দেশের প্রথম ‘স্টিল আর্চ ব্রিজ’ নির্মাণ হতে যাচ্ছে ময়মনসিংহের কেওয়াটখালীস্থ ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর। এই সেতুর বৈশিষ্ট্য হলো নদের দু পাশে পিলার থাকলেও মাঝে কোনো পিলার বসানো হয় না। অনেকটা ধনুকের মতো এই ধরনের ব্রিজ দেখতে পাওয়া যায় অস্ট্রেলিয়ার শহর সিডনির হার্বারে। সিডনির হার্বারের আদলে বাংলাদেশে এই সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা, যার মধ্যে এশিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) ঋণ হিসেবে দেবে ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে।
আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘ময়মনসিংহে কেওয়াটখালী সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি উপস্থাপন করা হচ্ছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করবেন। সভায় গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হবেন তিনি। সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান সভাসংক্রান্ত বিস্তারিত সাংবাদিকদের ব্রিফিং করবেন। অনুমোদন পেলে চলতি বছর হতে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।
প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ৩২০ মিটার স্টিল আর্চ ব্রিজ নির্মাণ, ৭৮০ মিটার অ্যাপ্রোচ সড়ক, ২৪০ মিটার রেলওয়ে ওভারপাস, ৫৫১ মিটার সড়ক ওভারপাস, ৬.২০ কিলোমিটার এসএমভিটিসহ ৪ লেনের মহাসড়ক নির্মাণ এবং একটি টোল প্লাজা নির্মাণ। দেশে প্রথমবারের মতো এমন ব্রিজ নির্মাণ বিধায় পরামর্শক খাতে ৬০ কোটি টাকার মতো ব্যয় হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে ময়মনসিংহ বিভাগের আওতাধীন উত্তরাঞ্চলের জেলাসহ এ অঞ্চলের স্থলবন্দর, ইপিজেড এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে রাজধানী ঢাকার নিরাপদ, উন্নত ও ব্যয়সাশ্রয়ী যোগাযোগ স্থাপন করা হবে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মামুন আল রশীদ বলেন, এটি দেশের প্রথম স্টিল আর্চ সেতু। বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর কারণে ময়মনসিংহ শহরে বেশিরভাগ সময় জ্যাম লেগে থাকে। এটি বাস্তবায়িত হলে ময়মনসিংহ বিভাগের কয়েকটি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার নিরাপদ ও উন্নত যোগাযোগ স্থাপন হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের জন্য একনেক সভার আগামী বৈঠকে (মঙ্গলবার) উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তা জানান, ময়মনসিংহ শহরটি ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। নদের অপর পাশে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও শেরপুর জেলা এবং ময়মনসিংহ জেলার ফুলপুর, হালুয়াঘাট এবং তারাকান্দা উপজেলা অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর বিদ্যমান শম্ভুগঞ্জ সেতুটি এই অঞ্চলের সঙ্গে ময়মনসিংহ জেলা সদরসহ রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। ফলে অসংখ্য যানবাহন সেতুর ওপর দিয়ে অতিক্রম করে।
পাশাপাশি ময়মনসিংহ বিভাগে তিনটি বড় স্থলবন্দর অবস্থিত। স্থলবন্দরগুলো হলো নেত্রকোনা জেলার বিজয়পুর, শেরপুর জেলার নাকুগাঁও এবং ময়মনসিংহ জেলার গোবরাকুড়া (হালুয়াঘাট) স্থলবন্দর। এ স্থলবন্দরগুলো দিয়ে প্রতিবছর ভারত থেকে পাথর ও কয়লা আমদানি করা হয়, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন করা হয়ে থাকে।
উল্লেখ্য, ময়মনসিংহকে বিভাগ এবং ময়মনসিংহ পৌরসভাকে সিটি করপোরেশন হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকেই শহরের শম্ভুগঞ্জ পাটগুদাম ব্রিজে যানজট সবসময় লেগে থাকে। সেতুটির চার রাস্তা মোড়ের একপাশে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থিত। ফলে শহরের বিভিন্ন দিক থেকে ট্রাফিক এসে সেতুটিতে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি করে। ময়মনসিংহ শহরের নিকট ব্রহ্মপুত্রের অপর পাশে নতুন শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে এই এলাকা হতে ভবিষ্যতে অসংখ্য ট্রাফিক তৈরি হবে। এখানে বিকল্প একটি সেতু নির্মাণ করা না হলে শহরে বসবাস করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।
এছাড়াও স্থলবন্দরের যোগাযোগ রক্ষা এবং শহরের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানের যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। ফলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। এই অবস্থায় নতুন সেতুটি নির্মাণ সম্পন্ন হলে নতুন নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে।