বন্ধ দেশে ডিউটির বহর!

কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়ে গৃহবন্দি সময়টাতে দুই মাস ২৫০ ঘণ্টা করে ওভার টাইমের বিল তুলেছেন মন্ত্রী-সচিবদের গাড়িচালকরা। করোনাভাইরাসের অজানা আতঙ্কে ২০২০ সালের এপ্রিল ও মে মাসে সবকিছু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অথচ ওভারটাইমের বিল বলছে, ঢাকার রাস্তা দাপিয়ে বেড়িয়েছে মন্ত্রী সচিবদের গাড়ি! হুইপ-সংসদীয় কমিটির সভাপতিরা এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, তাদের বহনকারী গাড়িচালক দৈনিক ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়েও কাজ শেষ করতে পারেননি! তারা ভিআইপিদের নিয়ে নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে দৈনিক আরও ১১ ঘণ্টা করে গাড়ি চালিয়েছেন! এতে ড্রাইভারদের দৈনিক কর্মঘণ্টা দাঁড়ায় ১৯ ঘণ্টা! স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা-উপনেতা, উপদেষ্টা, বিভিন্ন কমিশনের সদস্যরাও গাড়ি নিয়ে রাস্তায় ছিলেন! বাদ যাননি মন্ত্রী-সচিবের পিএস, মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অতিরিক্ত সচিবরাও!

সরকারের ও প্রশাসনের সূত্র বলেছে, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহনপুলের ৩২৮ ড্রাইভার প্রত্যেকেই ২৫০ ঘণ্টা করে ওভারটাইম করেছেন। এই অবস্থা শুধু এপ্রিলে নয়, মে এবং জুন মাসেও ঘটেছে। অথচ ওই সময় রাস্তায় যানবাহন এত বেশি কমে গিয়েছিল যে, দিনে-দুপুরেও গা ছমছম করত। যানবাহন না থাকায় বা মানুষের পা না পড়ায় রাস্তার মোড়ে, রোড ডিভাইডারের মধ্যে জমে থাকা ধুলো-বালিতে জন্মেছিল কচি নরম ঘাস। আমলারা তো বটেই, রাজনীতিবিদরাও ঘরে ছিলেন। ঘরবন্দি ছিলেন তাদের গাড়িচালকরাও।

ওই সময় সাধারণ ছুটি থাকলেও ভিআইপিদের গাড়ির ড্রাইভাররা বেতনের সঙ্গে ওভারটাইমের ভাতা তুলেছেন। দৈনিক আট ঘণ্টা হিসেবে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি বাদ দিয়ে মাসে মোট কর্মঘণ্টা হয় ১৭৬ ঘণ্টা। অথচ প্রতিটি ভিআইপির ড্রাইভার ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে ২৫০ ঘণ্টা করে ওভারটাইমের বিল তুলেছেন।

সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের পরিবহন কমিশনার মো. মীজানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবহনপুলের অধিকাংশ ড্রাইভারই গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসের ওভারটাইমের বিল নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তদন্ত করছে। এ বিষয়ে কিছু জানতে হলে তদন্ত কমিটির প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করাই শ্রেয়।’

পুরো ঘটনাটি তদন্ত করার জন্য সরকার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যুগ্ম সচিব আবু আহমদ সিদ্দীকীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। কমিটির অপর দুই সদস্য উপসচিব কাজী মো. সাইফুল ইসলাম ও মোহাম্মদ শামীম সোহেল।  আবু আহমদ সিদ্দীকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করছি। অভিযুক্তদের বক্তব্য শুনছি। যারা এর অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত তাদের কথাও শুনছি।’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্টদের শুনানি শেষ করেছে। প্রতিবেদন লেখার কাজ শেষ করে এই সপ্তাহেই প্রতিবেদন উচ্চ আদালতে জমা দেওয়া হবে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, ড্রাইভাররা ২০২০ সালের এপ্রিল  মাসের ওভারটাইম জমা দেওয়ার পরই বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা বৈঠক করেছেন। ওভারটাইম না দেওয়া হলে এর পরিণতি মন্দ হতে পারেএমনটা ভেবেই শেষ পর্যন্ত তাদের ওভারটাইমের বিল পরিশোধ করা হয়। 

বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের যানবাহন সেক্টরে নানা ধরনের অনিয়ম রয়েছে। তার মধ্যে ওভারটাইম একটি ছোট্ট ঘটনা মাত্র। পরিবহনপুলের বেশিরভাগ ড্রাইভার প্রতিমাসে ২৫০ ঘণ্টার ওভারটাইম নেন। এক মাসের ২২ কর্মদিবসে কর্মঘণ্টা হয় ১৭৬ ঘণ্টা। সেখানে তারা ২৫০ ঘণ্টার ওভারটাইম করেন। এই হিসাবে তারা দিনে ১৯ ঘণ্টা কাজ করেন। এখানে শুধু ড্রাইভারদের ওভারটাইমই বিষয় নয়। ২৫০ ঘণ্টার ওভারটাইমের সঙ্গে জ্বালানি, লুব্রিকেন্ট, রক্ষণাবেক্ষণ খরচও জড়িত।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী ড. ইফতেখারুজ্জামান দেশ রপান্তরকে বলেন, ‘ড্রাইভাররা যা করেছেন তা জাতির সঙ্গে প্রতারণা। এই প্রতারণার সঙ্গে যারা অনুমোদন দেন তারাও সমানভাবে জড়িত। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া দরকার। একজন ড্রাইভারের ২৫০ ঘণ্টার ওভারটাইম তাও মহামারীর নির্দিষ্ট সময়গুলোতেএটা অবাস্তব বিষয়। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দরকার।’

চীনের উহান থেকে শুরু হয়েছিল করোনাভাইরাস। বাংলাদেশে আক্রান্ত ব্যক্তির কথা প্রথম জানা যায় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। দেশে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে শনাক্তের ১০ দিন পর, অর্থাৎ ১৮ মার্চ। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সরকার ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করে। পরে বিভিন্ন আদেশের মাধ্যমে সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে নানা শর্ত আরোপ ও শিথিল করা হয়। টানা ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর ২০২০ সালের ৩১ মে অফিস খোলে। এরপর আবার কঠোর বিধিনিষেধে যায় সরকার। 

এপ্রিলে কোন কোন ড্রাইভার ওভারটাইম ভাতা তুলেছেন, তারা কাদের গাড়ি চালিয়েছেনতা জানতে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হয়। শিক্ষামন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়ে মো. রুহুল আমিন ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা ওভারটাইম বিল তুলেছেন। জাতীয় সংসদের হুইপের গাড়ি চালিয়ে একই পরিমাণ ওভারটাইমের বিল তুলেছেন মো. ইউসুফ। শিল্পমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. গোলাম মোস্তফা। এসব গাড়ি চালকরা প্রত্যেকেই ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা করে ওভারটাইমের বিল তুলেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন খাজা মো. মহিউদ্দীন। আইন সচিবের গাড়ি চালিয়েছেন সুজিত চন্দ্র ঘোষ। হুইপ ইকবালুর রহিমের গাড়ি চালিয়েছেন মো. দুলাল খান। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. সুরুজ্জামান। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আবদুর রহমান ও মো. বজলুর রহমান। শিক্ষা উপমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন জলিলুর রহমান। জাতীয় সংসদের উপনেতার গাড়ি চালিয়েছেন মো. ছিদ্দিকুর রহমান। পরিকল্পনা মন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আ. হান্নান। বাণিজ্যমন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. ইউসুফ আলী। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. শহীদুল ইসলাম আকন্দ। বিরোধীদলীয় উপনেতার গাড়ি চালিয়েছেন গোলাম মোস্তফা মঞ্জু। পরিকল্পনা কমিশনের ভারপ্রাপ্ত সচিবের গাড়ি চালিয়েছেন মো. জাফর ইকবাল। সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আ. রশিদ শেখ। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন ইসমাইল হোসেন সারোয়ার। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আলী আকবর। নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আবুল হাসেম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. মনসুর মিয়া। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন হাজী আ. মমিন মুন্সি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. নুর করিম। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. স্বপন মিয়া, স্পিকারের গাড়ি চালিয়েছেন শিবু রঞ্জন রায়। রেলপথমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. আশিক রহমান। চিফ হুইপের গাড়ি চালিয়েছেন মো. আ. কুদ্দুছ। ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যানের গাড়ি চালিয়েছেন মো. বাকীউল আলম। বন ও পরিবেশমন্ত্রীর গাড়ি চালিয়েছেন মো. ফজলুল করিম। হুইপের পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. আরশাদ উল্লাহ। তারা সবাই মাসে আড়াইশ ঘণ্টা হিসাবে মোট বেতনের একটা অংশ ওভারটাইম পেয়েছিলেন।

সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের গাড়ি চালিয়ে ওভারটাইম নিয়েছেন আনোয়ার হোসেন। বিরোধীদলীয় নেতার পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. জাহিদুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন মো. সুমন। শিক্ষা উপমন্ত্রীর পিএসের গাড়ি চালিয়েছেন আতিকুর রহমান তুহিন।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের ড্রাইভার সৈয়দ হোসেন ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা ওভারটাইম ভাতা পেয়েছেন। নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানের গাড়ি চালিয়ে আবুল কালাম খান ১৭ হাজার ৯৬০ টাকা বিল তুলেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের গাড়ি চালিয়ে মো. মনিরুল ইসলাম ১৫ হাজার ১১০ টাকা বিল তুলেছেন। মানবাধিকার কমিশনের একজন সদস্যের গাড়ি চালিয়ে মো. হাফিজুর রহমান ১৫ হাজার ১১০ টাকা বিল তুলেছেন। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের গাড়ি চালিয়ে মো. তানভিরুল হক ১৫ হাজার ১১০ টাকা বিল তুলেছেন। আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের গাড়ি চালিয়ে মো. কামরুজ্জামান ১৭ হাজার ৯৬০ টাকা বিল তুলেছেন। পিআরএলে চলে গেছেন এমন এক অতিরিক্ত সচিবের গাড়ি চালিয়ে আলমগীর সরকার ২৪ হাজার ৮৫০ টাকা ওভারটাইম বিল তুলেছেন।

একই মাসে অর্থাৎ এপ্রিলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২৯ জন ড্রাইভারকে প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত দেখানো হয়েছে। ১৯ জন ড্রাইভারকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত দেখানো হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত দেখানো হয়েছে ৫ জন ড্রাইভারকে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ড্রাইভার রিয়াজুল ইসলামকে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত দেখানো হয়েছে। পরিবহনপুলের ১১ ড্রাইভারকে প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত দেখানো হয়েছে। এই প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকার অর্থ কী জানতে চাইলে পরিবহনপুলের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে জানান, একটি মন্ত্রণালয়ে বা বিভাগে মন্ত্রী, সচিব, পিএস ছাড়াও অনেক কর্মকর্তা কাজ করেন। প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ততার নামে তাদের আনা-নেওয়াকে বোঝানো হয়েছে। এখানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সহকারি সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্ম সচিবরাও রয়েছেন। 

এছাড়াও যাদের নামে বরাদ্দকৃত গাড়ি পরিবহনপুলের ড্রাইভাররা চালিয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী, বাণিজ্য সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীর পিএস, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর পিএস, বাণিজ্যমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিব, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর পিএস, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্য সমন্বয়ক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী, উপনেতার পিএস, ধর্মবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পিএস, জনপ্রশাসন সচিব (পিআরএল), বিদ্যুৎ ও জ¦ালানির উপদেষ্টার পিএস, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর পিএস, ডেপুটি স্পিকারের পিএস, স্পিকারের দপ্তরের গাড়ি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী, শিল্প প্রতিমন্ত্রীর পিএস, বিমান সচিবের পিএস, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী, অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অ্যাডিশনাল এসপি, কৃষিমন্ত্রীর পিএস, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর পিএস।

২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল সরকারি পরিবহনপুল করোনাভাইরাস চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য চালকসহ চারটি মাইক্রোবাস বরাদ্দ করে। এই ড্রাইভাররা হলেন জয়দেব দাস, মো. রায়হান উদ্দিন, মো. মনসুর মিয়া এবং মো. সুমন। এই চার ড্রাইভারকে জেলা প্রশাসক ঢাকার অধীনে ন্যস্ত করার জন্য পুরিবহনপুল একটি আদেশ করেছে। সেই আদেশে এসব ড্রাইভারের মোবাইল ফোন নম্বর ও গাড়ির নম্বরও উল্লেখ রয়েছে। আদেশপত্রে বলা হয়েছিল, গাড়িচালকদের ১৯ এপ্রিল সাড়ে ৮টায় এনডিসি নেজারত ডেপুটি কালেকটরের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য।

সরকারি পরিবহনপুলের সাড়ে তিনশ চালকের মধ্যে এপ্রিল মাসে ওভারটাইম করেছেন ৩২৮ জন। সুযোগ থাকার পরও ওভারটাইমের বিল নেননি ১৮ জন গাড়িচালক। ওভারটাইমের বিল না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে এই ১৮ জনের মধ্যে একজন ড্রাইভার জানান, আমার বিবেক সাড়া দেয়নি। এমনিতেই ঘরে বসে বেতন ও অন্যান্য ভাতা নিয়েছি। এটা নিতেই হবে। কারণ বেতন-ভাতা না নিলে আমরা খাব কী? কিন্তু ওভারটাইমের বিল নেব কীভাবে? আমরাতো ওভারটাইম করিনি। তাহলে এই বিল কিসেরএই তো প্রশ্ন। এখানে শুধু গাড়িচালকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ সরকার উপসচিব থেকে ওপরের সব কর্মকর্তাকে গাড়ি কেনার জন্য বিনা সুদে ঋণ দিয়েছে। এসব গাড়ির জ¦ালানি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার করে টাকা দিয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে যদি সব কিছু বন্ধই থাকে, তাহলে তাদের গাড়িও চলেনি। সরকার কি পারবে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তাদের ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য যে জ¦ালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বিল নিয়েছেন সেই টাকা ফেরত নিতে? যদি সেটা না পারে, তাহলে ড্রাইভারদের টাকায় হস্তক্ষেপ করা উচিত না।

সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়িসেবা দিয়ে থাকে। কিন্তু গাড়িসেবা নগদায়ন নীতির ফলে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আর পরিবহনপুলের গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু স্পিকার, মন্ত্রী, হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা, সচিব, বিভিন্ন কমিশনের সদস্যদের সার্বক্ষণিক গাড়িসেবা দিয়ে থাকে। সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর গাড়িচালক কল্যাণ সমিতির দপ্তর সম্পাদক আবদুস সামাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারের একটা নীতিমালা রয়েছে। সেটা অনুযায়ী বেসিক ধরে আড়াইশ ঘণ্টা ওভারটাইম দেয়। এর বেশি হলেও আড়াইশ ঘণ্টাই দেয়। ভিআইপিরা সপ্তাহে প্রতিদিনই মুভ করেন। এ কারণে তাদের সঙ্গে ডিউটি করলে এই ওভারটাইম পাওয়া যায়। ওই লকডাউনের দিনগুলোতে প্রথম তিন-চার দিন হয়তো গাড়ি চলেনি। কিন্তু পরে তো ঠিকই চলেছে। সরকার স্ট্যান্ডবাই থাকার আদেশও করেছে। এখানো কোনো অনিয়ম হয়নি।’

যেভাবে আলোর মুখ দেখল

২০২০ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত করোনাভাইরাসজনিত সাধারণ ছুটির সময় যানবাহন অধিদপ্তরের গাড়িচালকরা সরকারি কোষাগার থেকে ওভারটাইম তুলেছেন। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট করে ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন। রিটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ৬ কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়। ওভারটাইম প্রদান এবং এই অর্থ প্রদান প্রক্রিয়ার বিষয়টি সরকারকে তদন্তের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।  এ নির্দেশনার প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবু আহমদ সিদ্দীকীকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

ল অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের ব্যারিস্টার হুমায়ূন কবীর পল্লব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত সময় চালানোর জন্য সরকারের বিধিবিধান রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে মাসে সর্বোচ্চ ২৫০ ঘণ্টা ওভারটাইাম করা যাবে। সবসময়ই সর্বোচ্চ পরিমাণ ওভারটাইম হবে, বিষয়টি এমন নয়। এ সেক্টরে একটা অনিয়ম চলছিল। স্বাভাবিক সময় তা ধরা যায়নি। কিন্তু করোনাভাইরাসের অস্বাভাবিক সময়ে তা ধরা পড়েছে। এ কারণেই বিষয়টি আমরা উচ্চ আদালতের নজরে এনেছি।’