কলকাতার প্রগতিশীলতা ও বাঙালি হিন্দুর মন

পুজো আসছে। কলকাতায় এখন করোনা পরিস্থিতি অনেকটাই ভালো। ফলে ইতিমধ্যেই বেশ একটা পুজো আসছে পুজো আসছে ব্যাপার শুরু হয়ে গেছে। আর দুতিন দিন বাদেই টিভি চ্যানেলগুলোতে কাউন্টডাউন আরম্ভ হলো বলে। কে কোন পুজোর সঙ্গে যুক্ত, অমুক মন্ত্রী যদি ওই পুজোর পৃষ্ঠপোষক হন, তাহলে তমুক মন্ত্রী আবার আর একটির। এভাবে ঢাকঢোল বাজিয়ে আপনাকে জানান দেওয়া হবে যে ‘বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব এলো বলে’।

বাঙালি বলতে আমরা পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীলরা অবশ্যই হিন্দু বাঙালি বুঝি। সাতাশ আটাশ শতাংশ মুসলিম আজও অধিকাংশ হিন্দুর চোখে স্রেফ মুসলমান। পথেঘাটে সবসময় শুনবেন, অমুক বাঙালি! মুসলমান নয়! আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর বাবা ছিলেন বিখ্যাত সাহিত্যিক। তো, সেই বাবার ছেলে, আমার বন্ধু ঘটনাচক্রে প্রেমে পড়েছিল এক হিন্দু মেয়ের। বিয়ে ফাইনাল হওয়ার আগে ছেলের পদবি শুনে গম্ভীর গলায় মেয়ের মামা বলে ফেললেন, ছেলেটাকে তো ভালো ভাবতাম। এখন শুনছি ও নাকি মুসলমান! একবার ভোর ভোর মালদায় পৌঁছে এক বন্ধুর বাসার কাছাকাছি গিয়ে ঠিকানাটা কনফার্ম করার জন্য একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই তিনি একটুও দ্বিধা না করে জানালেন, ও অমুকের বাসায় যাবেন তো! যিনি মুসলিম বিয়ে করেছিলেন! সেই বিয়ে হয়েছিল অন্তত তিরিশ বছর আগে। আজ আমার স্কুল টিচার সেই বন্ধুর বয়েস ষাট পেরিয়েছে। কিন্তু যৌবনে মুসলিম নারীর সঙ্গে বিয়েই তাকে কিছু লোকের কাছে আলাদা করে চিহ্নিত করে রেখেছে।

কখনো সখনো আমাদের চারপাশের এই উচ্চবর্গীয় হিন্দু মন বোঝার চেষ্টা করি। কিন্তু তল পাই না। ওপর ওপর সবাই প্রগতিশীল। ঈদে মুসলিম বন্ধুর বাড়িতে যাই। বিরিয়ানি খাওয়ার ছবি পোস্ট করি। আড়ালে আবডালে শুধু ফিসফিসিয়ে বলি, যাই বলো ওরা কিন্তু খুব গোঁড়া। ইদানীং আবার কলকাতায় নতুন এক ট্যুরিজমের চল হয়েছে। পরস্পরকে চেনার চেষ্টায় দল বেঁধে মুসলিম মহল্লায় পড়শিকে নিয়ে সংখ্যালঘু জীবনযাত্রা ঠিক কেমন তা সংখ্যাগুরুকে চেনানোর চেষ্টা। ভালো। কিন্তু গাড়ি করে গিয়ে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় আর কতটুকু একটা সম্প্রদায়ের যাপন চেনা যায়! আসলে সত্যিই কি আমরা চিনতে চাই-ই! এত বছর পাশাপাশি থেকেও কেউ আমরা কাউকে চিনলাম না। বলা ভালো চিনতে চাইলাম না। আমরা উদার। ধর্মনিরপেক্ষ বলি বটে। অথচ আমাদের টিভি চ্যানেলে চ্যানেলে পুজো, রথযাত্রা থেকে জন্মাষ্টমী সব পরবে যেভাবে ভক্তিরসের আধিক্য দেখি, তার ধারেকাছে কোনোদিনই পৌঁছতে পারবে না কোনো মুসলিম উৎসব। ঈদ বা মহররমের পরের দিন বহুল প্রচারিত দৈনিক কাগজের ভেতরের পাতায় চোখে পড়বে না এমন হরফে ছোট্ট খবর থাকে, শান্তিতে কাটল ঈদ অথবা মহররম। যেন মুসলমান পরবে অশান্তি হওয়াটাই স্বাভাবিক। হয়নি তাই বাঁচোয়া।

অনেক সময় ট্যাক্সিওয়ালা বা উবার ড্রাইভার কেউই একটু সন্ধ্যে হলেই খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ যেতে চায় না। মুসলিম মহল্লা বলে। অনেক প্রগতিবাদীকেও বলতে শুনেছি ওদিকে রাতের দিকে না যাওয়াই ভালো। কত জনকে লিখতে দেখেছি মেটেবুরুজে পাকিস্তানের পতাকা ওড়ে। একবার মালদার কালিয়াচকে যাচ্ছি। শ্যুটিং করতে। গাড়ি এগোচ্ছে। সাধারণ মফস্বল। ছোট চায়ের দোকান। লোকজন আড্ডা মারছে। একটা ক্লাব। দেয়ালে আবছা হয়ে থাকা গনি খান চৌধুরীকে ভোট দেওয়ার আকুতি। এক বৃদ্ধ গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। আমার ক্যামেরাম্যান খুব চাপা গলায় গোপন খবর দেওয়ার গলায় জানাল, জায়গাটা মুসলিম অধ্যুষিত। জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে বুঝলি! ও ফেলু মিত্তিরের ভঙ্গিতে অত্যন্ত গর্বিত মেজাজে বলে উঠল, চোখ বাবা চোখ। এত বছর পেশায় আছি ঠিক ধরতে পারি। তারপরে যা বলল তাই-ই বলেন লোকজন মেটেবুরুজে গেলেও। এক হাত অন্তর লাইট পোস্ট ও বাড়ির ছাদে সবুজ রঙের পতাকা উড়ছিল। তাই দেখে আমার স্নেহের ক্যামেরাম্যানের ধারণা হয়েছে এ নির্ঘাত পাকিস্তানের।

কোথাও কোনো ওয়াজ মেহফিলের বিবর্ণ হয়ে যাওয়া পতাকার রংও কেমন সাম্প্রদায়িক চেহারা নেয় তা বলে বোঝানো যাবে না। ধরেই নেওয়া হয় যে সবুজ রঙের পতাকা আর পাকিস্তান সমার্থক। আর মুসলিম মানেই স্বাধীনতার এত বছর বাদেও সে ‘দেশদ্রোহী’। পাকিস্তান সমর্থক। মেটেবুরুজে নাকি পুলিশও ঢুকতে পারে না। অথচ ছোট্ট এক জনপদে, লোকসংখ্যা মাত্র কয়েক লাখ, তাকে ঘিরে আছে পাঁচ পাঁচটা থানা আর দু দুটো পুলিশ আউটপোস্ট। যা কলকাতার কোত্থাও নেই। আসলে এদেশের সরকার, প্রশাসনের অবচেতনেও হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো না কোনোভাবে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর চরম বিদ্বেষ।

ইদানীং প্রায় যাই আক্রা, চটা মহেশতলা আর মেটেবুরুজে। কত কত আখ্যান। কীভাবে মুসলিম এক বিত্তবানের জমিতে একদিন গড়ে উঠেছিল পৃথিবী বিখ্যাত বাটা কোম্পানি, কীভাবে চাষিবাসী এলাকায় একদা কমিউনিস্ট আন্দোলন জন্ম নিয়েছিল। আর বর্ণময় মেটেবুরুজের আতিথেয়তার তুলনা নেই। ওখানে গেলে আপনি শুধু আওধের নির্বাসিত নবাব ওয়াজিদ আলী শাহর রমরমা নয়, জানতে পারবেন দুশো বছরের বেশি ওখানকার বাসিন্দে মুসলমান দর্জিদের কথা। এইসব চর্চা বাবু ভদ্রলোকদের অভিধানে নেই। তারা সতত ছিদ্র খুঁজতে ব্যস্ত। প্রগতিশীল আমাদের টিভি চ্যানেলে সবসময় দেব-দেবীর বন্দনা। রোজ নিয়মিত হয়েই চলেছে হয় বাবা লোকনাথ, কিংবা ঠাকুর রামকৃষ্ণ, রাণী রাসমণি, বামাক্ষ্যাপা অথবা মা মনসা বা হনুমান চালিশা। রামায়ণ, মহাভারত তো আছেই।

সরাসরি দেব মাহাত্ম্য বাদ দিন। তথাকথিত সামাজিক সিরিয়াল দেখুন। সেখানেও ঠাকুর মাহাত্ম্যই শেষ কথা। আইসিইউতে থাকা পেশেন্ট নিমেষে সুস্থ হয়ে যান স্রেফ ঠাকুরের মহিমায়। আর আমরা রেনেসাঁর উত্তরসূরিরা উদার। তাই শহর কলকাতায় অনেক জায়গায় স্রেফ অন্য সম্প্রদায়ের লোক বাড়ি ভাড়া পায় না এই একুশ শতকেও।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা, লেখক ও কলামনিস্ট

dastidarsoumitra786@gmail.com