দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন হাইকোর্টের নজরে

টাগবোট কেনা নিয়ে অভিযোগ দুদককে অনুসন্ধানের নির্দেশ

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) টাগবোট (সাহায্যকারী জলযান) না পেয়েই সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ২৩ কোটি ৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধ সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি এস এম মজিবুর রহমানের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ অদেশ দেয়।আদেশে দুদককে অনুসন্ধানে সহযোগিতা করতে চবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে। গতকাল দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ‘টাগবোট না পেয়েই ২৩ কোটি টাকা বিল পরিশোধ’ শীর্ষক প্রকাশিত  প্রতিবেদনটি আমলে নিয়ে এ আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এ নিয়ে পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য আগামী ২৪ অক্টোবর ধার্য করেছে আদালত।

ভার্চুয়ালি দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। সঙ্গে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল আন্না খানম কলি ও মো. সাইফুর রহমান।

অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টাগবোট না পেয়েও ২৩ কোটি টাকা বিল পরিশোধের এ বিষয়টি আদালতের নজরে এসেছে। আদেশে হাইকোর্ট বলেছে, এ বিষয়ে দুদককে অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে। আর অনুসন্ধান কাজে বন্দর কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দুদককে সহযোগিতা করতে বলেছে আদালত। ইতিমধ্যে দুদককে মৌখিকভাবে বিষয়টি অবহিত করেছি। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ আদেশটি পেলে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করবে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আমিন উদ্দিন মানিক বলেন, ‘দুপুরে মামলার শুনানিকালীন টাগবোট সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি আদালত নিজেই উল্লেখ করে। পরে দুদক আইনজীবীকে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। দুই মাসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে বলে আদেশে বলা হয়েছে।’    

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (৩২০০ বিএইচপি) টাগবোট কিনতে ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় চুক্তি করেছিল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেড’র সঙ্গে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৮ সালের ২২ ডিসেম্বরের মধ্যে টাগবোটটি বন্দর কর্র্তৃপক্ষকে সরবরাহের কথা ছিল। কিন্তু কয়েক দফায় সময় বাড়িয়েও তা সরবরাহ করতে পারেনি ওই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে নৌপরিবহন  মন্ত্রণালয় থেকে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ওই  নির্দেশনা পালন না করে উল্টো টাগবোটের দেখা না পেলেও বন্দর কর্র্তৃপক্ষ  ইতিমধ্যে চার ধাপে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে ২৩ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৩ টাকা বিল দিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বন্দর কর্র্তৃপক্ষ টাগবোট কিনতে যে প্রকল্প হাতে নিয়েছিল তার জন্য ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পাস হয়। সেখানেও সংস্থাটি নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ৩ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয় বাড়িয়ে ঠিকাদারের সঙ্গে ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় চুক্তি  করে। এতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়ে টাগবোট সরবরাহ করতে না পারায় ওই মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বর্ধিত ওই মেয়াদের মধ্যেও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান টাগবোট সরবরাহ করতে পারেনি। উল্টো কয়েক দফায় ২৩ কোটি ৮ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিউ ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার্স লিমিটেডকে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা, ২০১৯ সালের ১০ ডিসেম্বর ১ কোটি ৯৬ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪৩ টাকা এবং সর্বশেষ গত বছর ৭ সেপ্টেম্বর ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়। এছাড়া প্রকল্পে টাগবোটটি কেনার জন্য ডিপিপিতে মূল্য ধরা ছিল ৩৪ কোটি ৭২ লাখ টাকা। কিন্তু চুক্তি করা হয়েছে ৩৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়। অথচ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর চুক্তি বাতিল, পারফরম্যান্স সিকিউরিটি বাজেয়াপ্ত করা এবং ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টরা তা না করে ঠিকাদারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করে দিয়েছে। বিধি ভেঙে এমন কার্মকা-ের ফলে চুক্তির সাধারণ শর্তাবলি (জিসিসি) ও পিসিসির ১৮.১ ধারা লংঘন করা হয়েছে। ফলে সরকারের ২৩ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।