দফায় দফায় নানা লকডাউন বা নানারকম বিধিনিষেধ শেষে সারা দেশে সড়ক, নৌ ও রেলপথে সব ধরনের যানবাহনের স্বাভাবিক চলাচল শুরু হতে না হতেই সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বাড়তে শুরু করেছে। গত ১৬ আগস্ট সোমবার সিরাজগঞ্জের কোনাবাড়ীতে সেনাবাহিনীর একটি পিকআপের সঙ্গে সিমেন্টবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে দুই সেনাসদস্য নিহত হন। আহত হন তিনজন। একই দিন যশোরের মণিরামপুরে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের এক আরোহী নিহত হন। সেদিনই সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় গ্রামীণ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নিহত হন। এর আগের দিন রবিবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে প্রাইভেট কার ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। তার আগের দিন ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বৈলরে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের পেছনে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় নিহত হন ছয়জন। সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে এভাবেই প্রতিদিন সড়কে ঝরে যাচ্ছে একের পর প্রাণ।
মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরে ‘দম্পতিসহ প্রাণ গেল ৬ জনের’ শিরোনামের প্রতিবেদনে হবিগঞ্জের নছরতপুরে কাভার্ড ভ্যান ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এক দম্পতিসহ ছয়জন নিহত হওয়ার খবর তুলে ধরা হয়। সোমবার সকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নছরতপুর রেলগেটসংলগ্ন স্থানে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন চুনারুঘাটের ফান্ডাইল গ্রামের অটোরিকশাচালক আহাদ মিয়া (৩০), তার স্ত্রী হনুফা (২৫), একই গ্রামের সোহাগ মিয়া (২৮), স্বপন মিয়া (২৫), একই উপজেলার শ্রীবাউর গ্রামের রাহেলা (৩০) ও আলমগীর মিয়া (২৮)। শায়েস্তাগঞ্জ হাইওয়ে থানার ওসি জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে চুনারুঘাট থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ছয়জন যাত্রী নিয়ে অলিপুরের দিকে যাচ্ছিল। পথে নছরতপুর রেলগেটসংলগ্ন স্থানে একটি ট্রাককে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন চালক। এ সময় বিপরীতমুখী একটি কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে অটোরিকশাটির মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই চালকসহ ওই ছয়জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গত রবিবার রাত থেকে সোমবার দুপুর পর্যন্ত দেশের চার জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় দুই সহোদরসহ সাতজন নিহত হন। রাজধানীর মিরপুর লালকুঠি এলাকায় বাসের ধাক্কায় ফরিদা বেগম (৬০) নামে এক নারী নিহত হন সোমবার। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব দুর্ঘটনার বেশিরভাগই ঘটেছে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো এবং ওভারটেক করার কারণে।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, দেশের মহাসড়কগুলোতে দ্রুত গতির বাস-ট্রাকের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত কম গতির হালকা যান বা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইক নামের যানবাহন ইত্যাদির চলাচল অনেক দুর্ঘটনার কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞরা অন্যান্য সুপারিশের পাশাপাশি দেশের মহাসড়ক এবং আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে এসব যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। আর সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর সংখ্যাও কমছে না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত ২০২০ সালে দেশে ৪ হাজার ৮৯১টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ হাজার ৬৮৬ জন। আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৬০০ জন। দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে সংগঠনটি বলছে, গত বছর যত সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে, এর মধ্যে ৫২ দশমিক ৯৬ শতাংশ গাড়িচাপা দেওয়ার ঘটনা। এ ছাড়া ২২ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ শতাংশ যানবাহন খাদে পড়ে দুর্ঘটনাকবলিত হয়। দুর্ঘটনার ধরন সম্পর্কে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে সংঘটিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দেশের মহাসড়ক ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোতে একই সঙ্গে বিভিন্ন গতির ভারী ও হালকা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের মফস্বল শহর ও গ্রামাঞ্চলে সর্বসাধারণের চলাচলের জনপ্রিয় যানে পরিণত হয়েছে নানা ধরনের ব্যাটারিচালিত হালকা যান। বিশেষত রিকশায় ব্যাটারি সংযোজন করে অটোরিকশা বানানো এবং ইজিবাইক নামের ব্যাটারিচালিত যান খুবই হালকা। হালকা যানে অতিরিক্ত গতির সঞ্চার হলে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। কিছুদিন ধরে বড় বড় শহরে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বন্ধে তোড়জোড় দেখা গেলেও সারা দেশেই সেসব দাপটের সঙ্গে চলছে। এমতাবস্থায় সরকার এমন ব্যাটারিচালিত হালকা যানের প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত সংস্করণ তৈরি করতে পারে। নিবন্ধন সাপেক্ষে যা দেশব্যাপী নির্দিষ্ট পরিসরে স্থানীয় সড়কগুলোতেই কেবল চলাচল করবে। তাতে সাধারণ মানুষের যানবাহনের চাহিদা যেমন পূরণ হবে, তেমনি সড়কে এমন অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনার হারও কমিয়ে আনবে। এ ছাড়া দেশব্যাপী গণপরিবহনের চালক-সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনতে সর্বশেষ সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের পদক্ষেপ জোরদার করা জরুরি।