এডিসন’স ডিজিজ

মানুষের বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির প্রতি শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়ের জন্য বিভিন্ন হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয়। বৃক্কের ওপরের প্রান্তে অবস্থিত এড্রেনাল গ্রন্থি থেকেও এ রকম প্রাণরক্ষাকারী বিবিধ গুরুত্বপূর্ণ হরমোন শরীরে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। মিনারেলোকর্টিকয়েড এবং গ্লুকোকর্টিকয়েড এমনই দুটি হরমোন, যারা এড্রেনাল গ্রন্থির বাইরের দিকে অবস্থিত কর্টেক্স থেকে উৎপন্ন হয়। মিনারেলোকর্টিকয়েড ও গ্লুকোকর্টিকয়েডের ভেতরে যেসব হরমোনকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়, তার মধ্যে যথাক্রমে এল্ডোস্টেরন ও কর্টিসল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এডিসন’স ডিজিজ হরমোন উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন একটি বিরল ব্যাধি যেখানে এড্রেনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত এই কর্টিসল ও এল্ডোস্টেরোন হরমোনের উৎপাদন সঠিক পরিমাণে সংঘটিত হয় না। রোগটি সব বয়সের মানুষের মধ্যেই দেখা দিতে পারে এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকেই সমানভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যখন এড্রেনাল গ্রন্থির কর্টেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনই সাধারণত এই রোগটি হয়ে থাকে। এড্রেনাল গ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা ঠিকমতো হরমোন উৎপাদনে ব্যর্থ হয়। ফলে এডিসন’স ডিজিজ বা প্রাইমারি এড্রেনোকর্টিকাল ফেইলিউর ঘটে থাকে। বিভিন্ন অটোইমিউন রোগের কারণে সৃষ্ট অটোইমিউন এড্রেনালাইটিস, এড্রেনাল গ্ল্যান্ডের ভেতরে রক্তপাত, শরীরের অন্যান্য অঙ্গে সৃষ্ট ক্যানসার কোষ এড্রেনাল গ্রন্থিতে ছড়িয়ে পড়লে, এড্রেনাল টিউবারকুলোসিস বা যক্ষ্মারোগ হলে, বিভিন্ন ছত্রাক, ভাইরাস কিংবা পরজীবী আর ব্যাকটেরিয়ার দরুন এড্রেনাল গ্রন্থিতে সংক্রমণ হলে কিংবা মেনিনগোকক্কাল মেনিনজাইটিসের জটিলতা হিসেবে ওয়াটারহাউজ ফ্রেডেরিকসেন সিনড্রোমের ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি এডিসন’স ডিজিজে ভুগতে পারেন।

লক্ষণ : এডিসন’স ডিজিজের উপসর্গগুলো সাধারণত খুবই ধীরে ধীরে দেখা দেয়। অত্যধিক ক্লান্তি, ক্রমাগত ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামান্দ্য, নিম্ন রক্তচাপ, রক্তে শর্করার পরিমাণ অনেক কমে যাওয়া, খাদ্যে লবণ গ্রহণের অধিক, বারবার বমি হওয়া, হাইপারপিগমেন্টেশন বা মুখের ভেতরে তালুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে কালচে বর্ণ ধারণ করা, বিষন্নতা, পেটে ব্যথা, পেশি বা অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, যৌন দুর্বলতা ও অনীহা, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ এই রোগের প্রধান লক্ষণ। সাধারণত এডিসন’স ডিজিজ প্রথম ধাপেই ধরা খুবই কঠিন। কারও অত্যধিক দুর্বলতা বা গালের ভেতরে হাইপারপিগমেন্টেশন দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ হঠাৎ কোনো অসুস্থতায় বা শারীরিক ও মানসিক চাপযুক্ত পরিস্থিতিতে এডিসন’স রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়ে এডিসোনিয়ান ক্রাইসিসের উৎপত্তি হতে পারে, যা একটি প্রাণঘাতী অবস্থা। রক্তে এল্ডোস্টেরন এবং কর্টিসলের মাত্রা পরিমাপ করে, রক্তে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের পরিমাণ নির্ণয় করে, অ্যাড্রেনোকর্টিকোট্রফিক হরমোন স্টিমুলেশন টেস্টের মাধ্যমে, পেটের এক্স-রে কিংবা আল্ট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটির উপস্থিতি নির্ণয় করা যায়।

রোগটির চিকিৎসা হিসেবে প্রয়োজন অনুসারে ওরাল কিংবা প্যারেন্টেরাল হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি প্রয়োগ করা যায়। ওরাল হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি এড্রেনাল গ্ল্যান্ডের উৎপাদন করা হরমোনের পরিবর্তে কাজ করে। এ ক্ষেত্রে স্টেরয়েড বা মিনারেলোকর্টিকয়েড ট্যাবলেট প্রয়োগ বা শিরাপথে হাইড্রোকর্টিসোন ইনজেকশন প্রয়োগের প্রয়োজনও হতে পারে।