বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা সব কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার পেছনে বড় কারণ ছিল অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যাহত লোকসান। পাটকলের উন্নয়নে নেওয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ছিল নানা অনিয়ম। ২০১৮ সালে করিম ও দৌলতপুর জুট মিলসসহ কয়েকটি কারখানার উন্নয়নে নেওয়া হয়েছিল আলাদা দুটি প্রকল্প, এতে বরাদ্দ ছিল প্রায় ২০৭ কোটি টাকা। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের কাজও তেমন হয়নি। যতটুকু হয়েছে, তাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। দুটি প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ে ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে অগ্রিম টাকা, বরাদ্দের চেয়ে করা হয়েছে বাড়তি ব্যয়। এখন কারখানার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চলতি অর্থবছরে প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রেখেই বন্ধ ঘোষণা করা হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশনে এ দুই প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রস্তাবের ওপর করা প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পিইসির কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, বিজেএমসির আওতাধীন তিনটি মিল ‘সুষমকরণ, আধুনিকায়ন, পুনর্বাসন এবং বর্ধিতকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় নরসিংদীর ইউএমসি, নোয়াপাড়ার জেজেআই এবং সীতাকুণ্ডের গালফ্রা হাবিব লিমিটেডের জন্য ১৭৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থ (জিওবি) ১৫০ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ২৪ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে দুই বছর মেয়াদে প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। সে অনুযায়ী প্রকল্পের কার্যক্রম চলছিল। তবে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বিজেএমসির আওতাধীন সব পাটকলের উৎপাদন বন্ধ ঘোষণার পর থেকে প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ব্যয়িত অর্থের ভিত্তিতে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করার আবশ্যকতা দেখা দেয়।
এ নিয়ে আয়োজিত পিইসি সভায় প্রকল্প পরিচালক লুৎফুল হায়দার বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা এবং আর্থিক অগ্রগতি ২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ হিসাবে প্রকল্প সমাপ্তিকরণের উদ্দেশ্যে সংশোধিত ডিপিপিতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে। এ অর্থ গালফ্রা হাবিব লিমিটেডের অফিস ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করার পাশাপাশি কম্পিউটার, স্টেশনারি ইত্যাদি ক্রয় এবং অ্যাপায়নে ব্যয় হয়েছে।
অফিস ভবন (গালফ্রা হাবিব লিমিটেড) নির্মাণবাবদ মূল ডিপিপিতে ৭২ লাখ টাকা অনুমোদিত হয়েছিল। তবে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা। এছাড়া পূর্ত কাজের জন্য ১ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং খুচরা যন্ত্রাংশ কেনায় ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা অর্থাৎ মোট ৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা অগ্রিম প্রদান করা হয়। বিজেএমসি বন্ধের পর যন্ত্রাংশ কেনার জন্য প্রদত্ত অর্থ আনা সম্ভব হয়নি। এ খাতে ব্যয়িত অর্থ সংশোধিত ডিপিপিতে দেখানো হয়নি। এ হিসাব অন্তর্ভুক্ত করলে মোট প্রকল্প ব্যয় দাঁড়ায় ৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা।
সভায় শিল্প ও শক্তি বিভাগ জানায়, বিজেএমসি বন্ধের পর প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রকল্পটির মেয়াদি ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্পের হিসাব সমন্বয়ের জন্য ১৫ মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। শুধু হিসাব সমন্বয়ের জন্য প্রকল্পের সময় বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই মর্মে প্রস্তাব নাকচ করে দেয় পরিকল্পনা কমিশন।
শিল্প ও শক্তি বিভাগের প্রধান ড. সাঈদ হাসান শিকদার বলেন, অনুমোদিত ডিপিপিতে উল্লিখিত বরাদ্দের চেয়ে অধিক ব্যয় করার কোনো বিধান নেই। অফিস ভবন (গালফ্রা হাবিব লিমিটেড) নির্মাণবাবদ এই অনুমোদনহীন অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে সংশোধিত ডিপিপিতে অবশ্যই ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
গালফ্রা হাবিব লিমিটেডের অফিস ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনিয়ম সম্পর্কে শিল্প ও শক্তি বিভাগের সদস্য শরিফা খান বলেন, পিপিআর অনুযায়ী পূর্তসেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে কি না তা মন্ত্রণালয়কে যাচাই করে দেখতে হবে। এ অতিরিক্ত ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিভূত ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত করে ডিপিপি সংশোধন করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ ফেরত আনার জন্য বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নুরউদ্দিন আল ফারুক বলেন, মূল ডিপিপিতে অনুমোদিত বরাদ্দের অতিরিক্ত ব্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া প্রকল্পের সব ধরনের প্রকিউরমেন্ট অনুমোদিত ডিপিপিতে উল্লিখিত প্রক্রিয়া অনুসারে সম্পন্ন করা উচিত ছিল। কাজেই ঠিকাদারের হাতে কাজ শেষ হওয়ার আগেই আগাম ও অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করাটা নিয়মবহির্ভূত হয়েছে। আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে কেন এরূপ নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পে ব্যয়িত অর্থে কোন ব্যত্যয় ঘটেছে তা অবশ্যই ব্যাখ্যার দাবি রাখে। প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়ের একটি পূর্ণাঙ্গ অডিট হওয়াও প্রয়োজন। গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা থাকলেও সংশোধিত পুনর্গঠিত ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠাতে হবে। পিপিআরের নিয়মবহির্ভূত কোনো সেবা ও মালামাল ক্রয় করা হয়ে থাকলে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সংযোজন করবে এবং প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ ফেরত আনার জন্য পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া পূর্ত নির্মাণকাজে ৭২ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও আন্তঃঅঙ্গ সমন্বয় না করে ৭৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা কীভাবে ব্যয় করা হলো তার ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে।
অন্যদিকে ২০১৮ সালে দুই বছর মেয়াদে ‘করিম জুট মিল লিমিটেড ও দৌলতপুর জুট মিলস লিমিটেডে ফেল্ট কারখানা স্থাপন এবং কেএফডি মিলস লিমিটেডের বহুমুখী ইউনিটের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। এতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৩ কোটি ৬০ লাখ। বিজেএমসির সব কারখানা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রকল্পের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ফলে গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যয়িত অর্থের ভিত্তিতে প্রকল্পটি অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত করার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রকল্প সংশোধনী এনে সমাপ্তি টানতে হবে।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক অংছেন থোই বলেন, প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জিভূত ব্যয় ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা; যা মোট বরাদ্দের ২২ দশমিক ২৭ শতাংশ। ডিপিপি অনুসারে গণপূর্ত কাজে ব্যয় হওয়ার কথা ৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, কিন্তু ২০১৮ সালের রেট শিডিউল কার্যকর হওয়ার কারণে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য ৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ধরে প্রকল্পের সমাপ্তি টানতে হবে।
এ প্রকল্প বিষয়ে পরিকল্পনা কশিমন বলছে, মূল ডিপিপিতে অন্যান্য ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণবাবদ ৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। তবে গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অনুমোদিত ডিপিপির তুলনায় এ খাতে সাড়ে ৮ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বিষয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করে পুনর্গঠিত ডিপিপিতে সংযোজন করতে হবে এবং যেহেতু গত বছর ৩০ সেপ্টেম্বরের পর প্রকল্পটির সব কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে, সে কারণে শুধু হিসাব সমন্বয়ের জন্য প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির কোনো সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের এক সদস্য বলেন, বিজেএমসির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রকল্প চলমান থাকতে পারে না। এখন এ দুটি প্রকল্প বন্ধ করা হবে। কিন্তু এখানে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম হয়েছে। ঠিকাদারকে অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়েছে, যা ফিরিয়ে আনতে বলা হয়েছে।
বিজেএমসির চেয়ারম্যান আবদুর রউফ বলেন, প্রকল্প দুটি বন্ধের বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন থেকে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিপিপি সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। সে অনুসারে ডিপিপি সংশোধন করে প্রকল্প দুটি বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।