সিরিজ বোমার অর্থদাতাদের খোঁজ পায়নি পুলিশ

আজ ১৭ আগস্ট বহুল আলোচিত সিরিজ বোমা হামলা দিবস। ২০০৫ সালের এই দিনে একটি মাত্র জেলা বাদে দেশের সবকটি জেলাতেই একযোগে বোমা হামলা চালায় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এ ঘটনায় জেএমবি জানান দিয়েছিল জঙ্গিদের উত্থানের বিষয়ে। সারা দেশে মামলা হয় ১৫৯টি। ১৬ বছরে ১১২টি মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। থেমে আছে বাকি ৪৭টি মামলার বিচার প্রক্রিয়া। বোমা হামলার পর শীর্ষ জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই ও শায়খ আবদুর রহমানসহ ১ হাজার ২৩ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু এত বড় জঙ্গি হামলার পরও অধরাই রয়ে গেল পৃষ্ঠপোষক ও অর্থদাতাদের নাম। মাসের পর মাস জুড়ে তদন্ত করলেও হামলার পেছনে যারা কলকাঠি নেড়েছেন তাদের চিহ্নিত করতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। এই নিয়ে আছে আলোচনা-সমালোচনা। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা এখনো বলছেন, পৃষ্ঠপোষক ও অর্থের জোগানদাতাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবেই। যারা জঙ্গি সৃষ্টি করেছেন, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ১৫৯টি মামলা করা হয় সারা দেশে। তার মধ্যে ১১২টি মামলা নিষ্পত্তি হলেও ৪৭টি মামলার বিচারকাজ এখনো শেষ করা সম্ভব হয়নি। সবকটি মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি ছিল ১ হাজার ১৩১ জঙ্গি। আর গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ২৩ জনকে। তার মধ্যে র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে ৬৭ জনকে। ১১২টি মামলায় ৩৩৪ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭ জনকে জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। আর ফাঁসি কার্যকর করা হয় আটজনের। ২০০৫ সালে দেশ জুড়ে সিরিজ বোমা হামলাকে ‘সাউন্ড ব্লাস্ট’ নামে আখ্যায়িত করেছিল পুলিশ। যেসব জায়গায় সিরিজ বোমা হামলা হয়েছে, প্রতিটি স্থানেই তারা ‘ইসলামি আইন বাস্তবায়ন’ শিরোনামে লিফলেট ফেলে যায় জঙ্গিরা। সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমেই মূলত নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দেয় জঙ্গি সংগঠন জেএমবি। এরপর তারা বিভিন্ন জঙ্গি কর্মকান্ড চালিয়েছে। এর আগে এই জঙ্গি সংগঠনটি ২০০১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার গুড়পুকুরের রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায়। তারপর থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় শতাধিক হামলায় জড়িত ছিল জেএমবি। সিরিজ বোমা হামলার পর জেএমবি আরেকটি আলোড়ন তোলে ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারক সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে হত্যার ঘটনায়। ওই সময় বোমা হামলাকারী জেএমবি সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন হাতেনাতে ধরা পড়ে। দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবিপ্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাইসহ সাতজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে আল মামুন ছাড়া বাকি ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।

বিচারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাক্ষী হাজির করতে না পারা এবং আসামিদের নাম-পরিচয়সহ নানা তথ্য-প্রমাণের অভাবে এতদিনেও বিচার কার্যক্রম শেষ করা যায়নি। এছাড়া চলমান করোনা মহামারীর কারণে দীর্ঘদিন আদালত বন্ধ থাকায় মামলার কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে ছিল। তবে বর্তমানে আদালত খুলে দেওয়ায় সাক্ষীদের হাজিরসহ অন্যান্য জটিলতা নিরসন করে দ্রুত সময়ে বিচারকাজ শেষ করা হবে বলে তারা জানান।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. আবদুল্লাহ আবু গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিরিজ বোমা হামলার ঘটনায় ঢাকায় ১৭টি মামলা হয়েছিল। সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে আটটি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তার মধ্যে ১২টি মামলার বিচার শেষ হয়েছে। করোনার কারণে বাকি পাঁচ মামলার বিচার শেষ করা যায়নি। আশা করছি চলতি বছরের মধ্যেই বিচারের কাজ শেষ হবে। তিনি আরও বলেন, দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরলসভাবে কাজ করছে। সিরিজ বোমা হামলার পেছনে যারা কলকাঠি নেড়েছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি অর্থের জোগানদাতাদের চিহ্নিত করতে হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ থেকে জঙ্গি নির্মূল করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছি। জঙ্গি কাজে সংশ্লিষ্ট নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর দিকে আমাদের দৃষ্টি আছে সার্বক্ষণিক। সাইবারজগতে উগ্রবাদীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে। তবে জঙ্গিরা মাথাচাড়া দেওয়ার কোনো ধরনের সুযোগ পাবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট ছিল খুবই ভয়ংকর একটি দিন। জেএমবি নামে জঙ্গি সংগঠন আছে তা আমরাই জানতাম না। ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টায় হাইকোর্টের মূল ফটকে বিকট শব্দে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। হতচকিত হয়ে পড়েছিল রাস্তায় টহল পুলিশও। সারা দেশেই একের পর বোমা বিস্ফোরণের খবর পাচ্ছিলাম। শুধু মুন্সীগঞ্জ বাদে ৬৩ জেলার ৪৫০টি স্থানেই সেদিন আক্রান্ত হয়েছিল। এক ঘণ্টার ব্যবধানে সবকটি বোমা বিস্ফোরণ হয়। তিনি আরও বলেন, জঙ্গি সংগঠন জেএমবি তাদের শক্তি-সামর্থ্যরে জানান দিয়েছিল। হামলার পর লিফলেট পাওয়া যায়। লিফলেটের লেখায় ‘আল্লাহর আইন কায়েম ও প্রচলিত বিচার পদ্ধতি’ বাতিলের দাবি জানিয়েছিল জঙ্গিরা। বোমা হামলার পর একযোগে পুলিশ তদন্ত শুরু করে। এর পেছনে অনেক রাঘববোয়াল জড়িত ছিল। তবে আমরা তাদের নাম উদঘাটন করতে পারিনি। তাছাড়া পারিনি অর্থের জোগানদাতাদের নাম। এখনো আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। আশা করছি পৃষ্ঠপোষক ও অর্থদাতাদের নাম উদঘাটন করা সম্ভব হবে।

ডিএমপির অন্য এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, হলি আর্টিজান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে সেই ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলার পথ ধরেই। সিরিজ বোমা হামলার পাঁচ বছর পর ২০১০ সালে জেএমবির সব কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু নিষিদ্ধঘোষিত সেই জঙ্গি সংগঠনটি গোপনে তাদের কার্যক্রম চালাতে থাকে। নব্য জেএমবি নামেই জঙ্গিরা মাঠে নামে। ২০০৭ সালে শীর্ষ জঙ্গি নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম, খালেদ সাইফুল্লাহ, আতাউর রহমান সানি, আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হাসান আল মামুনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আশির দশক থেকেই এ দেশে জঙ্গিবাদের ধারণা প্রসারের চেষ্টা চলছিল। আফগান যুদ্ধক্ষেত্রফেরত কিছু কট্টরপন্থি নিয়ে ১৯৯২ সালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রকাশ্যে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজি) নামে সংগঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পরে ১৯৯৮ সালে শায়খ আবদুর রহমানের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে জেএমবি। তারপর আত্মপ্রকাশ হয় বাংলা ভাইয়ের জেএমজেবি। এমনকি এ দুটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগযোগ ছিল।

তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ : অভিযোগ উঠেছে তদন্তসংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতে প্রথমে মামলার এজাহারে নির্দিষ্টভাবে কাউকে আসামি করা হয়নি। এছাড়া সাক্ষীও পাওয়া যাচ্ছিল না। আবার যাদের সাক্ষী করা হয়েছিল তাদের টিআই প্যারেড করানো হয়নি। ঘটনার সময় কারা হামলার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। জঙ্গিদের কারা লালনপালন করেছে বা কাদের নির্দেশে বোমা হামলা হয়েছে তাও শনাক্ত করতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

মামলা ও পুরস্কার ঘোষণা : ২০০৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর জঙ্গিদের ধরিয়ে দিতে সরকার ১ কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। পুরস্কারের মধ্যে ছিল জেএমবির মজলিসে শূরার প্রতি সদস্যের জন্য ১০ লাখ টাকা, আত্মঘাতী সদস্যের জন্য ২ লাখ এবং এহসার সদস্যের জন্য ১ লাখ টাকা। কিন্তু শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলাভাইসহ যেসব শীর্ষ জঙ্গি গ্রেপ্তার হয়েছিল, তাদের ধরার পুরস্কারের টাকা কে বা কারা পেয়েছে তা আজও উদঘাটন হয়নি।