সেচভিত্তিক চাষাবাদে সৌরবিদ্যুৎ

সেচভিত্তিক উচ্চফলনশীল জাতের খাদ্যশস্যের বদৌলতে এখন প্রায় ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা অনেকাংশেই সম্ভব হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর গত ৫০ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণে প্রায় ৭০ হাজার একর জমি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি নগরায়ণ, হাট-বাজার, রাস্তাঘাটে প্রতিদিন ২২০ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। সব মিলে গত ৫০ বছরে কৃষিজমি কমেছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অথচ জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। এর পরও দেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। কৃষি উন্নয়নে সরকারের গবেষণা খাতে ব্যয়বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন উচ্চফলনশীল জাতের ধান, গম উদ্ভাবনের কারণে কৃষি উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ।

বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট বা ‘ব্রি’র মহাপরিচালক সম্প্রতি জানিয়েছেন, দেশে এ পর্যন্ত চারটি হাইব্রিডসহ ৭২টি উফশী ধানের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলেই অনুমোদন পেয়েছে ২৪টি নতুন জাতের ধান। কৃষিক্ষেত্রে এ সাফল্য এসেছে ধান গবেষণায় বিজ্ঞানীদের নিরলস শ্রম আর কৃষকের নিরন্তর প্রচেষ্টার ফলে। ব্রি’র তথ্য মতে, উন্নত জাতের ধানের মধ্যে ৫টি জাতের ধানে ৮ থেকে ৯ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যাচ্ছে। যার কারণে ধানের উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিকট ভবিষ্যতে ধান উৎপাদনের পরিমাণ ৪ কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করেন ব্রি’র কর্মকর্তারা।

উচ্চফলনশীল ধানের চাষাবাদ মূলত সেচনির্ভর। ইতিমধ্যেই সেচভিত্তিক চাষাবাদের প্রায় পাঁচ দশক অতিবাহিত হয়েছে। শুরুর দিকে সেচের অধিকাংশ জমিতে বিএডিসির সরবরাহ করা ডিজেলচালিত ‘লো লিফ পাম্প’ দিয়ে নদী থেকে পানি তুলে চাষাবাদের পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত অগভীর নলকূপের সাহায্যেও পানি উত্তোলন করে চাষাবাদ হতো। সেচভিত্তিক চাষাবাদে ধানের ফলন বেশি হওয়ায় চাষিরা এমন চাষাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ায় চাহিদা পূরণে তখন পায়ে-চালিত ঢেঁকিকলের বেশ প্রচলন ছিল। একসময় কুড়িগ্রামের পশ্চাৎপদ উপজেলা রৌমারী ও রাজিবপুরের চরাঞ্চলে মানুষের তীব্র খাদ্য সংকট ছিল। জেলা শহর কুড়িগ্রামের চাল-আটায় ওই অঞ্চলের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ হতো। সেচভিত্তিক চাষাবাদ শুরু হলে রৌমারী উপজেলার কৃষকরা প্যাডেল পাম্প বা ঢেঁকিকলের সাহায্যে নারী-পুরুষ মিলেই পায়ের সাহায্যে পানি তুলে চাষাবাদ করত। দেখা গেছে, বোরো চাষাবাদের মৌসুমের শুরুতে কৃষকরা ঢেঁকিকলের পাশে খড়ের ঘর উঠিয়ে ধান কাটা-মাড়াই পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করত। ঢেঁকিকলের চাষাবাদের বদৌলতে রীতিমতো উপজেলা দুটিতে ধান, গম চাষাবাদে এক অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। বর্তমানে চরাঞ্চলের ওই দুই উপজেলাসহ কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলায় ব্যাপকভাবে সেচভিত্তিক চাষাবাদ হচ্ছে। একসময় মঙ্গার জেলা নামে খ্যাত কুড়িগ্রাম এখন ধানে উদ্বৃত্ত জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম, যা সম্ভব হয়েছে সেচভিত্তিক উচ্চফলনশীল জাতের ধান উৎপাদনের কারণে। এখন রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলার চরাঞ্চলের দোআঁশ মাটিতে ধানের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে গম ও ভুট্টারও চাষাবাদ হচ্ছে। অনেক সময় বাড়তি উৎপাদনের কারণে ক্রেতার অভাবে গম ও ভুট্টার উপযুক্ত মূল্য কৃষক পাচ্ছেন না। যদি এসব চরাঞ্চলে উৎপাদিত গম ও ভুট্টার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হতো, তাহলে আরও ব্যাপকভাবে গম, ভুট্টা ও ধানের চাষাবাদ বৃদ্ধি পেত।

কালের অগ্রযাত্রায় এখন পুরো দেশে প্যাডেল পাম্প বা ঢেঁকিকলের জায়গা দখল করে নিয়েছে ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প। দেশব্যাপী অগভীর নলকূপের পাশাপাশি গভীর নলকূপও স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে বোরো মৌসুমে প্রায় ৮০ লাখ ৩০ হাজর হেক্টর জমিতে সেচভিত্তিক চাষাবাদ হচ্ছে। সূত্র মতে, পুরো দেশে ফসলের জমিতে সেচ দিতে প্রায় ১৭ লাখ পাম্প স্থাপিত হয়েছে, যার মধ্যে ৮৩ শতাংশ ডিজেলচালিত এবং অবশিষ্ট ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎচালিত। সেচ মৌসুমে সেচের পাম্প চালু রাখতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পরিমাণ বিদ্যুৎ ও প্রায় ৯ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদাও অনেক বেড়ে গেছে। আবার বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশ্য তার পরও চাহিদার পুরো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।

এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকার আর কোনো পরিবেশবিধ্বংসী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন না করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। এই খাতের উন্নয়নে দুবছর আগে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত বের্নহার্ড ওয়াবেতজ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশে সৌরভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে তার দেশের সহায়তারও প্রতিশ্র“তি দেন। বাস্তবিকই নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দিকেই সরকারের নজর দেওয়া জরুরি। অবশ্য ইতিমধ্যেই বিষয়টি অনুধাবন করে সরকারও বসতবাড়ি, শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে সৌরবিদ্যুতের সংযোগ নেওয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে। কিন্তু যেখানে বিদ্যুতের সংযোগ হবে, সেখানে তো বিদ্যুৎ পাওয়াই যাবে। সে স্থানে সৌরবিদ্যুতের সংযোগ বাধ্যতামূলক করে লাভ কী? বরং সৌরবিদ্যুৎ খাতে সরকারিভাবে প্রণোদনা দিয়ে নামমাত্র সুদে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে কৃষি খাতে সেচের জন্য এবং অনগ্রসর অঞ্চলে সৌরবিদ্যুতের সংযোগ দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের ‘সাসটেইনেবল রিনিউএবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ বা ‘সেড্রা’ এসব নিয়ে কাজ করছে। ২০২০ সালের মধ্যে সারা দেশে পাঁচ লাখ ‘সোলার পাম্প’ স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে কাজ শুরু করেছিল সেড্রা। সরকারও দেশে বিদ্যুৎচালিত ও ডিজেলচালিত প্রায় ১৭ লাখ পাম্প পর্যায়ক্রমে সোলার পাম্প দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে চায়। ইতিমধ্যেই সারা দেশে প্রায় ২৫০টির বেশি সৌরশক্তিচালিত সেচপাম্প বা সোলার পাম্প স্থাপিত হয়েছে। এখানে সুবিধা হচ্ছে, একবার কোনো সেচপাম্পে সৌরবিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে পানি উত্তোলন করা যাবে। সেখানে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের মতো যন্ত্রণায় পড়তে হবে না। এমনকি মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলও পরিশোধ করতে হবে না। আবার ডিজেলচালিত পাম্পগুলোতেও ডিজেলের প্রয়োজনও পড়বে না। অর্থাৎ প্রতি বছর সেচ মৌসুমে ৯ লাখ টন ডিজেল সাশ্রয় হবে। সংগত কারণেই সরকারকে প্রতি অর্থবছরের বাজেটে একটি থোক বরাদ্দ রেখে পর্যায়ক্রমে পুরো দেশে সেচপাম্পগুলোকে সৌরশক্তির আওতায় আনা উচিত।

কৃষিই আমাদের দেশের মূল চালিকা শক্তি হওয়ায় কৃষির উন্নতি হওয়া মানে দেশের উন্নতি হওয়া। সরকার শিল্প খাতে প্রতি অর্থবছরেই কিছু কিছু করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিয়ে আসছে। কৃষি খাতেও নানাভাবে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কৃষি খাতের সহায়তা আরও বৃদ্ধি করে সেচপাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা জরুরি। যেখানে কৃষিজাতীয় প্রবৃদ্ধি বা জিডিপিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫৬ শতাংশ অবদান রাখছে, সেখানে কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করেই দেশের পুরো অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই।

ইতিমধ্যেই সারা দেশে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এলাকার বাইরে ‘সোলার হোম সিস্টেম’ স্থাপন করে বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে বাংলাদেশ। ২০০৩ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রায় ৪০ লাখ সোলার হোম সিস্টেম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম, হাট-বাজার, দোকানপাট, বসতবাড়ি, কুটিরশিল্পে এমনকি নৌকায় রাতের আঁধার সরিয়ে বিদ্যুতের আলো ছড়াচ্ছে। শুধু রাতের বেলায় নয়, যেখানে গ্রিডের বিদ্যুৎ নেই, সেসব অঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা টিভি দেখা, মোবাইল ফোনে চার্জ দেওয়া এখন অনেক সহজ হয়েছে। একটু লক্ষ করলেই চোখে পড়ে, এখন হাট-বাজারের পাশাপাশি প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে ২০৪টি কিংবা কোথাও আরও বেশিসংখ্যক দোকানপাট গড়ে উঠেছে। আবার প্রতিটি দোকানে রঙিন টিভিও দেখা হচ্ছে, যা সম্ভব হয়েছে সোলার হোম সিস্টেমের বদৌলতে। সৌরশক্তির বিদ্যুতের আলোর ঝলকানি এখন টিভি এবং বাড়িঘরের আলোর সীমানা অতিক্রম করে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেচপাম্পে। অবশ্য এ কাজে বিভিন্ন এনজিও এবং নানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও অবদান রাখছে।

বাস্তবে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত গভীর ও অগভীর সেচপাম্পগুলোকে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুতের আওতায় পর্যায়ক্রমে আনা সম্ভব হলে বিপুল পরিমাণ ডিজেল সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎও সাশ্রয় হবে। ফলে পরিবেশ-বিধ্বংসী কার্বন-ডাই অক্সাইডের নিঃসরণ বন্ধের পাশাপাশি কৃষি খাতে স্বল্প ব্যয়ে চাষাবাদ করে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর উদ্বৃত্ত খাদ্য রপ্তানি করাও সম্ভব হবে।

লেখক কৃষিবিষয়ক লেখক

ahairanju@gmail.com