গণহত্যার মুখে মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এজন্য বিশ^ব্যাপী প্রশংসিতও হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এটা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, রোহিঙ্গা সংকটই বর্তমান বিশে^র একক বৃহত্তম উদ্বাস্তু সংকট। ভুটানের মোট জনসংখ্যার চেয়ে বেশি একটি জনগোষ্ঠীর বোঝা আমাদের বইতে হচ্ছে। ভুটানের জনসংখ্যা ৮ লাখ। আর বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ আর কতদিন এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আশ্রয় এবং ভরণ-পোষণের দায়িত্ব পালন করে যাবে? চার বছর পেরিয়ে আজ এই সংকট পঞ্চম বছরে পা দিলেও এতদিনে একজন রোহিঙ্গারও প্রত্যাবাসন হয়নি। অন্যদিকে, বিগত বছরগুলোতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীগুলো ক্রমাগতই যেন পিঠটান দিচ্ছে। এমনকি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য তাদের প্রতিশ্রুত সহায়তাও দিচ্ছে না। এরই মধ্যে সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে পুরোপুরি সামরিক শাসন শুরু হওয়া এবং সর্বশেষ আফগানিস্তানে তালেবানি শাসনের সংকটের কারণে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজরও এখন ভিন্ন দিকে। এই পরিস্থিতি যেমন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে তেমনি প্রশ্ন উঠছে যে, বাংলাদেশ কি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিত্রহীন হয়ে পড়েছে?
পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো জাতিগত নিধনযজ্ঞে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, ধর্ষণ ও গণহত্যার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর তিন মাসের মাথায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার সরকারের মধ্যে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফার একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা দলিল স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো সমালোচনা থাকুক বা না থাকুক, এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এখনো একটুও ফল বয়ে আনেনি। সর্বশেষ চীনের মধ্যস্থতায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার আর চীনের পররাষ্ট্র সচিবদের অংশগ্রহণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে ত্রিপক্ষীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারকে ৮ লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে। এর বিপরীতে মিয়ানমার এ যাবৎ ৪২ হাজার ৪০ জনের যাচাই-বাছাই শেষ করেছে এবং তার মধ্যে ২৭ হাজার ৬৪০ জন ‘মিয়ানমারে বাস করতেন’ বলে নিশ্চিত করেছে। জানুয়ারির সচিব পর্যায়ের বৈঠকে এই বছরের দ্বিতীয়ার্ধেই এদের মধ্য থেকে পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তাব দিয়েছিল মিয়ানমার। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো সেটাও এখনো শুরু করা যায়নি।
মিয়ানমার নানা কৌশলে চার বছর ধরেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আটকে রাখতে পেরেছে। তেমনি মিয়ানমারের রাখাইনেও তারা এমন পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে, যেন রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরতে ভয় পায়। অন্যদিকে, মিয়ানমারের সাবেক বা বর্তমান সরকার রোহিঙ্গাদের জাতিসত্তার পরিচয় নিয়ে যে অপরাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে, তার বিপরীতে বরং খানিকটা অগ্রগতির দেখা মিলেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশ মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ওপর। এরপর হেগ-এ আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের শুনানিতে অংশ নিয়ে অং সান সু চি’ও কিন্তু বলেননি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের মানুষ; বলেছেন, এরা আরাকানের মুসলমান। এখানে লক্ষ করা জরুরি যে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ২০১৯ সালে গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি শেষে ২০২০ সালের ২৩ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন প্রত্যাবাসনের বিষয়টি না এলেও রোহিঙ্গারা যে মিয়ানমারেরই অধিবাসী সেটি স্পষ্ট করা হয়েছে। এর বিপরীতে বিশ^ব্যাংক সম্প্রতি তাদের রিফিউজি পলিসি রিভিউ ফ্রেমওয়ার্ক বা ‘আরপিআরএফ’ নামে যে রূপরেখা তৈরি করেছে সেখানে রোহিঙ্গাদের ‘শরণার্থী’ অভিধা দিয়ে প্রকারান্তরে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আত্মীকরণের যে সুপারিশ করেছে তা বিশ^সম্প্রদায়ের বর্তমান অভিপ্রায়ের ইঙ্গিতবহ। বাংলাদেশ অবশ্য দ্রুততম সময়ে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই বিশ^ব্যাংকের রূপরেখা প্রত্যাখ্যান করেছে।
এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দুই বৃহৎ পরাশক্তি ভারত ও চীনের কাছ থেকে সমর্থন আদায় করা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক পরিসরে মিত্র বাড়ানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই বাংলাদেশের হাতে। লক্ষ করা জরুরি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বহুল আলোচিত ভূ-রাজনীতির চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারে গণহত্যার তদন্ত চাওয়া, এমনকি সাম্প্রতিক সেনাঅভ্যুত্থান বিরোধী বিক্ষোভে মিয়ানমারে ৯০০ মানুষকে হত্যার পরও পশ্চিমা দেশগুলোসহ চীন, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুর ও আসিয়ান দেশগুলো মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করেনি। অন্যদিকে, বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে চীনের বিআরআই প্রকল্পে ভারত মহাসাগরে চীনের প্রবেশদ্বার মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল। সেখানে রাখাইন-ইউনান গ্যাস পাইপলাইন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা তেল পরিবহনের পাইপলাইন এবং চীনের তৈরি গভীর সমুদ্রবন্দর এবং রেল ও সড়ক সংযোগ নির্মাণাধীন। ফলে চীনের স্বার্থ এখানে অনেক বেশি। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বোঝাতে হবে, সমস্যাটি কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নয়। বিশ্বের ১৯টি দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আশ্রয় নিয়েছে। প্রত্যাবাসন শুরু করতে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানকারী এই দেশগুলোসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিত্র বাড়াতে হবে বাংলাদেশকে।