জনঘনত্ব ও ম্যালথাস তত্ত্ব

ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্ব আমরা প্রথম পড়েছিলাম কলেজের একাদশ শ্রেণিতে। তার মূল কথা ছিল খাদ্য উৎপাদন বাড়ে গাণিতিক হারে, পক্ষান্তরে মানুষ বাড়ে জ্যামিতিক হারে। ফলে খাদ্য সংকট অনিবার্য। মানুষ নিজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যদি তার ক্রমবৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ না করে এবং এই দুই হারের মধ্যে ভারসাম্য না আনে, তবে প্রকৃতি নিজেই সে দায়িত্ব ঘাড়ে নিয়ে নেবে; রোগশোক, অপুষ্টি, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে সে ভারসাম্য রচিত হবে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার এই তত্ত্ব প্রকাশ হওয়ার পর পর্যাপ্ত সমালোচনার ভারে এটি অনেকটা ধামাচাপা পড়ে যায়। সমালোচকদের কথা, মানুষ শুধু তার একটা পেট নিয়ে জন্ম লাভ করে না; সেই সঙ্গে সে নিয়ে আসে দুটি হাত এবং একটি উর্বর মাথা। কাজেই ভয়ের কোনো কারণ নেই। কিন্তু বিলম্বে হলেও এখন দেখা যাচ্ছে যে, ম্যালথাস অসত্য কথা বলেননি; তার কথা অনেক স্থানে ফলতে শুরু করে দিয়েছে। এ মুহূর্তে বিশ্বের ৭.৯ বিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৬৮৯ মিলিয়ন মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করছে। বিশ্বব্যাংক বলছে এ বছর আরও ১৫০ মিলিয়ন মানুষ যুক্ত হবে। এই মহামারীতে বাংলাদেশে মৃত্যুহার এবং সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমানের ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব মারাত্মক। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ীই দেশের দারিদ্র্যের হার ২০.৫ থেকে বেড়ে ২৯.৫ শতাংশ হয়ে গেছে; বেসরকারি প্রাক্কলন অনেক বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, অভাব সীমাহীন, কিন্তু সম্পদ সসীম। বিজ্ঞানীরা বলেন, মহাবিশ্বে বস্তু ও শক্তির কোনো বিনাশ বা সৃজন নেই; আছে শুধু রূপান্তর। ভারসাম্যের জন্য এই রূপান্তর অপরিহার্য। জড় ও জীবজগতে এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় ঘটে নানা ধরনের ঘর্ষণ, ছেদন, স্ফুরণ ও বিস্ফোরণ। কিন্তু অনুভূতিহীন বস্তুজগতে তাতে কিছু যায় আসে না, তবে অনুভূতিসম্পন্ন জীবজগতে নিয়ে আসে নানা পীড়ন, সহন ও বেদন, এমনকি মরণ। জীবজগতে প্রাণিকুল নিজেদের খাদ্য নিজেরা তৈরি করতে পারে না; এর জন্য তারা উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। এখন মাত্রাতিরিক্ত সংখ্যাবৃদ্ধির কারণে মানুষ যদি অন্নদাত্রী এই উদ্ভিদ ও তার আধার সংহারে মত্ত হয়ে ওঠে, তাহলে তো সেটা নিজের পায়ে কুড়াল মারা বৈ অন্য কিছু নয়। মানবসভ্যতার ইতিহাস থেকে দেখা গেছে, মানুষ যেখানে গেছে, সেখানেই সে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করেছে। এই যে এখন পৃথিবীর সাতশ নব্বই কোটি মানুষের মুখের গ্রাস জোগাড় করতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ, বন উজাড় এবং নিবিড় ভূমি কর্ষণের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, তা তো আসলে পরবর্তী প্রজন্মের সঞ্চয়ে বর্তমান প্রজন্মের ওভারড্রাফট। এই অব্যবস্থা কোনো টেকসই সমাধানের সূচক নয়।

আমাদের দেশের দিকে তাকালেও প্রকৃতির এই বেহাল দশা ও মানুষের ভিড় সহজেই লক্ষ করা যায়। Worldometer-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী ১৫ আগস্ট ২০২১ তারিখে দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬,৪৬, ৮৯,৩৮৩ এবং জনঘনত্ব প্রতি বর্গ মাইলে ৩,২৭৭ জন। ছোট ছোট চার-পাঁচটা দ্বীপ রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের কোথাও এত ঘন বসতি নেই। এখনো প্রতি তিন বছরে বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে একেকটা সিঙ্গাপুরের জন্ম দিয়ে চলেছে, প্রতিদিন নিট নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে ৪,৩৮০টি  (worldpopulationreviwe.com)। চাল উৎপাদনে কোনো রকমে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হলেও দেশে এখন প্রতি বছর গড়পড়তা ৫০ থেকে ৬০ লাখ টন গম আমদানির প্রয়োজন হয়। এসব পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে শুধু রাস্তায় হাঁটা শুরু করলেই জনঘনত্বের উত্তাপ স্পষ্ট বোঝা যায়। ১৯৯৫ সালে হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। পরে তার লেখা আত্মজৈবনিক গ্রন্থ The Living History-তে তিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গের অবতারণা করেন তার দেখা সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে। হোটেল থেকে জানালার ফাঁক দিয়ে রাজপথে ও গাড়িতে মানবসন্তানদের গড়াগড়ি আর পাশাপাশি প্রাচুর্য এবং দারিদ্র্যের বৈপরীত্য দেখে তিনি বিস্ময়াভিভূত হন। তিনি নিশ্চয়ই গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট বা নীলক্ষেতের ফুটপাতে হাঁটার সুযোগ পাননি? পেলে বুঝতেন, গড়াগড়ি কাকে বলে!

আশির দশকে লালমনিরহাটে প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদকে এক সভায় দেখেছিলাম পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে তুলোধুনা করতে। তার কথা, জন্ম নিয়ন্ত্রণে কাগুজে সাফল্যের জন্য আন্তর্জাতিক মহল থেকে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন বটে; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ৬০ শতাংশ ভুয়া। অবশ্য, ভুয়া রিপোর্ট দাখিল নতুন কোনো বিষয় নয়; গণচীনে  Great Leap Forward কর্মসূচি চলাকালে এই ভুয়া রিপোর্টের কল্যাণে খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়া সত্ত্বেও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে পর্যাপ্ত উদ্বৃত্ত দেখানো হয় এবং দেশে দুর্ভিক্ষ চলাকালেও খাদ্য-শস্য রপ্তানি করা হয়। ওই দুর্ভিক্ষে সে দেশে কমপক্ষে দেড় কোটি লোক মারা যায়। রিপোর্টের গুণাগুণ যাই হোক, এরশাদের আমলে পরিবার পরিকল্পনার কার্যক্রম ও প্রচারণা ভালোই চলছিল। কিন্তু তারপর থেকে ওই বিভাগের কার্যক্রম আর তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়।

এখন মনে করা হচ্ছে যে, মানুষ হলো সম্পদ। কাজেই মানবসন্তানের জন্ম সীমিত করা হলে দেশে সম্পদের সরবরাহ-ঘাটতি দেখা দেবে, যেটা কারোরই কাম্য নয়। তা ছাড়া, জন্মহার কমিয়ে ফেলা হলে আমাদের দেশে বর্তমানে যে জনমিতিক সুবিধা রয়েছে, তা ২০৩০ সালের পর কমতে শুরু করবে। কিন্তু জন্মহার অব্যাহত থাকলে জনমিতিক সুবিধা চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। কথাটা অবশ্য একেবারে ফেলনা নয়। তবে এর মধ্যে অনেক ‘কিন্তু’ ও ‘যদি’ রয়েছে।

শিক্ষিত, জ্ঞান ও দক্ষতাসম্পন্ন এবং স্বাস্থ্যবান মানুষ যেমন যেকোনো দেশের সম্পদ, তেমনি নিরক্ষর, কূপমন্ডূক, জ্ঞান-দক্ষতা এবং পুষ্টিহীন মানুষ দেশের জন্য শুধু আপদ না, বিপদও। এই যে অতিমারীর মধ্যে মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানে না, টিকা নিতে চায় না, মাস্ক পরে না, বিধিনিষেধের সময় ঘরে থাকে না, ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখে না, ঈদে বাড়িতে যাওয়ার নিষেধ মানে না, সামান্য বন্যায় মানুষের ঘরবাড়ি রক্ষা করা যায় না, ডেঙ্গু রোগের সময় নিজের ঘর ও আঙিনা পরিষ্কার রাখে না, সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক শক্তিশালী কর্র্তৃপক্ষ তাদের আদেশ মানাতে পারে না, তার কারণ কী? এর পেছনে মূল কারণ খুঁজতে গেলে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে যেটা সামনে আসবে, সেটা হলো মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা।

বিধিনিষেধের সময় মানুষ বাইরে আসে কেন, কারণ কিছু মানুষের আছে পেটের দায়; পেটের দায় কেন, কারণ তারা গরিব। তারা গরিব কেন, কারণ তাদের সম্পদের তুলনায় মানুষ বেশি। মানুষ ৬ ফুট দূরত্ব নিয়ে হাঁটে না কেন, কারণ ফুটপাত ৩ ফুট, কিন্তু একসঙ্গে লোক চলে ৩ জন। শিল্পপতিদের এত বেশি প্রণোদনা দেওয়া গেল, কিন্তু গরিবদের ঘরে রাখার জন্য এত কম প্রণোদনা কেন? কারণ, শিল্পপতিদের সংখ্যা কম, কিন্তু দরিদ্রদের সংখ্যা অনেক বেশি। বন উজাড় করে আর পাহাড় কেটে বসতি গড়া, কারেন্ট জাল দিয়ে রেণু আহরণ করে নদ-নদী মৎস্যশূন্য করার অনুঘটক এই জনসংখ্যা। এভাবে দেশের প্রধান প্রধান সব সমস্যার অধিকাংশকেই এই বর্ধিত জনসংখ্যার নেতিবাচক প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।

তা ছাড়া ধরণিরও তো একটা ধারণ ক্ষমতা রয়েছে; এ মুহূর্তে ধরণি কোনোভাবে আমাদের ধারণ করছে বটে, তবে সেটা করছে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত সম্পদ অগ্রভাগে শোষণ করে। দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বেসামাল বেড়ে গেলে তার সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রশাসনের সক্ষমতার ওপর; জনসংখ্যা হয়ে পড়ে নিয়ন্ত্রিত। কড়া বিধিনিষেধের মধ্যেও মানুষকে ঘরে রাখা যাচ্ছে না; প্রশাসন অনেক জেল-জরিমানা করছে, লোক আটক করছে। কিন্তু অবস্থা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। বিগত ঈদগুলোতে চরম ঝুঁকি সত্ত্বেও শুধু ঢাকা থেকে লোকজনের যাওয়া এবং আসা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। বর্ধিত জনসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে তার অনুষঙ্গ হিসেবে ফলিত ক্রমবর্ধমান বৈষম্য আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতারও কারণ হতে দেখা যায়। কাজেই সব বিবেচনায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য।

একজন খ্রিস্টীয় ধর্মযাজক হয়েও টমাস রবার্ট ম্যালথাস এত আগে কীভাবে জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি ও ধরণির খাদ্য উৎপাদন ক্ষমতার জটিল সম্পর্ক ও চরম ফলাফল সম্পর্কে যে তত্ত্ব দিয়েছেন, সেটা ভেবে ছাত্রাবস্থায় আমি একটু বিস্মিত হয়েছিলাম। অবশ্য এর পেছনে আমাদের দেশের ধর্ম গুরুদের জ্ঞান গরিমার বহর কাজ করেছিল। যাই হোক, পরে জেনেছিলাম যে, তিনি কোনো মামুলি যাজক ছিলেন না; ছিলেন তৎকালীন সমাজের প্রভাবশালী পণ্ডিত পিতা ড্যানিয়েল ম্যালথাসের পুত্র, পেয়েছিলেন পিতৃবন্ধু দার্শনিক জাঁ জ্যাঁক রুশো ও ডাভিড হিউমের স্নেহসিক্ত অভিভাবকত্ব। তিনি কেমব্রিজ থেকে মাস্টার ডিগ্রি অর্জন করেন এবং রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করেন। ডেভিড রিকার্ডো ও জেমস মিলের মতো অর্থনীতিবিদরা ছিলেন তার বন্ধু।

ম্যালথাসের তত্ত্বের মূল কথা এই যে, জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি তার অস্তিত্বের জন্য প্রয়োজনীয় রসদের জোগান দ্বারা সীমাবদ্ধ; অস্তিত্বের রসদ বাড়তে থাকলে জনসংখ্যাও বাড়তে থাকবে, যতক্ষণ না সমাজের দরিদ্র শ্রেণির মানুষ অসচ্ছলতা, রোগশোক ও খাদ্য সংকটে পতিত হবে। এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জনসংখ্যা সীমিতপর্যায়ে রাখতে হবে এবং বাড়তি সম্পদ জীবনমান উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। অন্যথায় প্রকৃতি নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ মহামারী, দুর্ভিক্ষ, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি দৈব দুর্বিপাকের মাধ্যমে ভারসাম্য আনার ব্যবস্থা নেবে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের ওপর প্রথম আঘাত আসবে। এজন্য তাদেরই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকাশের পর থেকে তার এই তত্ত্ব কঠিন সমালোচনার মধ্যে পড়ে। এখন পর্যন্ত উন্নত কোনো দেশে তার এই তত্ত্বকে ক্রিয়াশীল হতে দেখা না যাওয়ায় সমালোচকরা উতরেও যান। কিন্তু আমাদের মতো উন্নয়নশীল অতি জনঘনত্বের দেশে এই তত্ত্ব এখনই মাঝে মধ্যে ফলতে দেখা যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন আবার এই তত্ত্বের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করছে। কাজেই সময় থাকতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়নের উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটলে ও শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়লে বর্ধিত সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। আমরা বিশ্বাস করি বর্ধিত জনসংখ্যা নয়, উন্নত মানবসম্পদ হবে উন্নয়নের চাবিকাঠি এবং সে লক্ষ্যেই সরকার বিনিয়োগের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে।

খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com