চন্দ্রিমা উদ্যানে বিএনপি-পুলিশ সংঘর্ষ, আহত ৫০

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাওয়া বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে এ ঘটনা ঘটে। পুলিশের টিয়ার শেল, রাবার বুলেট ও লাঠিচার্জে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমান, সদস্য সচিব আমিনুল হক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টিসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে বিএনপি নেতারা দাবি করেছেন, সংঘর্ষে তাদের শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছে।  

নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনার জন্য বিএনপি পুলিশকে দায়ী করে এর প্রতিবাদে আজ বুধবার রাজধানী ঢাকার থানায় থানায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও অঞ্চলের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপি নেতাকর্মীরাই বিনা উসকানিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করেছে।

শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতার কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পর সংঘর্ষের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করে বলেছেন, সরকারের পায়ের নিচে মাটি নেই বলেই বিরোধী দলের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা চালাচ্ছে।

সংঘর্ষের সূত্রপাত যেভাবে : বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা জানানোর পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর চন্দ্রিমা উদ্যানের সামনে ঢাকা মহানগর বিএনপির নবগঠিত দুই কমিটির নেতাদের সঙ্গে কয়েক হাজার কর্মী জড়ো হন। কিন্তু উদ্যানে প্রবেশের সব ফটক বন্ধ ছিল। এ সময় পুলিশও বিএনপি নেতাকর্মীদের উদ্যানে প্রবেশে বাধা দেয়। এতে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করলে আমান উল্লাহ আমান ও আমিনুল হকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে ১১টার দিকে উত্তরের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল নিয়ে জিয়ার কবরমুখী সড়কে যেতে থাকলে পুলিশ ফের কাঁদানে গ্যাস শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। এসময় নেতাকর্মীরা এদিক-ওদিকে ছুটতে থাকেন। পুলিশ ধাওয়া করে তাদের চন্দ্রিমা উদ্যানের সীমানার বাইরে বের করে দেয়। তখন শেরেবাংলা নগর ও ফার্মগেইটসহ আশপাশের রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে বেশকিছু যানবাহনও ভাঙচুর করেন। এ ঘটনার পর চন্দ্রিমা উদ্যানসহ আশেপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

সংঘর্ষ থামার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাস্থলে থাকা শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম মুন্সী সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিল। আগেও দলটির নেতাকর্মীরা এখানে এসে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আজ বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমানের পক্ষের উচ্ছৃঙ্খল কয়েকজন এসে হট্টগোল শুরু করে পুলিশের ওপর চড়াও হন। এতে ৮ থেকে ১০ জন পুলিশ সদস্য আহত হন।’

এ প্রসঙ্গে ডিএমপির তেজগাঁও অঞ্চলের উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, ‘বিএনপির নেতাকর্মীরা বিনা উসকানিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। আত্মরক্ষার্থে আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় আমাদের কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।’

সংঘর্ষ থামার পর জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের নেতাকর্মীরা শত বাধা উপেক্ষা করে মাজারে উপস্থিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা দলের প্রতিষ্ঠাতার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। বর্তমান সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। তারা সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এজন্য তারা পুলিশ দিয়ে নির্যাতন ও গুলি করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই সরকারকে পরাজিত করা সম্ভব হবে। আর এই আন্দোলনে উত্তর ও দক্ষিণ কমিটি নেতৃত্ব দেবে এই প্রত্যাশা আমরা করি।’

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত নেতাকর্মীদের সংখ্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়েছে। এখনো আমরা হিসাব করিনি।’

বিএনপি নেতাকর্মীরা পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়েছেÑএমন অভিযোগের বিষয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা একটি অভিযোগ। মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে মাজারে শান্তিপূর্ণভাবে ফুল দিতে এসেছিলেন। অথচ মাজারে প্রবেশের সব গেট বন্ধ করে রাখা হয়। নেতাকর্মীদের উসকানির তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।’

পরে আমানউল্লাহ আমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা আমাদের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল এবং পুলিশকে অবহিত করা হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ বিনা উসকানিতে হামলা করেছে, গুলি করেছে। আমাদের সদস্য সচিব আমিনুল হককে গুলি করে রক্তাক্ত করেছে।’

জিয়ার কবরে শ্রদ্ধা জানানোর সময় মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম ও সদস্য সচিব রফিকুল আলমসহ দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা।

আজ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ : গতকাল বিকেলে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও দলের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স আজ বুধবার রাজধানীর থানায় থানায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

একই সংবাদ সম্মেলনে আবদুস সালাম অভিযোগ করে বলেন, ‘বেলা ১১টায় জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপির নবগঠিত আহ্বায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দের পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া অনুষ্ঠানের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি ছিল। এই কর্মসূচি পালনের জন্য পুলিশের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী অনুমতিও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, সাড়ে ১১টার কর্মসূচির এক ঘণ্টা আগে থেকেই পুলিশ মাজারের আশেপাশে ব্যারিকেড দিয়ে রাখে।’

গতকালের সংঘর্ষে গুরুতর আহত দুজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই দুজন পুলিশের শটগানের গুলিতে আহত হয়েছেন বলে দাবি বিএনপি নেতাদের। ওই দুইজন হলেন, তেজগাঁও থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান টগর (৪৮) এবং কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ (৬২)। এছাড়া আমান উল্লাহ আমান ও আমিনুল হক ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তি আছেন।