে ধীরে সম্ভাবনা জাগাচ্ছে। চীনসহ কিছু দেশ চুল শিল্প খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। দেশে এখন চারটি পরচুলা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার তিনটিই ইপিজেডে। এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাই চীনাদের। এর মধ্যে উত্তরা ইপিজেডে রয়েছে ‘এভারগ্রিন প্রোডাক্টস’, ঈশ্বরদীতে ‘এমজেএল কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড’ ও মোংলায় রয়েছে ‘ওয়াইসিএল ইন্টারন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রি’। এর বাইরে গাজীপুরেও একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংকঋণ ও অন্যান্য সুবিধা পেলে চুলশিল্প খাত অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামনিস্ট

hindol_khan@yahoo.com