আফগানিস্তানের সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যারা কথিত হিজরতে গিয়েছিলেন তারা যাতে কোনোভাবেই দেশে ঢুকতে না পারে সেজন্য দেশের সবকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে বিশেষ সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ। গত সোমবার রাতে সংশ্লিষ্ট বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় এ বিশেষ বার্তা পৌঁছানো হয়। এছাড়া সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবান আফগানিস্তান দখলের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। পুলিশের সব ইউনিটে বিশেষ নির্দেশনাও পাঠানো হয়েছে।
এদিকে দেশের সব সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিও আগের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। বন্দরের ইমিগ্রেশন পার হয়ে কথিত হিজরতকারীদের কেউ কোনোভাবে দেশে ঢুকে পড়লে তাকে যাতে তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তার করা যায় সেজন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে নির্দেশনাও জারি করেছে পুলিশ। এছাড়া আফগানিস্তানের কোনো নাগরিক যাতে বাংলাদেশে আসতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তালেবানের উত্থানে বাংলাদেশে জঙ্গি গোষ্ঠীর মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে গেলেও আদর্শগত দিক থেকে তারা আগের অবস্থানেই রয়েছে। তাই তারা যাতে নতুন করে সংগঠিত হতে না পারে এজন্য সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তবে আফগানিস্তানে তালেবানের উত্থান নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার তেমন কিছু নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, বাংলাদেশ এখন আর আগের অবস্থানে নেই। দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া বিগত সময়ে যখন দেশে জঙ্গিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তখন এতে বিশেষ গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। বর্তমানে সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ রোধে একাধিক কাঠামো তৈরি করেছে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে মুষ্ঠিমেয় জঙ্গিদের সংগঠিত করার চেষ্টা করলে তা সফল হবে না। তবে এ নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু না থাকলেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মনে করছে, আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ তালেবানদের হাতে চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে উগ্রপন্থি কর্মকা-ে জড়িতরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। আর এ কাজে তালেবানের আহ্বানে সাড়া দেওয়া কথিত হিজরতকারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অতীতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তাই এ ব্যাপারে তারা আগেভাগেই সতর্ক থাকতে চায়। তাছাড়া আফগানিস্তান থেকে দেশটির নাগরিকরা দল বেঁধে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। এতে রোহিঙ্গাদের মতোই তাদেরও বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের কিছু নাগরিককে আশ্রয় দিতে অনুরোধ করে বাংলাদেশকে। তবে বাংলাদেশ সেই অনুরোধ সাড়া দেয়নি।
ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামও আফগানফেরতদের বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তালেবানরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেওয়ার পরই ঘোষণা করবে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। তালেবানরা আরও বলবে, আমেরিকাকে যুদ্ধে পরাজিত করে আফগানিস্তানকে স্বাধীন করেছি। এ প্রেক্ষাপটে তরুণদের (যারা জিহাদ করতে চান) ভেতর উৎসাহ তৈরি হবে। এ ঢেউ ভারতীয় উপমহাদেশসহ সব দেশেই লাগবে। এসব নিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, তা দেশের সব লেভেলেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা উচিত। সে অনুযায়ী আমাদের প্রস্তুতি রাখা দরকার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি আছে, তবে যে ঢেউটা শুরু হবে তা মোকাবিলার জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শুধু পুলিশের একার পক্ষে নয়, প্রত্যেক অভিভাবক ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রত্যেকের সহযোগিতা করা উচিত। যদি কারোর সন্তান কিংবা ছাত্র হঠাৎ করে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে যায়, তাহলে তার বিষয়ে দ্রুত পুলিশকে জানানো উচিত।’
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেছেন, ‘আফগানফেরত বাংলাদেশিরাই পরে বাংলাদেশে হরকাতুল জিহাদ (হুজি) ও জেএমবিসহ একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরি করেছিল। এসব জঙ্গিগোষ্ঠী তৈরির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল তারা কাশ্মীরে গিয়ে যুদ্ধ করবে। তারা আফগানিস্তানে যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছে, কাশ্মীরে গিয়ে যুদ্ধ করেও জয়লাভ করবে বলে এমন ধারণা ছিল। এরপর নানাবিধ কারণে তারা কাশ্মীরে সফল হতে পারেনি।’
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বিমান ও স্থলবন্দরে কড়াকড়ির পাশাপাশি আফগানিস্তানে কথিত হিজরতকারীরা যাতে নৌ কিংবা স্থলের চোরাপথে দেশে ঢুকতে না পারে সেজন্য সীমান্তরক্ষীদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি, দেশের প্রতিটি জেলার এসপি ও প্রতিটি ইউনিটকে এ বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে বলা হয়েছে। আফগানফেরত কেউ কোনোভাবে দেশে ঢুকে পড়লে স্থানীয়রা যাতে এ বিষয়টি দ্রুত পুলিশকে অবহিত করে সে ব্যাপারে তৎপরতা চালাতে পুলিশের হাইকমান্ড সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছে। এছাড়া কেউ দীর্ঘদিন ধরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ থাকলে তাদের ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। কথিত হিজরতকারীদের সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরির ব্যাপারে দ্রুত বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গোয়েন্দারা মনে করছে, যাচাই-বাছাই করে সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা গেলে তাদের ধরা সহজ হবে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরগুলোতে এ তালিকা দেওয়া হলে ইমিগ্রেশন কর্র্তৃপক্ষ তাদের আটক করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ প্রসঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফগান নাগরিক ও বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ফেরত আসাদের বিষয়ে সতর্কবার্তা এসেছে। বার্তা পেয়ে আমরা সতর্ক আছি।’
একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন দেশের কয়েকটি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি)। তারা বলেন, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে বিশেষ নির্দেশনা এসেছে। যারা নিখোঁজ আছে তাদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি বিজিবিসহ অন্য সংস্থাগুলোও কাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জঙ্গিদের বিষয়ে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। কেউ যাতে ভুল পথে পা না বাড়ায় সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’
আফগান শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা হাজার মাইল দূরে আছেন। এমনিতেই আমরা পাকিস্তানি শরণার্থী ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিপদে আছি। কাজেই আফগান শরণার্থীর বিষয়টি আমাদের কাছে কোনো প্রসঙ্গই নয়। অনুমতি ছাড়া কেউ যাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আমরা সতর্ক আছি।’
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে যাতে কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি। বিমানবন্দরসহ দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে নানা দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া আইজিপি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন।’
পুলিশ সদর দপ্তরের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আফগানিস্তানে যাওয়া কেউ দেশে প্রবেশ করতে পারবে না। যারা আসবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের নীতি হলো জিরো টলারেন্স।’
জানা গেছে, আফগানিস্তানে কথিত হিজরতকারীদের দেশে প্রবেশ ঠেকাতে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা গত রবিবার থেকে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। গতকাল মঙ্গলবারও তারা বৈঠক করেন। এ ব্যাপারে তারা নিñিদ্র পরিকল্পনা তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি দেশে ঘাপটি মেরে থাকা উগ্রপন্থিদের গতিবিধি গোয়েন্দা নজরদারির আওতায় আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে ছিল, তখন বাংলাদেশ থেকে অনেকে দেশটিতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাদের অনেকে দেশে ফেরার পর জঙ্গি তৎপরতায় জড়িয়েছিলেন। তাদের যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল তা ভাঙতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। জঙ্গিদের হামলায় অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। তাই তারা যাতে আবারও একই ধরনের সুযোগ না পান, সেজন্য আগেভাগেই সতর্ক হয়েছি আমরা।’
এ র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘আফগানফেরতরা দেশে ঢুকতে পারলে তারা ফের দেশের উগ্রপন্থিদের ঐক্যবদ্ধ করে তুলবে। তাদের প্রকাশ্য কার্যকলাপ বন্ধ থাকলেও বেশ আগে থেকেই তারা ইন্টারনেট-সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। এ পরিস্থিতিতে তারা সুযোগ পেলে দেশের জন্য “বিষফোঁড়া” হয়ে উঠবে।’
কূটনীতিকদের অনেকে মনে করেন, এবারের যে তালেবান, তাদের চেহারা ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মতো উগ্রবাদী এবং পুরোপুরি সামরিক নয়। বরং তাদের বর্তমান চেহারায় একটি নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিচয় দেখা যাচ্ছে। তালেবান ধীরে ধীরে বর্তমান বিশ্বের সমসাময়িক বাস্তবতায় একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান সংহত করার উদ্যোগ নেবে, এমনটা আশা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিস্থিতি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) অতিরিক্ত ডিআইজি মনিরুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আফগান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি জঙ্গিদের বিষয়ে আমরা খুবই সতর্ক অবস্থায় আছি। আশির দশকে যারা আফগানিস্তানে গিয়েছিলেন তাদের বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখছি। দেশকে জঙ্গিবাদমুক্ত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি।’