শেখ মুজিব সারা জীবন যুদ্ধ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে করেছেন, পরেও করেছেন। মাঝখানে, ওই যুদ্ধের সময়টাতেই বরঞ্চ, মরণপণ যখন লড়াই চলছিল সব ফ্রন্টে তখনই কেবল নীরবে কারা অন্তরালে ছিলেন। নইলে তার জীবন নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামেরই ইতিহাস।
পাকিস্তানের সারাটা সময় তাকে লড়তে হয়েছে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। তাদের তিনি চিনতেন। পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তার কোনো আপসকামিতা দেখিনি। সুযোগ ও প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও অনেক বুনিয়াদি নেতা যেখানে ব্যর্থ হয়ে গেলেন সেখানে শেখ মুজিবের সাফল্যের কারণ কীএ প্রশ্নের জবাব দিতে হলে তার আপসবিমুখতার উল্লেখ না-করে উপায় থাকে না। আপসের চোরাবালিতে অন্যরা পা দিয়েছেন, তিনি দেননি। অন্যরা হারিয়ে গেছেন, তিনি যাননি, অসমতল ভূমিতে সরলরেখায়-প্রসারিত পথ ধরে তিনি এগিয়ে গেছেন।
পাকিস্তানি শত্রুদের তিনি জানতেন। কিন্তু বোধ হয় সবটা জানতেন না, জানলে ধরা দিতেন না একাত্তরে, কিংবা পাকিস্তানি আক্রমণ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে তাজউদ্দীন আহমদকে পরামর্শ দিতেন না পুরাতন ঢাকায় গিয়ে আত্মগোপন করতে। বর্বরেরা কত বর্বর হতে পারে সে-তার অভিজ্ঞতার ভেতর ছিল না, যদিও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আসামি ছিলেন তিনি, এক নম্বর আসামি, আশঙ্কা ছিল ফাঁসির।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও দেখেছি সমানে তিনি লড়েছেন। সমান তেজস্বিতায়। আগের মতোই বলিষ্ঠ তিনি, আগের মতোই তেজস্বী। কিন্তু কার বিরুদ্ধে লড়াই এবার? শত্রু কে? না, পাকিস্তানিরা তখন আর প্রধান ছিল না। যুদ্ধবন্দিদের বিচার হবে বাংলাদেশের মাটিতেই তার এই দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা উদ্দীপ্ত করেছে মানুষকে। কিন্তু সে-বিচার হয়নি। আল-বদর, রাজাকারদের একটা অংশকে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন, সবাইকে অবশ্য নয়, লঘু অপরাধীদের সাধারণ ক্ষমার ভেতর দিয়ে। এরা নয়, এদের জায়গায় তখন এসেছে চোরাচালানি, মজুদদার, মুনাফাখোর। তাদের তিনি সতর্ক করে দিচ্ছেন। তার সেই বলিষ্ঠ তর্জনি বারবার উদ্যত হচ্ছে তাদের লক্ষ্য করে।
আর ছিল বামপন্থিরা, যাদের তিনি দুষ্কৃতকারী বলেছেন সবসময়ে, কখনো কখনো বলেছেন নকশাল, এবং নির্দেশ দিচ্ছেন দেখা মাত্র গুলি করবার। সন্দেহ ছিল না কোনো যে তার দৃষ্টিতে এরাই তখন প্রধান শত্রু, তার এবং বাংলাদেশের। বামের এই কর্মীরা যে আন্তরিক, তারাও যে দেশপ্রেমিক সেই সত্য অন্যে মানলেও মানতে পারত, শেখ মুজিব তার তাঁবেদারদের উসকানিতে মানতে পারেননি। তার পথটা সোজা এবং সেই পথের যে পথিক নয় সে-ই প্রতিপক্ষ। অবশ্য তিনি ত্রিদলীয় ঐক্যজোট ও পরে বাকশাল গঠন করেছিলেন, কিন্তু তা নমনীয় বামকে নিয়ে, দুরন্ত বামের সঙ্গে তার আপসের প্রশ্নই ওঠেনি। পাকিস্তানিদের সঙ্গে যেমন, এদের সঙ্গে তেমনি, তিনি ছিলেন আপসহীন। তখনকার ন্যাপের নেত্রী এবং বর্তমান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী একবার সুন্দর করে বলেছিলেন যে, শেখ মুজিব এক হাত তোলায় সন্তুষ্ট নন, তিনি দু’হাত তুলতে বলেন, তিনি চান সবাই তার কাছে আত্মসমর্পণ করুক। কথাটা সত্য। তিনি আত্মসমর্পণই চাইতেন এবং ন্যাপ-সিপিবি আত্মসমর্পণই করেছিল তার কাছে।
বাম তার শত্রু, যেমন বামের শত্রু তিনি, এটা সহজ হিসাব। কিন্তু বাম তাকে তেমনভাবে আক্রমণ করেনি, বামকে যেমনভাবে তিনি ধারণায় নিয়েছিলেন। তিনি যে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলেন তা বামপন্থিদের হাতে নয়, ডানপন্থিদের হাতেই। বিদেশিরা মন্তব্য করেছে, শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন তার নিজের লোকদের হাতেই। কথাটা মিথ্যা নয়। বাঙালিই তো, বাঙালির হাতই তো রঞ্জিত হয়েছে বাঙালিদের অবিসংবাদিত নেতার রক্তে।
বাঙালির ইতিহাসে শেখ মুজিবের স্থান অনন্য। কোনো বাঙালি যা পারেনি, তিনি তা করে গেছেন, একটি বাংলাভাষী স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি। এই স্থান থেকে তাকে চ্যুত করবে কে?
কিন্তু সেই নেতাকে কেবল বাঙালি নয়, তার কাছের লোকেরাই হত্যা করল। ঘাতকদের মধ্যে এমন লোকেরা ছিল যারা অংশ নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। অন্তত একজন তো মনে হয় খুন করতে গেছে অভিমান বশে, সুবিচার পায়নি বলে তপ্ত হয়ে। সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘাতকদের ওপর রাজনৈতিক ছাতা যারা খুলে ধরেছিল তারা কারা? কারা দিলেন আশ্রয়? খন্দকার মোশতাক কে? তিনি শেখ মুজিবের নিকটতম সহযোগী, গালে চুমো দিতেন প্রকাশ্যে, তার সঙ্গে হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য পাখা ধরে ঝুলে পড়তে চাইতেন আগ্রহাতিশয্যে। তাহেরউদ্দিন ঠাকুর বা শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের তুলনায় মুজিববাদের পক্ষে বড় গলা কার ছিল সেকালে? শেখ মুজিবের আপন লোকের মধ্যেই তার আসল শত্রু ছিল, তিনি জানতেন না, চিনতেন না, শত্রু খুঁজছিলেন তিনি অন্যত্র। দূরে দূরে।
আর যারা আরও বেশি আপন তার, অত্যন্ত কাছের, যাদের পক্ষে প্রশ্নই ওঠে না তার বুকের ওপর অস্ত্র তুলে ধরবার, যাদের কেউ কেউ তার সঙ্গেই নিহত হয়েছেন? ১৫ই আগস্টের সেই ভয়ংকর রাতে, তারা কি মিত্র ছিলেন শেখ মুজিবের? না, ছিলেন না। তারাও শত্রু ছিলেন, মিত্রের ছদ্মবেশে। ইচ্ছে করে নয়, শত্রু হয়ে গিয়েছিলেন নিজেদের অজান্তে, মিত্রের কাজ করতে গিয়ে। তার দলের সুবিধাবাদী চক্র এবং কতিপয় আত্মীয়ের দৌরাত্ম্যের কথা দেশবাসী শুনেছে, টেলিভিশন থাকায় দেখতেও পেয়েছে। দেশে যখন দুর্ভিক্ষ তখন এদের কারও কারও মধ্যে উৎসব শুরু হয়েছে সোনার মুকুট মাথায় পরার।
যৌবনে শেখ মুজিব যখন মন্ত্রী হয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের, তখন গোপালগঞ্জের লোকেরা ঘিরে রাখতে চেয়েছিল তাকে। পারেনি। তিনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে সংগঠনে ফেরত চলে গিয়েছিলেন। এবারও, যখন তিনি অনেক বড়, গোপালগঞ্জের নন, আওয়ামী লীগের নন, এমনকি হওয়ার কথা নয় কেবল তার শ্রেণিরও, তখনো তার আপনজনেরা-পরিবারের, অঞ্চলের, দলের ও শ্রেণির মানুষেরা তাকে আঁকড়ে ধরে রইল। উড়বার কথা যার আকাশে, তার ডানা দুটো আটকা পড়ে গেল কাদায়। ফলে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন তিনি, আর সেই বিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিল ঘাতকেরা। নইলে তাদের সাধ্য কি তার গায়ে হাত তোলে। পাকিস্তানিরা পারেনি, কেননা তারা জানত তার সঙ্গে জনগণ আছে, জনগণের তিনি অবিসংবাদিত নেতা। সেই আসন থেকে টলে পড়েই তিনি নিহত হলেন, নইলে হতেন না।
যারা তাকে বাকশাল গঠন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন, রাজনৈতিকভাবে তারাও তার আপন লোকই। সেই পরামর্শ মিত্র হিসেবে দেওয়া হলেও মিত্রসুলভ ছিল না। কেননা বাকশাল তাকে আরও দূরে সরিয়ে দিল সাধারণ মানুষের কাছ থেকে, সন্দেহ করবার কারণ ঘটল যে, তিনি বিপথ ধরে এগুচ্ছেন, আর পেছাবেন না।
বলা হয়ে থাকে যে, একাত্তরের আগের শেখ মুজিব আর পরের শেখ মুজিব এক নন। বড়ই সত্য সে-কথা। কী ঘটেছে ইতিমধ্যে? না, শত্রু বদলে গেছে। পাকিস্তানিরা নেই, সেই জায়গায় আপনজনেরা এসে গেছে। আপনজনই যার শত্রু তাকে বাঁচায় কে? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ছিল, অবশ্যই ছিল ওঁৎ পেতে, অপেক্ষা করে; কিন্তু ওই সাম্রাজ্যবাদকে প্রবেশের পথ করে দিল কে? কে দিল দরজা খুলে ভেতর থেকে? কে পারে, ভেতরের লোক ছাড়া?
তিনি ইতিহাসে চলে গেলেন ঠিকই, কিন্তু ইহজগতে থাকতে পারলেন না দীর্ঘদিন। দলীয় দুর্বৃত্ত আর আপনজনের কারণে। এরাই তার সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল বামের চেয়ে তো বটেই, ইয়াহিয়া খানের চেয়েও বড় শত্রু, তা এখন তারা যতই বিলাপ করুন না কেন বিভিন্ন সুরে ও স্বরে। মুজিব হত্যায় তাদের দায়মুক্তির উপায় নেই। মুজিবকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কুখ্যাত-তস্করদের কেবল আশকারা দিয়ে ক্ষান্ত নন, তাদের পরিবার রক্ষার ঘোষণা পর্যন্ত দিয়েছেন জাতীয় সংসদে। এই তস্কর-চাটুকারদের নির্মূলের পরিবর্তে আশকারা তার নিজের জন্যও শুভফল আনবে না। পিতৃহত্যার বিচার করতে পেরেছেন। কিন্তু হত্যাকারী মিত্রের ছদ্মবেশী শত্রুদের চিনতে পিতার মতো তিনিও ভুল করছেন।
ক্ষমতা নেতা-নেতৃবৃন্দকে দ্রুত বিচ্ছিন্ন করে দেয় জনগণ থেকে। চাটুকার পরিবেষ্টিত ক্ষমতাবানেরা তা বুঝতে অক্ষম বলেই ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের বেদনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করতে হয়। অতীতের শিক্ষা তাই কেবল অপরিহার্য নয় অনিবার্যও। গোপন শত্রু চিনবার ক্ষেত্রে তো বটেই। তার কন্যা শেখ হাসিনা সম্প্রতি যথার্থই বলেছেন, তার পিতার হত্যার সময় এবং পরপর দলের নেতারা কোথায় ছিলেন? ওই কথার মধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর কারা শত্রু আর কারা মিত্র ছিল। এবং কারা তাকে হত্যা করেছিল।
লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়