ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র, কী আছে আফগানিস্তানের ভাগ্যে?

জয়-পরাজয়ের হিসাব অমীমাংসিত রেখেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করার উদ্যোগ নেন। তারই ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের তারিখ নির্দিষ্ট করেন। এমন উদ্যোগ গ্রহণের পরই প্রায় রাতারাতি তালেবানরা আফগানিস্তানের শহর দখল করতে শুরু করে। গত বিশ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে আফগানিস্তানের যে সামরিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল, তা মাত্র এক মাসের মধ্যেই পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে তালেবানদের হাতে। অথচ সেনাসংখ্যা ও যুদ্ধ উপকরণের দিক দিয়ে তালেবানদের চেয়ে অনেক এগিয়ে আফগান বাহিনী। বিশ্লেষকরা আফগান বাহিনীর এই পরাজয়কে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। আর এই ব্যর্থতা থেকে প্রশ্ন উঠেছে, গত বিশ বছরে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক সহায়তানির্ভর যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, এখন যুক্তরাষ্ট্রহীন দেশটিতে সেই শূন্যতা পূরণে অন্য কোনো বিদেশি শক্তির আগমন ঘটবে, নাকি দেশটিতে নতুন করে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির সূচনা হবে।

এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আফগানিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের হটকেক। কাবুল ও বাগরাম বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে অপারেশন চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হয়, সেই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় চীন এশিয়া প্যাসিফিকে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে শুরু করে। আর অর্থনীতিনির্ভর এই ক্ষমতা দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন যখন বুঝতে পারে চীনের কারণে এশিয়া প্যাসিফিক তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, তখনই মূলত আফগানিস্তান ছাড়ার পরিকল্পনা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ইন্দো-প্যাসিফিকে নতুন জোট কোয়াড গড়ে তোলে দেশটি।

তালেবান শাসনাধীন আফগানিস্তানের এখন কী হবে? ২০০১ সালের আগের তালেবানদের সঙ্গে এখনকার তালেবানদের যুদ্ধ কৌশল অনেক ভিন্ন। গতকাল দলটির যোদ্ধারা কাবুলের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। কিন্তু দলটি ঘোষণা দেয়, তারা রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে কাবুলের পতন চায় না। এমন ঘোষণার পরই আফগান সরকার শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ, তালেবানরা চাইছে বর্তমান আফগান সরকার নিজেই নিজের পতন ঘটাক। কাবুলের পতনের পর তালেবানরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে উদ্যোগ নেবে। ইতিমধ্যে সে বিষয়ে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক দিকও মাথায় আছে তালেবানদের। ইতিমধ্যেই দলটির যোদ্ধারা গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ও কাস্টম পোস্টগুলো দখল করে নিয়েছে। পাশাপাশি তালেবান এও নিশ্চিত করেছে যে, চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে তারা কাজ করবে। ফলে আমদানি-রপ্তানিতে খুব একটা সমস্যা হবে না।

কিন্তু গত দুই দশকের রাগ-ক্ষোভ একেবারেই যে প্রকাশ পাবে না, এমনটা বলা যায় না। অভ্যন্তরীণ অসহিষ্ণুতা ও গোলযোগের কারণে বহু আফগান শরণার্থী হিসেবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভিড় করতে পারে। ইতিমধ্যেই পাকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানে শরণার্থী প্রবেশ শুরু হয়েছে। তুরস্ক আফগান শরণার্থীদের গ্রহণ করতে পারেএমন ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই দিয়েছে এরদোয়ান প্রশাসন। কারণ তারাও কাবুল বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। ব্লুমবার্গের মতো প্রতিষ্ঠান বলছে, সিরিয়া ও ইরাকের শরণার্থী পরিস্থিতির শিকার হতে পারে আফগানিস্তান। গত সপ্তাহেই তালেবানদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এরদোয়ানের।

একদিকে যেমন অনেকে শরণার্থী হয়ে বাইরে যাচ্ছে, আবার তালেবানদের প্রতি সহমর্মী হয়ে অনেকে আফগানিস্তানে প্রবেশ শুরু করছে। চীনের উইঘুর, তুর্কমেনিস্তানের ইসলামিক যোদ্ধারা ও আল-কায়েদার মতো আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে দেশটি। দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো সন্দেহ নেই তালেবানের দ্রুতগতির বিজয় বিশ্বজুড়ে ইসলামী চরমপন্থিদের মনোবল জোরদার হবে। হোক তা আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট (আইএস), সিরিয়া ও মোজাব্বিকের যোদ্ধা, বার্মিংহাম বা ম্যানিলার জিহাদ সমর্থক। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেন ওয়ালেস বলেছেন, ব্যর্থ আফগান রাষ্ট্র আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোর উর্বরভূমিতে পরিণত হতে পারে এবং আল-কায়েদা সম্ভবত পুনরায় ফিরে আসবে।

তবে আল-কায়েদা বা অন্যান্য ইসলামী চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তালেবানের আচরণ কেমন হবে তা এখনো অস্পষ্ট। জানা যায়নি তালেবানের উত্থানে আল-কায়েদার প্রতিক্রিয়াও। কিন্তু তালেবান আন্তর্জাতিক বৈধতা চাইবে। এর আগে ক্ষমতায় থাকার সময়েও তারা এটি চেয়েছে এবং আবারও চাইবে। প্রশ্ন হলো, এক্ষেত্রে কাদের সমর্থন তারা চাইবে এবং তালেবান নেতারা কতটা ছাড় দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের জন্য বড় আঘাত আসতে পারে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্র ফেডারেল রিজার্ভে আফগানিস্তানের অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দিতে পারে। কারণ বাইডেন প্রশাসন চাইবে না, বিপুল পরিমাণ অর্থ তালেবানদের হাতে পড়ুক। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তা অ্যান্ডি বার ইতিমধ্যেই নিউইয়র্ক ফেডকে এক চিঠিতে লিখেছেন, তালেবানরা যাতে ফেডের অর্থ থেকে কোনো সুবিধা নিতে না পারে তা যেন নিশ্চিত করা হয়।

আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর চাইছে তালেবান। ধারণা করা হচ্ছে, আফগান সরকার তালেবানদের কাছে এই সময় চেয়েছে বিদেশি শক্তিদের সঙ্গে বোঝাপড়ার জন্য। এক্ষেত্রে আগামী কয়েক দিনে এশিয়া-প্যাসিফিকভুক্ত দেশগুলোর সরকারদের তালেবান প্রশ্নে বক্তব্যই বলে দেবে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে।